images

ফিচার

চিত্রা নদীর তীরে শতবর্ষী বটবৃক্ষের ছায়ায় রতডাঙ্গার হাট 

সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬ , ০৩:৪৭ পিএম

আকাশচুম্বী এক বটবৃক্ষ, যা ডালপালা চারদিকে ছড়িয়ে তৈরি করেছে এক বিশাল প্রাকৃতিক ছাউনি। সেই ছাউনির নিচেই পরম শান্তিতে চলে বেচারকেনার ধুম। আধুনিকতার ছোঁয়ায় অনেক কিছু বদলে গেলেও নড়াইলের চিত্রা নদীর তীরে শত বছরের ঐতিহ্য বুকে নিয়ে এখনো জমে ওঠে ‘রতডাঙ্গার হাট’। 

নড়াইল জেলা শহর থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে চণ্ডিবরপুর ইউনিয়নের রতডাঙ্গা গ্রামে অবস্থিত এই হাটটি এখনো গ্রামীণ সংস্কৃতির এক অনন্য নিদর্শন। এ হাটের বয়স ২০০ বছরের বেশি। তবে আগের মতো জৌলুস না থাকলে ও ঐতিহ্যবাহী এ হাট এখনো বেচাকেনায় অনেকটাই সরগরম হয়ে ওঠে।

স্থানীয় প্রবীণদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এই হাটের ইতিহাস প্রায় ২০০ বছরেরও বেশি পুরোনো। ব্রিটিশ আমলে চিত্রা নদীর পাড়ে এই হাটের পত্তন ঘটে। একসময় চিত্রা নদী দিয়ে চলাচল করত বড় বড় নৌকা, ট্রলার, লঞ্চ ও স্টিমার। দূর-দূরান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা নৌপথে এই হাটে আসতেন এবং দিনভর কেনাবেচা শেষে সবজি, মাছ, মাংস, গুড় ও মাটির তৈজসপত্র নিয়ে আবার নৌপথেই ফিরে যেতেন। কালের বিবর্তনে নদীপথের সেই জৌলুস কমলেও হাটের গুরুত্ব এখনো ফুরিয়ে যায়নি।

আরও পড়ুন
prani

খুলনায় বিরল প্রজাতির প্রাণীর সন্ধান

বটগাছের ছায়াঘেরা জায়গায় প্রতিদিনই সকাল বিকাল কেনা-বেচা শুরু হয়, চলে রাত পর্যন্ত। সপ্তাহের প্রতি শুক্রবার ও সোমবার এখানে বসে অফিশিয়াল হাট। তবে সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতেও সকাল-সন্ধ্যা বসে নিয়মিত বাজার। রতডাঙ্গা ও এর আশপাশের ৪-৫টি গ্রামের মানুষের নিত্যদিনের চাহিদার কেন্দ্রবিন্দু এই হাট। অন্য দিনগুলোতে নিয়মিত বাজার বসে। রতডাঙ্গা গ্রামসহ আশপাশের চার পাঁচটি গ্রাম থেকে এ হাটে কেনা-বেচা করতে লোকজন আসেন। হাটের পাশেই নদীর তীর ঘেঁষে রতডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়। স্কুল শিক্ষার্থীরা টিফিন সময়ে বটগাছের শীতল ছায়ায় এসে ভিড় করেন।

সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখা যায়, হাটের মাঝখানে বিশাল আকৃতির বটগাছ। বটগাছের নিচে কেউ দোকান করে বসে আছেন, কেউ বা অস্থায়ী সেলুন, আবার কেউ বিক্রি করছেন পান আবার কেউ সবজি। বটগাছের দুই পাশ দিয়ে সারি সারি আধাপাকা দোকানঘর। বেশির ভাগ দোকান টিনের তৈরি ও জরাজীর্ণ। দোকান, দোকান ঘরের বারান্দায় এবং দোকানঘরের সামনে বিভিন্ন পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা। ফাঁকা জায়গা তাবু টানিয়ে বসেছেন অস্থায়ী দোকান। সেখানে চলছে বেচাকেনা। ক্রেতারা দোকান ঘুরে ঘুরে দেখছেন। কেউ দরদাম করছেন, আবার কেউ ব্যাগ ভরে পছন্দের সবজি কিনছেন।

বটতলার শীতল ছায়ায় ৩৫ বছর ধরে পান বিক্রি করছেন অখিল বিশ্বাস (৬৫)। তিনি বলেন, আমার বাবা-দাদারাও এই গাছটিকে এমন বিশালই দেখে গেছেন। কে এই গাছ লাগিয়েছিলেন কেউ জানে না। এই গাছের ছায়ায় থেকে আমাদের রুটি-রুজির হাট বসে।

আরও পড়ুন
FISH

কূপের গভীরে পাওয়া গেল লালচে শরীরের চোখ ছাড়া মাছ

একই স্থানে অস্থায়ী সেলুন বসিয়ে চুল-দাড়ি কাটেন হারু পরামানিক। তীব্র গরমেও এই বটতলার ঠাণ্ডা পরিবেশে মানুষ পরম শান্তিতে চুল কাটাতে আসেন বলে জানান তিনি। এছাড়াও ২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে এখানে কাঁচা সবজি বিক্রি করছেন ৭৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ রুহুল আমিন।

বটগাছের নিচে তাবু টানিয়ে আলু, পটল, মরিচ, বেগুন কাঁচা সবজি সাজিয়ে বসেছেন সদর উপজেলার রতডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা রুহুল আমিন (৭৫)। তিনি বলেন, ২৫ বছরের বেশি সময় ধরে এই হাটে কাঁচা সবজি বিক্রি করি। আগে হাটে প্রচুর লোকের সমাগম হতো। ব্যবসায়ীরা জিনিসপত্র কিনতে নৌকায় করে আসতেন। এখন আর নৌকা আসে না। বেচাকেনা কম। তবে এই বট গাছ ও হাটের বয়স ২০০ বছরের বেশি হবে।

নতুন প্রজন্মের আকর্ষণ ও আড়াই টাকার সিঙ্গাড়া হাটের পাশেই গড়ে উঠেছে রতডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়। টিফিনের সময় স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে ওঠে এই বটতলা। শুধু গ্রামবাসীই নন, শহরের তরুণদের কাছেও এটি একটি দারুণ আড্ডাস্থল।

নড়াইল পৌর এলাকা থেকে হাটে আসা আজিজুল ইসলাম (২৮) জানান, ছোটবেলায় বাবার সাথে নৌকায় করে এই হাটে আসতেন, সেই টান আজও রয়ে গেছে। 
তিনি হাসিমুখে বলেন, এই হাটের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো মাত্র আড়াই টাকায় পাওয়া মচমচে ও সুস্বাদু সিঙ্গাড়া! বন্ধুদের নিয়ে প্রায়ই এখানে আসি সবজি কিনতে আর বটতলায় আড্ডা দিতে।

ঐতিহাসিক এই বটগাছটি রক্ষায় রতডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দারা একতাবদ্ধ হয়ে গঠন করেছেন ২০ সদস্যের ‘রতডাঙ্গা বাজার বটগাছ সংরক্ষণ কমিটি’। এই কমিটির সভাপতি জাহিদ হোসেন। 

তিনি জানান, গাছটি সম্ভবত ৫ থেকে ৬ শত বছরের পুরোনো। আমাদের বাবা-দাদারাও একে একই রূপে দেখেছেন। বাজারের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে এই গাছটি। কেউ যাতে এর ডালপালা কাটতে বা ক্ষতি করতে না পারে, সেজন্য আমরা এটি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করি।

চণ্ডিবরপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. আজিজ ভূইয়া এই হাটের ঐতিহ্যকে স্বীকার করে বলেন, দেশীয় ফল, মাছ, সবজি ও গুড়ের জন্য রতডাঙ্গার হাট বহুকাল ধরে বিখ্যাত। চিত্রা নদীর হাওয়া আর এই বটবৃক্ষের শীতল ছায়ার কারণে এখানে আসা মানুষের কখনো বৈদ্যুতিক ফ্যানের প্রয়োজন হয়না। এটি আমাদের অঞ্চলের এক গর্ব।

আধুনিকায়নের যুগে গ্রামীণ ঐতিহ্য ও সৌহার্দ্যের এমন মেলবন্ধন সত্যি বিরল। রতডাঙ্গার এই ঐতিহ্যবাহী হাট ও বটবৃক্ষটি চিরকাল বেঁচে থাকুক এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয় সচেতন মহলের।

আরটিভি/এমএম