images

অন্যান্য / মুক্তমত / শিল্প-সাহিত্য

স্মরণ : বহুমাত্রিক আবু হেনা মোস্তফা কামাল

শনিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩ , ০৩:১৭ পিএম

‘ওই যে আকাশ নীল হলো আজ
সে শুধু তোমার প্রেমে
ওই যে বাতাস বাঁশি হলো আজ,
সে শুধু আমার প্রেমে...’, 

১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যা সাতটায় ফেরদৌসী রহমানের এ গানটি দিয়েই শুরু হয় বাংলাদেশ টেলিভিশনের পথচলা। গানটির রচয়িতা ছিলেন আবু হেনা মোস্তফা কামাল। 

আজ আবু হেনা মোস্তফা কামালের ৩৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। মাত্র ৫৩ বছর বয়সে মৃত্যু হয় ক্ষণজন্মা এ মানুষটির। 

সাবিনা ইয়াসমিন ও মাহমুদুন্নবীর গলায় সুবল দাসের সুরে ‌‘তুমি যে আমার কবিতা, আমার বাঁশীর রাগিনী, আমার স্বপন আধ-জাগরণ, চিরদিন তোমারে চিনি’, অথবা রুনা লায়লার গলায় ‘অনেক বৃষ্টি ঝরে তুমি এলে, যেন এক মুঠো রোদ্দুর আমার দুচোখ ভরে তুমি এলে’, রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত চলচ্চিত্রে ‘কতো সাধনায় এমন ভাগ্য মেলে’র মতো তার লেখা গানগুলো আজও রয়েছে মানুষের পছন্দের শীর্ষে।

কেবল গীতিকারই নন একাধারে কবি, শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, গবেষক ও সমালোচক আবু হেনা মোস্তফা কামাল ১৯৩৬ সালের ১৩ মার্চ জন্ম নেন পাবনা জেলার উল্লাপাড়ার গোবিন্দা গ্রামে। 

১৯৫২ সালে পাবনা জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পুরো বাংলাদেশ তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান থেকে ১৩তম এবং ১৯৫৪ সালে ঢাকা কলেজ থেকে সপ্তম স্থান অধিকার করেন। তবে এত ভালো ফল নিয়ে কেন বাংলা সাহিত্যকে বেছে নেওয়া তা নিয়ে ভাইবা বোর্ডে প্রশ্নের মুখে পড়েছিলেন স্বয়ং ড. মো. শহীদুল্লাহর। সাহিত্যের প্রতি অনুরাগই যে এর মূল কারণ, জানিয়েছিলেন অকপটে। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগ হতে ১৯৫৮ সালে অনার্সসহ বিএ এবং ১৯৫৯ সালে এমএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন, অর্জন করেন প্রথম স্থান।  

তুখোর মেধাবী অনন্য এ ব্যক্তিত্ব মেধার প্রমাণ দিয়েছিলেন তার পিএইচডি গবেষণাক্ষেত্রেও। ১৯৬৯ সালে মাত্র ২ বছরেই লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘দ্য বেঙ্গলি প্রেস অ্যান্ড লিটারারি রাইটিং (১৮১৮-১৮৩১)’ শীর্ষক অভিসন্দর্ভের জন্য পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। 

তিনি দেশের একজন শক্তিমান কবি। জীবদ্দশায় তিনি লিখে গেছেন আপন যৌবন বৈরী (১৯৭৪), যেহেতু জন্মান্ধ (১৯৮৪) ও আক্রান্ত গজল (১৯৮৮) নামে তিনটি কাব্যগ্রন্থ। প্রাবন্ধিক হিসেবেও তার সাফল্য ছিল অভাবনীয়। ‘শিল্পীর রূপান্তর’ (১৯৭৫) এবং ‘কথা ও কবিতা’(১৯৮১) নামে মাত্র দুটি প্রবন্ধগ্রন্থ বেরিয়েছে। এর বাইরে তার বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ অসংকলিত রয়ে গেছে।

বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপনার সুযোগে প্রবন্ধ সাহিত্য ও সমালোচনা সাহিত্যের একটি আলাদা ধারা তৈরি করেন আবু হেনা মোস্তফা কামাল, যা আজও রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করেন ভাষা গবেষক ও সাহিত্যিকরা। 

পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে শিক্ষকতা দিয়ে শুরু হয় তার বর্ণাঢ্য কর্মজীবন। ১৯৬২ সালে তিনি জনসংযোগ পরিদপ্তরে সহকারী পরিচালক পদে যোগদান করেন। ১৯৬৩ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে লেকচারার হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৬৫ সালে তিনি বাংলা বিভাগের সিনিয়র লেকচারার হয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। তিনি ১৯৬৬ সালে কমনওয়লথ বৃত্তি নিয়ে উচ্চতর গবেষণার জন্য লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে যান। ১৯৭৩ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক পদে যোগ দেন। ১৯৭৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগে অধ্যাপক পদে যোগদান করেন। ১৯৮৪ সালে তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক এবং ১৯৮৬ সালে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক নিযুক্ত হন। 

রেডিও, টেলিভিশনে বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেও দারুণ জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন। 

পেয়েছেন আলাওল সাহিত্য পুরস্কার (১৯৭৫), সুহূদ সাহিত্য স্বর্ণপদক (১৯৮৬), একুশের পদক (১৯৮৭), আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ স্বর্ণপদক (১৯৮৯), সাদত আলী আকন্দ স্মৃতি পুরস্কার (১৯৯১)-এ ভূষিত হন। 

১৯৮৯ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন বরেণ্য এ ব্যক্তিত্ব।

সাংবাদিক নাইমুল ইসলাম খানের মুখ থেকে শুনেছি অসম্ভব স্পষ্টভাষী, অনন্য মেধাবী আবু হেনা মোস্তফা কামাল সম্পর্কে। তিনি নাকি প্রায়ই নিজের মুখে বলতেন, ‘একজন আবু হেনা একবারই আসে। যুগে যুগে জন্মায় না।’
 
অসাধারণ রসবোধ আর রুচিবোধের চমৎকার এক মিশেল, তার অনন্য বাচনভংগির এই মানুষটি জন্মসূত্রে আমার নানা হন। গণমাধ্যমের ক্ষুদ্র এক কর্মী হিসেবে খানিকটা দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে মৃত্যুদিনে তাঁকে স্মরণ করছি শ্রদ্ধাভরে।

লেখক : নিউজরুম এডিটর, আরটিভি