বুধবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৫ , ০৭:৫৯ পিএম
১৮৮৭ সালের একটি ঐতিহাসিক ঘটনা আজও বাঙালি জাতির চলচ্চিত্র ইতিহাসে উজ্জ্বল অক্ষরে লেখা রয়েছে। তখন এক যুবক, নাম তার হীরালাল সেন, ২১ বছর বয়সে ‘রামপাট থেকে হুগলিতে সূর্যাস্ত’ নামক এক প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার লাভ করেন। প্রথম স্বর্ণপদক হাতে পাওয়ার পর, আলোকচিত্রশিল্পী হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু হলেও, তার পেছনে অপেক্ষা করছিল এক বিরাট কাহিনী। এই যুবক জন্মেছিলেন মানিকগঞ্জে, পরে হয়ে উঠলেন উপমহাদেশের প্রথম সিনেমা নির্মাতা, যার পদচিহ্ন ইতিহাসে চিরকাল অম্লান থাকবে।
হীরালাল সেনের গল্প সত্যিই এক অনুপ্রেরণা। ফটোগ্রাফির এক নবীন শিল্পী হিসেবে শুরুর পর, তার মনের মধ্যে একটি স্বপ্ন জেগে উঠেছিল: চলমান ছবি দেখানোর যন্ত্র, যা বিশ্বের নানা প্রান্তে ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল। সেই সময়ের বিখ্যাত প্রযুক্তিবিদ, থমাস আলভা এডিসন, আবিষ্কার করেছিলেন কাইনেটোস্কোপ, যা পরে বায়োস্কোপে রূপান্তরিত হয়। হীরালাল এর প্রতি আকৃষ্ট হন এবং নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নে ৫ হাজার টাকা নিয়ে কিনে ফেলেন একটি পুরোনো প্রোজেক্টর।

১৮৯৮ সালে, তিনি কলকাতার মাঠে-ময়দান এবং থিয়েটার হলে ছবি প্রদর্শন শুরু করেন। এর মাধ্যমে তিনি উপমহাদেশে প্রথম সিনেমা প্রদর্শক হিসেবে পরিচিতি পান। তার প্রতিষ্ঠিত ‘রয়্যাল বায়োস্কোপ কোম্পানি’ ছিল প্রথম ভারতীয় বায়োস্কোপ কোম্পানি। ফটোগ্রাফি ও সিনেমার মাধ্যমে এক নতুন যুগের সূচনা হয়েছিল।
১৯০০ সালে হীরালাল সেন ফ্রান্সের প্যাথে কোম্পানির সাথে কাজ শুরু করেন এবং কলকাতার বিভিন্ন দৃশ্য চলচ্চিত্রায়িত করেন। পরে, তিনি কলকাতার ক্লাসিক থিয়েটারের মালিক অমরেন্দ্রনাথ দত্তের সাথে জুড়ে গিয়ে সেখানে মঞ্চস্থ নাটকগুলোর নির্বাচিত দৃশ্য ছবির মাধ্যমে ধরে রাখেন। ‘সীতারাম’, ‘আলীবাবা’, ‘বুদ্ধ’ প্রভৃতি ছবির মাধ্যমে তিনি প্রথম বাঙালি সিনেমা নির্মাতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
১৮৯৭ সালে হীরালাল সেন বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক উন্মোচন করেন। ১৯০৫ সালে তিনি বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের দৃশ্য ধারণ করেন, যা পরবর্তী সময়ে ভারতের প্রথম রাজনৈতিক চলচ্চিত্র হিসেবে চিহ্নিত হয়। এই কাজের মাধ্যমে তিনি দেশের রাজনৈতিক সচেতনতা ও দেশপ্রেমকে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরেন। সেই সময়ে, এই ধরনের রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করাটা ছিল সাহসী এবং বিপজ্জনক, তবে হীরালাল নিজের বিশ্বাসে অবিচল ছিলেন।
তবে জীবনটা হীরালালের জন্য সহজ ছিল না। চলচ্চিত্র প্রদর্শন ও নির্মাণের পাশাপাশি, তাকে জীবনের কঠিন বাস্তবতাও মোকাবিলা করতে হয়েছে। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে শেষ বয়সে শোক ও অর্থকষ্টে ভুগেছিলেন তিনি। একসময় বাড়ি বিক্রি করে দিতে হয়েছিল, এমনকি নিজের প্রিয় ক্যামেরাও বিক্রি করতে হয়। কিন্তু সেই সমস্ত সংগ্রামেও তার আত্মবিশ্বাস ছিল অপরিসীম।
১৯১৭ সালে এক অগ্নিকাণ্ডে হীরালাল সেনের নির্মিত সকল চলচ্চিত্র পুড়ে যায়। এটি ছিল বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য এক বড় ধাক্কা। কিন্তু সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে ১৯১৭ সালের ২৯ অক্টোবর (মতান্তরে ২৪, ২৬, ২৭, ২৮ অক্টোবর) তার মৃত্যুর মাধ্যমে। পৃথিবী থেকে চিরকাল চলে গেলেন এক জনকথা-বিষয়ক মহানায়ক, যার নাম ইতিহাসে অম্লান রয়ে যাবে।
হীরালালের চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রচেষ্টা ও অবদান কখনোই অস্বীকার করা উচিত নয়। যদিও আজ পর্যন্ত জাতির চলচ্চিত্র পুরস্কারে তার নাম স্থান পায়নি, তবুও তার নির্মিত সিনেমাগুলোর কোন একটি যদি আজও সংরক্ষিত থাকত, তবে তার নাম আরও বেশি শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারিত হতো। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে, সময়ের সাথে তার কর্মের অনেক কিছুই হারিয়ে গেছে, ও পুড়ে গেছে।
এখনও যদি বিশ্বের কোথাও হীরালাল সেনের চলচ্চিত্রের কোনো আর্কাইভ খুঁজে পাওয়া যায়, তবে হয়তো একদিন সেই কাজগুলো আমাদের সামনে নতুন করে আসবে। তার অমূল্য অবদান কখনো ভুলে যাওয়া সম্ভব নয় এবং আমাদের উচিত তাকে সম্মান জানানো, যিনি বাঙালি চলচ্চিত্রের অগ্রদূত ছিলেন।
এভাবেই মানিকগঞ্জের সেই কিশোর, হীরালাল সেন, আজকের দিনেও মনে রাখার মতো এক কিংবদন্তি হয়ে আছেন-যিনি সিনেমা নির্মাণের সূচনা করেছিলেন উপমহাদেশে।
আরটিভি/কেআই