শুক্রবার, ১১ জুলাই ২০২৫ , ০৪:০৩ পিএম
পাকিস্তানের বিনোদন অঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। করাচির ডিফেন্স ফেজ-৬ এর একটি ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার করা হয়েছে জনপ্রিয় মডেল ও অভিনেত্রী হুমাইরা আসগরের (৩২) মরদেহ। মঙ্গলবার (৮ জুলাই) বিকেলে ফ্ল্যাটটি থেকে দুর্গন্ধ ছড়ালে প্রতিবেশীরা পুলিশের কাছে খবর দেন। পরে পুলিশ দরজা ভেঙে উদ্ধার করে নিথর দেহ।
জানা গেছে, করাচির ইত্তেহাদ কমার্শিয়াল এলাকার ফেজ ৬-এর একটি ফ্ল্যাটের দরজা ভেঙে অভিনেত্রীর দেহ উদ্ধার করা হয়। প্রতিবেশীরা ওই ফ্ল্যাট থেকে দুর্গন্ধ পেয়ে পুলিশে সংবাদ দেন। পুলিশ দরজায় ডেকে সাড়া পাননি। অবশেষে দরজা ভেঙে অভিনেত্রীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
অভিনেত্রী হুমাইরার মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তে পাঠানো হয়েছিল। আর তারপরেই সেখানে উঠে এসেছে বেশ কিছু বিস্ফোরক তথ্য। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট থেকে জানা গেছে, পুলিশ যখন অভিনেত্রীর লাশ খুঁজে পায়, তখন তার লাশ পচে যাচ্ছিল। হাঁটু পর্যন্ত গলে গিয়েছিল অভিনেত্রীর। মুখ বিকৃত হয়ে গিয়েছিল। পুলিশ প্রথমে তার পরিচয় ও বুঝতে পারেনি। অভিনেত্রীর মোবাইল, ছবি ও অন্যান্য জিনিস দেখে পুলিশ উদ্ধার করে যে এটি হুমাইরা আজগরের মরদেহ।
পুলিশ জানিয়েছে, দেহে পোকা ধরে গিয়েছিল হুমাইরার মরদেহ। লাশ শনাক্ত করাই কঠিন হয়ে পড়েছিল। পুলিশ লাশ শনাক্ত করার পরে ময়নাতদন্তে পাঠায়। আর ময়নাতদন্ত থেকেই উঠে আসে এই সমস্ত বিস্ফোরক তথ্য। তদন্তে আরও জানা যাচ্ছে, অভিনেত্রীর মৃত্যু হয়েছে ৬ মাস আগেই। ২ সপ্তাহ নয়, ৬ মাস ধরে ওই বন্ধ ফ্ল্যাটেই পড়েছিল অভিনেত্রীর দেহ। প্রতিবেশীরা কিছু বুঝতেও পারেননি।
পুলিশ তদন্তে নেমে জানতে পারে, অক্টোবর ২০২৪ সালেই নাকি মৃত্যু হয়েছে হুমাইরার। অক্টোবর মাস থেকেই বিদ্যুতের বিল দেননি হুমাইরা। সেই কারণে তার বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ পর্যন্ত কেটে দেওয়া হয়েছিল। ২০১৮ থেকে করাচির ওই ফ্ল্যাটে থাকতেন হুমাইরা।
তবে ২০২৪ সালে তিনি ফ্ল্যাটের ভাড়া দেওয়া বন্ধ করে দেন। সেই কারণে সেই বাড়ির মালিক হুমাইরার বিরুদ্ধে মামলাও করেছিল। তবে ফরেন্সিক রিপোর্ট বলছে, এই সব কিছু জানার আগেই মারা গিয়েছিলেন হুমাইরা।
এদিকে, লাশটি তার অ্যাপার্টমেন্ট থেকে পচাগলা অবস্থায় উদ্ধার হওয়ার পর হিমঘরে সংরক্ষিত ছিল। একই সঙ্গে বেশ কয়েকদিন ধরে তার পরিবারের সদস্যরা তার লাশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছিল। মিডিয়া ও জনসাধারণের তীব্র সমালোচনার মধ্যে হুমাইরার পরিবার অবশেষে করাচিতে পৌঁছে তার লাশ গ্রহণ করল।
করাচির এসএসপি (দক্ষিণ) অফিসের বাইরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় হুমাইরার ভাই নাবিদ আসগর জানান, সংবাদমাধ্যমে যে দাবি করা হয়েছে যে, পরিবার তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল, তা পুরোপুরি সত্য নয়।
নাবিদ বলেন, ভুল ধারণা তৈরি হয়েছে যে, আমরা ওকে (হুমাইরা) ত্যাগ করেছিলাম বা তার লাশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলাম। সেটা সঠিক নয়। গত তিন দিন ধরে তারা পুলিশের সঙ্গে এবং ছিপ্পা ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন-এর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন।
নাবিদ আসগর বলেন, যেহেতু লাশ পুলিশের হেফাজতে ছিল, তাই আইনি প্রক্রিয়া শেষ না হলে হস্তান্তর সম্ভব ছিল না, আমরা এখন ছিপ্পার সঙ্গে যোগাযোগ করে লাশ বুঝে নিয়েছি।
নাবিদ ব্যাখ্যা করে জানান, গত ছয় মাস ধরে হুমাইরার ফোন বন্ধ ছিল এবং তিনি কারো সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। কারণ তিনি প্রায়ই ভ্রমণে থাকতেন। ওর সঙ্গে আমাদের ছয় মাস কোনো যোগাযোগ ছিল না, কিন্তু তাই বলে আমরা চিন্তিত ছিলাম না— এটা ঠিক নয়।
সম্প্রতি আমাদের এক চাচি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন। এতে বাবা-মা মানসিকভাবে খুবই বিপর্যস্ত ছিলেন। হুমাইরার মৃত্যুর পর হঠাৎ করে মিডিয়া থেকে ফোন আসা পরিবারের জন্য ছিল এক মানসিক ঝড়ের মতো অভিজ্ঞতা, বলেন নাবিদ।
এর আগে এসএসপি (দক্ষিণ) মাহজুর আলী সাংবাদিকদের জানান, লাশ হস্তান্তরের জন্য আইনি প্রক্রিয়া চলছে। তিনি বলেন, ‘তার ভাই ও ভগ্নিপতি করাচিতে এসেছেন। তারা লাশ লাহোরে নিয়ে গিয়ে দাফন করার পরিকল্পনা করছেন।
মাহজুর আলী আরও জানান, পরিবারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো সন্দেহের ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি এবং তারা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছেন। পুলিশ বলছে, হুমাইরার সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে বন্ধ ছিল।
মাহফুজুর আলী বলেন, ওই সময় থেকে অভিনেত্রীর ফ্ল্যাটের কোনো ইউটিলিটি বিল পরিশোধ করা হয়নি। ঘরের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ওই সময়েই তার মৃত্যু হয়েছে।
তিনি আরও জানান, হুমাইরার ফ্ল্যাটের পাশের ফ্ল্যাটও খালি ছিল, কারণ এর বাসিন্দারা বিদেশে ছিলেন এবং ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ফিরেছেন। এ কারণে পচা গন্ধ কেউ টের পায়নি।
তিনি জানান, হুমাইরার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল অনিয়মিত। সাধারণত তিনি নিজেই পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। তবে গত ছয় মাস ধরে কোনো যোগাযোগ ছিল না তাদের।
আরটিভি/এএ