শুক্রবার, ১৪ নভেম্বর ২০২৫ , ০৫:৪২ পিএম
তুরস্কের দক্ষিণ-পূর্ব প্রদেশ আদিয়ামানে দাঁড়িয়ে আছে এক রহস্যময় পাহাড় মাউন্ট নেমরুত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২ হাজার মিটার উঁচু এই পাহাড় দূর থেকে সাধারণ মনে হলেও চূড়ায় উঠলেই দেখা মিলে সারিবদ্ধ বিশাল পাথরের মাথা। মনে হয় যেন প্রাচীন দেবতারা আজও পাহারা দিচ্ছেন রাজা অ্যান্টিওকাস প্রথমের সমাধিকে।
একসময় পাহাড়ের ঢালজুড়ে ছিল অগণিত অলিভ বাগান। এখন সেখানে শুধু শুকনো ঘাস, পাথর আর ইতিহাসের স্তব্ধতা। নিচে ছাগল ঘুরে বেড়ালেও ওপরে বইছে অদ্ভুত নীরব বাতাস যা স্পর্শ করে যায় হাজার বছরের স্মৃতি।
খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতে ইউফ্রেটিসের উত্তরে ছিল ক্ষুদ্র রাজ্য কম্মাজেন। গ্রিক, পারস্য, আসিরীয় ও আর্মেনীয় সংস্কৃতির মেলবন্ধনে গড়া এই রাজ্যের শাসক অ্যান্টিওকাস প্রথম চেয়েছিলেন মৃত্যুর পরও দেবতাদের সঙ্গে চিরকাল অবস্থান করতে। সেই কারণে নেমরুত পাহাড়ের চূড়ায় নির্মাণ করেন নিজের সমাধি। দেবতা ও বীরদের বিশাল মূর্তির মাঝখানে স্থাপন করা হয় তার মূর্তিও।
তবে প্রকৃতির বিধ্বস্ততায় আজ অনেক মূর্তি ভাঙা। তবুও সেই পাথরের মুখগুলো এখনো তাকিয়ে থাকে দিগন্তের দিকে, যেন স্মরণ করে প্রাচীন ইতিহাস।
স্থানীয়রা জায়গাটিকে বলেন ‘দেবতাদের সিংহাসন’। ঐতিহাসিকদের মতে, এসব ভাস্কর্যের বয়স প্রায় দুই হাজার বছর।
নেমরুত এখন ইউনেসকো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় পাহাড়ের চূড়ার রঙ বদলে যায়, তখনই পর্যটকদের ভিড় সবচেয়ে বেশি। আদিয়ামানের কাহতাহ জেলা থেকে গাড়িতে ৫০ মিনিটেই পৌঁছানো যায় পাহাড়ের পাদদেশে। পথে চোখে পড়ে রোমান যুগের সেপ্টিমিয়াস সেভেরাস সেতু এবং কম্মাজেন রাজপরিবারের নারীদের স্মরণে তৈরি কারাকুশ টিউমুলাস।
চূড়ার কাছে রয়েছে একটি আধুনিক পার্কিং এলাকা ও ভিজিটর সেন্টার। সেখান থেকে প্রায় ২৫ মিনিট হাঁটলেই পৌঁছে যায় মূল স্থানে—প্রায় ৫০০ মিটার পথ, ৩০০-র বেশি সিঁড়ি। উপরে উঠতে কষ্ট হলেও দৃশ্য দেখলে সব পরিশ্রম যেন মুহূর্তেই মিলিয়ে যায়।
চূড়ায় দেখা যায় টিউমুলাস নামে একটি বিশাল পাথরের ঢিবি, যার উচ্চতা প্রায় ৫০ মিটার। ধারণা করা হয়, এর নিচেই লুকিয়ে আছে রাজা অ্যান্টিওকাসের সমাধি।
এখানে সারি করে দাঁড়িয়ে আছে দেবতা জিউস, অ্যাপোলো, হারকিউলিস, কম্মাজেনের উর্বরতার দেবী এবং রাজা অ্যান্টিওকাসের মূর্তি। একসময় এসব ভাস্কর্যের উচ্চতা ছিল প্রায় ১৫ মিটার।
১৮৮১ সালে জার্মান প্রকৌশলী কার্ল সেস্টার প্রথম স্থানটির অস্তিত্ব আবিষ্কার করেন। এরপর বহু প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান হলেও সমাধির ভেতরের কক্ষ এখনো রহস্যঘেরা। কেউ কেউ মনে করেন, এর গঠন মিশরের পিরামিডের মতো জটিল।
১৯৮৭ সালের পর থেকে নেমরুতে কোনো খনন হয়নি। স্থানীয় গাইড সালিহ আবুরসুর ভাষায়, এটাই সমাধির রহস্যকে অক্ষুণ্ণ রেখেছে। বর্তমানে স্থানটি সংরক্ষিত জাতীয় উদ্যান হিসেবে পরিচালিত হয় এবং ভাস্কর্যগুলো রক্ষায় ব্যবহার করা হচ্ছে আধুনিক ‘ন্যানো লাইম’ প্রযুক্তি।
চূড়ায় দাঁড়িয়ে উত্তরে দেখা যায় টরাস পর্বতমালা, দক্ষিণে মেসোপটেমিয়ার সমতলভূমি এবং দূরে ইউফ্রেটিস নদী। সন্ধ্যা নামলে ভাঙা দেবতাদের মাঝে বসে সূর্যাস্ত দেখা যেন অন্য এক যুগে পাড়ি দেওয়ার অনুভূতি দেয়।
শিকাগো থেকে আসা পর্যটক জুলিয়ান বশম্যান বলেন, আমরা ইতিহাসের গভীরতা আর দৃশ্য দেখে মুগ্ধ। মনে হচ্ছিল, যেন হাজার বছর আগের পৃথিবী এখনো বাঁচে আছে।
সূর্যের শেষ আলো লাল, তারপর অ্যাম্বার হয়ে যখন মিলিয়ে যায়, তখন নেমরুত পাহাড় আবার ডুবে যায় তার চিরন্তন নীরব প্রহরায়—যেখানে প্রাচীন দেবতা আর রাজা অ্যান্টিওকাস আজও পাহারা দিচ্ছেন এক অমর রহস্যকে।
আরটিভি/এসকে