বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬ , ১০:০৫ পিএম
বিশ্বজুড়ে সাপের রাজ্যে এক অন্যতম আকর্ষণীয় ও পরিচিত নাম পাইথন বা অজগর। সাধারণত এরা বিষহীন এবং শিকারকে পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে মারার অভ্যাসের জন্য পরিচিত। বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীতে ‘পাইথনিডি’ পরিবারের অধীনে বর্তমানে প্রায় ৪০টি জীবিত প্রজাতির অজগর রয়েছে। এই প্রজাতিগুলো প্রায় ১১টি আলাদা গণে (জেনাস) বিভক্ত।
তবে আমরা সচরাচর যাদের ‘আসল অজগর’ বা ‘ট্রু পাইথন’ বলে থাকি, তারা মূলত ‘পাইথন’ গণের অন্তর্ভুক্ত। এই গণে বর্তমানে ১০টি প্রজাতি রয়েছে, যাদের মূল আবাসস্থল এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশে। ২০১৪ সালে একটি শ্রেণিবিন্যাসগত পরিবর্তনের কারণে বিখ্যাত ‘রেটিকুলেটেড পাইথন’ (জালি অজগর) এবং ‘তিমুর পাইথন’—এই দুটিকে আসল অজগরের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে ‘ম্যালায়োপাইথন’ নামক একটি আলাদা গণে স্থানান্তর করা হয়। অবশিষ্ট প্রজাতিগুলো অস্ট্রেলিয়া, নিউগিনি এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ছড়িয়ে রয়েছে।
চলুন জেনে নেই আসল অজগর বা ‘ট্রু পাইথন’ প্রজাতির খুঁটিনাটি
আফ্রিকান রক পাইথন: একসময় এটিকে একটি একক প্রজাতি ধরা হলেও বর্তমানে এটি দুটি আলাদা প্রজাতি হিসেবে স্বীকৃত। একটি হলো ‘সেন্ট্রাল আফ্রিকান রক পাইথন’ এবং অন্যটি ‘সাউদার্ন আফ্রিকান রক পাইথন’। এরা ১৫ থেকে ২০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। মূলত বন ও তৃণভূমি এলাকায় পানির কাছাকাছি এরা বাস করে এবং হরিণ বা ছোট কুমিরও গিলে খেতে পারে।

অ্যাঙ্গোলান পাইথন: আফ্রিকার আসল অজগরগুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে দুর্লভ। সাধারণত নামিবিয়া ও অ্যাঙ্গোলায় এদের দেখা মেলে। এরা লম্বায় প্রায় ৬ ফুট হয় এবং এদের শরীরে লালচে-বাদামি বা কালচে রঙের ওপর চমৎকার ক্রিম বা সাদা রঙের ছোপ থাকে।

বল পাইথন: আফ্রিকার অজগরগুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে ছোট, যা লম্বায় সাধারণত ৩ থেকে ৫ ফুট হয়। কোনো বিপদের আভাস পেলে এরা নিজেদের শরীরকে গোল বলের মতো গুটিয়ে ফেলে, যার কারণে এদের এই নাম। শান্ত স্বভাবের কারণে আন্তর্জাতিক পোষা প্রাণীর বাজারে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

ব্লাড পাইথন: এটি মূলত মালয় উপদ্বীপ, সুমাত্রা এবং দক্ষিণ থাইল্যান্ডের ক্রান্তীয় জলাভূমিতে বাস করে। এদের শরীরে গভীর লাল বা কমলা রঙের ছোপ থাকে এবং এরা বেশ ভারী গড়নের ছোট লেজের সাপ।

বোর্নিও পাইথন: বোর্নিও দ্বীপের জলাভূমি ও পিট ফরেস্টে এদের বাস। এরা প্রায় ৭ ফুট দীর্ঘ এবং বেশ স্থূলকায় ও ভারী শরীরের অজগর।

বার্মিজ ও ইন্ডিয়ান পাইথন: বার্মিজ পাইথন বিশ্বের বৃহত্তম পাঁচ সাপের একটি, যা ১৮ ফুটেরও বেশি লম্বা হতে পারে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এদের মূল আবাস হলেও যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার এভারগ্লেডসে এরা বর্তমানে একটি বড় আক্রমণাত্মক প্রজাতি হিসেবে ছড়িয়ে পড়েছে। অন্যদিকে ভারতীয় উপমহাদেশে পাওয়া যায় ‘ইন্ডিয়ান পাইথন’ বা এশীয় রক পাইথন, যা বার্মিজ পাইথনের চেয়ে কিছুটা হালকা রঙের হয়।
মিয়ানমার শর্ট-টেইলড পাইথন: ২০১১ সালে মিয়ানমারের বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে এই নতুন প্রজাতিটি আবিষ্কৃত হয়। এদের শরীরে অন্যান্য ছোট লেজের অজগরের তুলনায় বেশি স্কেল বা আঁশ থাকে।

সুমাত্রান শর্ট-টেইলড পাইথন: সুমাত্রার স্থানীয় এই প্রজাতিটি বেইজ বা ধূসর-বাদামি রঙের হয় এবং শরীরে ইটের মতো লাল ছোপ থাকে। এদের চামড়ার জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপকহারে শিকার করা হয়।

আলোচিত সাবেক দুই পাইথন
২০১৪ সালের পর থেকে ‘রেটিকুলেটেড পাইথন’ ও ‘তিমুর পাইথন’ এখন আর আসল পাইথন গণের অংশ নয়। এর মধ্যে রেটিকুলেটেড পাইথন বা জালি অজগর বিশ্বের দীর্ঘতম সাপের প্রজাতি, যা ২১ ফুটেরও বেশি লম্বা হতে পারে। এরা খুব ভালো সাঁতার কাটতে পারে। অন্যদিকে তিমুর পাইথন আকারে বেশ ছোট (প্রায় ৭ ফুট) এবং অত্যন্ত চটপটে ও রক্ষণাত্মক স্বভাবের হয়ে থাকে।
অস্ট্রেলিয়া ও নিউগিনির অন্যান্য প্রজাতি
আসল পাইথন ও মালেয়োপাইথনের বাইরে পাইথন পরিবারের বাকি ৯টি গণের প্রায় সবগুলোরই কেন্দ্রবিন্দু হলো অস্ট্রেলিয়া এবং নিউগিনি অঞ্চল। এর মধ্যে রয়েছে মাত্র ৪ ফুট দৈর্ঘ্যের ‘চিলড্রেনস পাইথন’। আরও রয়েছে ‘উমা পাইথন’ ও ‘ব্ল্যাক-হেডেড পাইথন’, যাদের শরীরে অন্য পাইথনের মতো তাপ-সংবেদী গর্ত বা হিট-সেন্সিং পিট থাকে না। এ ছাড়া রয়েছে সেমি-অ্যাকুয়াটিক বা আধা-জলচর ‘ওয়াটার পাইথন’, ‘কার্পেট পাইথন’ এবং চমৎকার সবুজ রঙের ‘গ্রিন ট্রি পাইথন’। হোয়াইট-লিপড বা সাদা ঠোঁটের পাইথন এবং ওনপেলির মতো দুর্লভ অজগরও এই পরিবারের অন্তর্ভুক্ত।
আরটিভি/এআর