images

ফিচার

বদলে যাচ্ছে ইলিশের পথ, হারিয়ে যাবে কী জাতীয় মাছ?

শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬ , ১১:০১ এএম

বাঙালির পাতে ইলিশ মানেই আলাদা এক আবেগ। ভাজা, ঝোল কিংবা সরষের ঘ্রাণে ইলিশের নাম শুনলেই জিভে পানি আসে। কিন্তু সেই প্রিয় ইলিশই এখন নিজের ঠিকানা বদলাচ্ছে—নদীর চেনা পথ ছেড়ে ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে সাগর ও মোহনার দিকে।

জলবায়ু পরিবর্তন, নদী দূষণ ও মানুষের নানা কর্মকাণ্ডের কারণে বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশের স্বাভাবিক চলাচল ও প্রজননক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। গবেষণায় উঠে এসেছে, ইলিশ ধীরে ধীরে অভ্যন্তরীণ নদী থেকে সরে সাগর ও মোহনাকেন্দ্রিক অঞ্চলের দিকে চলে যাচ্ছে। এতে ভবিষ্যতে ইলিশের টিকে থাকা নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন শঙ্কা।

বদলে যাচ্ছে ইলিশের আবাসস্থল

গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে ইলিশের মোট উৎপাদনের প্রায় ৯৪ শতাংশ আসত নদী থেকে। তবে ২০১২-১৩ সালে এসে এই চিত্র পুরোপুরি বদলে যায়। তখন প্রায় ৭২ শতাংশ ইলিশ ধরা পড়ে সামুদ্রিক জলসীমায় এবং মাত্র ২৮ শতাংশ পাওয়া যায় নদী থেকে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইলিশ কোনো নির্দিষ্ট তারিখ দেখে চলাচল করে না। নদীর পানির তাপমাত্রা, লবণাক্ততা, গভীরতা, অক্সিজেনের মাত্রা, বৃষ্টিপাত ও জোয়ার-ভাটার পরিবর্তনের সংকেত বুঝেই ইলিশ তার চলাচলের পথ নির্ধারণ করে।

আরও পড়ুন
MAGUR-FISH

মাগুর মাছ কেন সারা বছর বৃষ্টি হওয়ার অপেক্ষায় থাকে

দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা ইলিশের

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট মাছ উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ আসে ইলিশ থেকে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে ইলিশ উৎপাদন হয়েছে ৫ লাখ ২৯ হাজার টন, যার বাজারমূল্য ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি।

কর্তৃপক্ষের দাবি, বিশ্বের মোট ইলিশের ৮০ শতাংশের বেশি বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়। এই মাছ দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পাশাপাশি লাখো মানুষের জীবিকার সঙ্গে জড়িত।

কমছে উৎপাদন, বাড়ছে উদ্বেগ

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইলিশ উৎপাদনে কিছুটা কমতির চিত্র দেখা যাচ্ছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ইলিশ উৎপাদন ছিল ৫ লাখ ৭১ হাজার টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে ৫ লাখ ২৯ হাজার টনে নেমে আসে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন আরও কমে ৫ লাখ ১২ হাজার টনের কাছাকাছি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সবচেয়ে বড় পরিবর্তন শুধু উৎপাদনে নয়, বরং ইলিশের বিস্তারের জায়গায়। নদীর পরিবেশ বদলে যাওয়ায় ইলিশের স্বাভাবিক পথও পরিবর্তিত হচ্ছে।

মানুষের কর্মকাণ্ড বড় হুমকি

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি বর্তমানে মানবসৃষ্ট প্রভাব ইলিশের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।

তিনি বলেন, নদী দূষণ, নদী ভরাট, নাব্যতা কমে যাওয়া, পানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং অতিরিক্ত মাছ ধরার কারণে ইলিশের জীবনচক্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

পানির সংকেত বুঝেই চলে ইলিশ

গবেষণায় দেখা গেছে, ইলিশের চলাচল ও প্রজনন পানির তাপমাত্রা, লবণাক্ততা, অক্সিজেনের মাত্রা, স্রোত ও পানির গুণগত মানের ওপর নির্ভর করে।

তেঁতুলিয়া ও মেঘনা মোহনার মতো এলাকায় ইলিশের প্রজনন ও পোনা বেড়ে ওঠার জন্য বিশেষ পরিবেশ প্রয়োজন। মিঠা পানির প্রবাহে সামান্য পরিবর্তনও এসব এলাকার উপযোগিতা নষ্ট করতে পারে।

শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, দরকার পরিবেশ রক্ষা

বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্দিষ্ট সময়ে মাছ ধরা বন্ধ রাখার পাশাপাশি নদী, মোহনা ও সমুদ্রের পরিবেশ রক্ষা করতে হবে। নদী দূষণ নিয়ন্ত্রণ, নাব্যতা বজায় রাখা, মিঠা পানির প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং জেলেদের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

তাদের মতে, ইলিশ মানুষের তৈরি নিয়ম মেনে চলে না। পানির পরিবেশ অনুকূল হলেই সে তার পথ বেছে নেয়।

ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে নদীর ওপর

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের ইলিশ খাত এখনো শক্ত অবস্থানে রয়েছে। তবে ভবিষ্যতে ইলিশের টিকে থাকা নির্ভর করবে নদী, মোহনা ও সমুদ্রের পরিবেশ কতটা সুরক্ষিত রাখা যায় তার ওপর।

কারণ ইলিশ নীতির ভাষা বোঝে না, সে বোঝে শুধু পানির ভাষা।


আরটিভি/জেএমএ