মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬ , ০৪:১৯ পিএম
বিল, খাল কিংবা পুকুরে ধরা পড়া সাপের মাথার মতো দেখতে মাছকে অনেকেই কখনো টাকি, আবার কখনো চ্যাং বলে থাকেন। দেখতে কাছাকাছি হওয়ায় এ নিয়ে বিভ্রান্তি নতুন নয়। তবে মৎস্যবিজ্ঞানীদের মতে, চ্যাং ও টাকি একই মাছ নয় তারা একই পরিবারের হলেও ভিন্ন দুটি প্রজাতি।
দুটি মাছই সর্পমাথা বা Channidae পরিবারের সদস্য। এই পরিবারের অন্তর্ভুক্ত আরও রয়েছে শোল, গজার ও তিলাশোল। টাকির বৈজ্ঞানিক নাম Channa punctata, আর চ্যাংকে সাধারণত Channa orientalis নামে চিহ্নিত করা হয়। তবে কিছু গবেষক একে Channa gachua হিসেবেও উল্লেখ করেন। প্রজাতি নির্ধারণ নিয়ে এখনো গবেষকদের মধ্যে কিছু মতপার্থক্য রয়েছে।
বাংলাদেশের প্রায় সব খাল-বিল, পুকুর ও ডোবায় টাকি মাছ পাওয়া যায়। অঞ্চলভেদে এটি ল্যাটা, লাটি, ওকন কিংবা চাইতান নামেও পরিচিত। দেখতে শোল মাছের ছোট সংস্করণের মতো হলেও এর গায়ে হলদেটে আভা ও ছোপ ছোপ দাগ থাকে।
টাকি সাধারণত ১৩ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বড় হয়, তবে অনুকূল পরিবেশে ৩২ সেন্টিমিটারেরও বেশি হতে পারে। এটি একটি মাংসাশী ও শিকারি মাছ। ছোট মাছের পোনা এমনকি নিজের প্রজাতির পোনাও খেয়ে ফেলতে পারে। এ কারণে অন্যান্য মাছের সঙ্গে একত্রে চাষ করা কঠিন।

প্রজনন মৌসুমে জলজ উদ্ভিদ দিয়ে বাসা তৈরি করে স্ত্রী মাছ ডিম পাড়ে এবং ডিম ফুটে বাচ্চা বের হওয়ার পর মা-বাবা উভয়ই পোনাগুলোকে পাহারা দেয়।
টাকি মাছের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, গলবিলের কাছে থাকা ফ্যারেঞ্জিয়াল ডাইভারটিকুলা নামের একটি অঙ্গের মাধ্যমে এটি পানির বাইরের বাতাস থেকেও অক্সিজেন গ্রহণ করতে পারে। ফলে পানি কমে গেলেও বা কাদায় আটকে পড়লেও দীর্ঘ সময় জীবিত থাকতে সক্ষম হয়।
চ্যাং মাছ তেলোটাকি, রাগা, ঘাইরা বা গাচুয়া নামেও পরিচিত। ইংরেজিতে একে Ceylon snakehead বা Walking snakehead বলা হয়। পানির বাইরে সীমিত দূরত্বে নড়াচড়া করতে পারার ক্ষমতার কারণেই এ নাম।
চ্যাং আকারে টাকির তুলনায় ছোট। এর সবচেয়ে সহজ পরিচয় হলো পাখনার কিনারায় থাকা কমলা রঙের রেখা, যা দূর থেকেও আলাদা করে চেনা যায়।
বর্তমানে বাংলাদেশের জলাশয়ে চ্যাং মাছের দেখা খুবই কম মেলে। ২০১২ সালের বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন অনুযায়ী এটি সংরক্ষিত প্রাণী। ফলে এ মাছ ধরা বা শিকার করা আইনত নিষিদ্ধ।
অন্যদিকে, টাকি এখনো বাংলাদেশের অধিকাংশ জলাশয়ে পাওয়া যায় এবং আইইউসিএনের বাংলাদেশ লাল তালিকা অনুযায়ী বর্তমানে এটি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে নেই।
বাংলাদেশে টাকিজাতীয় মাছের মোট পাঁচটি প্রজাতি রয়েছে টাকি, শোল, গজার, তিলাশোল ও চ্যাং। এর মধ্যে শোল ও গজার আকারে সবচেয়ে বড় এবং বাজারে বেশি দেখা যায়। তিলাশোল তুলনামূলক কম পাওয়া গেলেও চ্যাং এখন সবচেয়ে বিরল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাছের ক্ষতরোগ এপিজুওটিক আলসিরেটিভ সিনড্রোম, জলাশয় ভরাট, নদী-নালা শুকিয়ে যাওয়া, রাসায়নিক দূষণ এবং অনিয়ন্ত্রিত মাছ শিকার এসব কারণে টাকিজাতীয় মাছের সংখ্যা ক্রমেই কমছে।
এদিকে কয়েক বছর আগে টাঙ্গাইলের একটি পুকুরে কমলা রঙের একটি টাকিজাতীয় মাছ পাওয়া যায়। স্থানীয়রা এর নাম দেন ‘কমলা টাকি’। তবে এটি পরিচিত কোনো প্রজাতির রূপভেদ নাকি নতুন কোনো প্রজাতি সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি মৎস্য বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, সাপমুখো মাছ দেখলেই টাকি ধরে নেওয়া ঠিক নয়। পাখনার কিনারায় কমলা রঙের দাগ থাকলে সেটি চ্যাং হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। আর চ্যাং যেহেতু সংরক্ষিত প্রজাতি, তাই এটি ধরা বা শিকার করা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
আরটিভি/এসকে