images

ফিচার

১৯৫২ সালে মহাসাগরে আছড়ে পড়া বিমান নিয়ে মিলল চাঞ্চল্যকর তথ্য 

বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬ , ১১:৫৭ এএম

উড্ডয়নের মাত্র ৯ মিনিটের মাথায় আটলান্টিক মহাসাগরে বিধ্বস্ত হয়েছিল প্যান আমেরিকান এয়ারওয়েজের একটি যাত্রীবাহী বিমান। দুর্ঘটনার ৭৪ বছর পর অবশেষে সমুদ্রের প্রায় দুই হাজার ফুট গভীরে মিলেছে সেই বিমানের ধ্বংসাবশেষ। আধুনিক সোনার প্রযুক্তি ও পানির নিচে চলাচলকারী ড্রোন ব্যবহার করে এই ধ্বংসাবশেষ শনাক্ত করেছে অনুসন্ধানকারী দল।

১৯৫২ সালের ১১ এপ্রিল স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ১১ মিনিটে পুয়ের্তো রিকোর সান হুয়ানের ইসলা গ্রান্দে বিমানবন্দর থেকে নিউইয়র্কের উদ্দেশে উড্ডয়ন করে প্যান আমেরিকান এয়ারওয়েজের ডগলাস ডিসি-৪ ফ্লাইট ৫২৬এ। উড্ডয়নের মাত্র ৯ মিনিট পর বিমানটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আটলান্টিক মহাসাগরে আছড়ে পড়ে।

বিমানটিতে ৬৪ জন যাত্রী এবং পাইলটসহ পাঁচজন ক্রু সদস্য ছিলেন। দুর্ঘটনার পর মাত্র ১৭ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল। বাকিরা আটলান্টিক মহাসাগরে প্রাণ হারান। দুর্ঘটনার তিন মিনিটের মধ্যেই বিমানটি সমুদ্রের গভীরে তলিয়ে যায়।

দীর্ঘ ৭৪ বছর পর ডিসকভারি চ্যানেলের ‘এক্সপেডিশন আননোন’ দলের সদস্যরা বিমানের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পান। এই অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের ‘এয়ার/সি হেরিটেজ ফাউন্ডেশন’ এবং ‘ডিপ সি ভিশন’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এয়ার/সি হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের সভাপতি রাস ম্যাথিউস বলেন, 'এই আবিষ্কারে আমরা যেমন বিস্মিত, তেমনই উচ্ছ্বসিত। এত বছর আগে এই জায়গায় যা ঘটেছিল, তা বিনম্র ভাবে স্মরণ করছি।'

অনুসন্ধানকারীরা জানিয়েছেন, সমুদ্রের প্রায় দুই হাজার ফুট গভীরে ধ্বংসাবশেষটি শনাক্ত করা হয়েছে। ১৯৫২ সালের দুর্ঘটনার পর একাধিকবার অনুসন্ধান চালানো হলেও এত দিন কোনো সাফল্য মেলেনি। এবার উচ্চ রেজল্যুশনের সোনার প্রযুক্তি এবং স্বয়ংক্রিয় পানির নিচের ড্রোন ব্যবহার করে ধ্বংসাবশেষের অবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।

ডিসকভারি চ্যানেল জানিয়েছে, পুয়ের্তো রিকোর উত্তর উপকূল থেকে কিছু দূরে আটলান্টিক মহাসাগরের তলদেশে বিমানটির ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে।

তদন্তে জানা যায়, বিমানের রক্ষণাবেক্ষণের ত্রুটির কারণেই দুর্ঘটনাটি ঘটে। উড্ডয়নের কিছুক্ষণের মধ্যেই বিমানের তিন নম্বর ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। তখন বিমানটির উচ্চতা ছিল মাত্র ৩৫০ ফুট। পরিস্থিতি বুঝে পাইলট ক্যাপ্টেন জন সি. বার্ন বিমানটি আবার পুয়ের্তো রিকোয় ফিরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বিমানটির দিক পরিবর্তন করে ৫৫০ ফুট পর্যন্ত ওপরে তুলতে সক্ষম হন। কিন্তু ঠিক তখনই চার নম্বর ইঞ্জিনও বিকল হয়ে যায়। এরপর বিমানটি দ্রুত উচ্চতা হারিয়ে সমুদ্রে পড়ে যায়।

অভিজ্ঞ পাইলট জন সি. বার্ন জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে সমুদ্রে বিমান অবতরণের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কোস্ট গার্ডকে জানান, ইসলা গ্রান্দে বিমানবন্দর থেকে প্রায় সাত মাইল উত্তর-উত্তর-পশ্চিমে তিনি পানিতে অবতরণ করবেন।

দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে বিমানটি সমুদ্রে নামে। আঘাতের সময় সেটি দুই টুকরো হয়ে গেলেও শুরুতে অনেক যাত্রী জীবিত ছিলেন। তারা বিমানের ভাঙা অংশ ধরে ভেসে থাকার চেষ্টা করেন। পরে উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও উত্তাল ঢেউ ও ঠান্ডা পানির কারণে অনেক যাত্রী লাইফবোটে উঠতে পারেননি। ফলে তাদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

এই দুর্ঘটনার পর সমুদ্রপথে চলাচলকারী বিমানের যাত্রীদের জন্য জরুরি পরিস্থিতিতে বাঁচার প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়। একই সঙ্গে উড্ডয়নের আগে নিরাপত্তা নির্দেশনা দেওয়া, জরুরি পরিস্থিতিতে কী করতে হবে তা দেখিয়ে দেওয়া এবং অন্যান্য নিরাপত্তা বিধিও বাধ্যতামূলক করা হয়।

তদন্তে আরও জানা যায়, দীর্ঘদিন বিমানের ইঞ্জিনগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি। কয়েকটি যন্ত্রাংশে ত্রুটি ছিল, যা উড্ডয়নের আগে শনাক্ত করা হয়নি। তদন্তকারীরা শেষ পর্যন্ত যান্ত্রিক ত্রুটি ও রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতিকেই দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। যদিও দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়া ক্যাপ্টেন জন সি. বার্নকে আইনি প্রক্রিয়া শেষে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছিল।

আরও পড়ুন
vdw

কলকাতা বিমানবন্দরে যাত্রীর ব্যাগে মিলল ৭০৭ কচ্ছপ

দুর্ঘটনার পর থেকে বিমানের ধ্বংসাবশেষ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের আগ্রহ ছিল। বহুবার অনুসন্ধান চালিয়েও সেটির কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। ২০২৪ সালেও একটি অভিযান ব্যর্থ হয়েছিল। অবশেষে আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় ধ্বংসাবশেষটি শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। অনুসন্ধানকারীরা সমুদ্রের তলদেশে ধ্বংসাবশেষের অন্তত সাড়ে তিন লাখ ছবি তুলেছেন। তবে দুর্ঘটনায় নিহতদের দেহাবশেষ উদ্ধারের কোনো পরিকল্পনা আপাতত নেই।

আরটিভি /এসএস