শনিবার, ২২ নভেম্বর ২০২৫ , ০৯:৪৮ এএম
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) একজন রিকশাচালককে ঢাকা-৮ আসনে মনোনয়ন দিয়েছে। খবর প্রকাশ হতেই ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়েছে। আমি নিউজটি দেখে ভীষণ অবাক এবং শকড হয়েছি। এনসিপি আসলে কী করছে? অনেকে বলছে এনসিপি কি মির্জা আব্বাসকে অপমান করার জন্য এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, নাকি এটা নিছক রাজনৈতিক বোকামি? কেউ মনে করছেন এটি একটি মিডিয়া স্টান্ট।
চারপাশে শুধু প্রশ্ন, এই সিদ্ধান্ত কি সত্যিই রাজনৈতিক sharpness বুদ্ধিমত্তার প্রকাশ, নাকি নিজেদের হাস্যকর অবস্থায় ফেলেছে দলটি? অনেকে আবার ব্যাপক আবেগী হয়ে বলছে ‘গরিব বলে সে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে না?’। কিন্তু আসল ইস্যু গরিব-ধনী নয়। রাষ্ট্র পরিচালনা কোনো আবেগের বিষয় নয়, এটা হলো (wisom) জ্ঞান, দক্ষতা এবং রাজনৈতিক দূরদর্শিতার কঠিন পরীক্ষার ক্ষেত্র।
একজন মানুষ রিকশা চালান, মাঠে কাজ করেন, ক্রিকেট খেলেন, সিনেমার নায়ক বা গান গাইতে পারেন। কিন্তু রাজনীতিতে আসা বা সংসদ সদস্য হওয়া মানে দেশের নীতি, আইন, অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি এবং ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা। এই দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক জ্ঞান, প্রশাসনিক দক্ষতা, নীতি দর্শনের ধারণা, অভিজ্ঞতা এবং রাষ্ট্রশাস্ত্রের গভীর বোঝাপড়া। শুধুমাত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে এসব অর্জন হয় না।
Plato তার Republic এ রাষ্ট্রকে একটি জাহাজের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, সাগরে যাত্রা করা জাহাজ যদি দিকনির্দেশনা না বোঝে, আবহাওয়ার ভাষা না জানে, নেভিগেশন না বোঝে, অভিজ্ঞতা নেই এমন মানুষের হাতে তুলে দেওয়া হয়, তাহলে জাহাজের ভবিষ্যৎ নিরবচ্ছিন্নভাবে ডুবে যাওয়াই।
Plato বলেছেন, Everybody wants to be the captain, but almost nobody learns the art of navigation. গণতন্ত্রের ক্ষেত্রেও ঠিক একই সমস্যা দেখা দেয়। যদি জনপ্রিয়তা, আবেগ বা ‘ভালোলাগা’ দিয়ে রাষ্ট্রের স্টিয়ারিং দেওয়া হয়, রাষ্ট্রও জাহাজের মতো ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
সক্রেটিসও বলেছিলেন ক্ষমতা একটি দক্ষতা, যা শেখা, অনুশীলন এবং অভিজ্ঞতার মাধ্যমে অর্জিত হয়। আজকের বাংলাদেশে ঠিক এটি ঘটছে। যারা রাষ্ট্র, আইন, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং প্রশাসনের বিষয়ে অজ্ঞ, তারা আবেগ, জনপ্রিয়তা বা ‘গরিব কার্ড’ ব্যবহার করে সংসদে প্রবেশ করছে।
এখানে গরিবদের ছোট করার কোনো লক্ষ্য নেই, রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলা হচ্ছে। যারা এই রিকশাচালক মনোনয়নের বিরোধে ‘গরিবকে ছোট করা হচ্ছে’ যুক্তি তুলে ধরছে, তারা আসল সমস্যাকে আড়াল করছে। রাষ্ট্র পরিচালনা হলো দেশের ১৮ কোটি মানুষের জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন। এটা কোনো আবেগের থিয়েটার নয়।
গত সংসদে আমরা দেখেছি—গায়িকা, নায়িকা, ক্রিকেটার এবং অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের পাঠানো হয়েছে। ফলাফল ছিল পেশাদারিত্বহীন নীতিনির্ধারণ, বিশৃঙ্খল নীতি এবং দুর্বল নৈতিক অবস্থান। কোনো উন্নয়নশীল রাষ্ট্র এভাবে এগোতে পারে না।
নারী কোটাতেও যখন পুরুষরা অশিক্ষিত ও রাজনৈতিকভাবে inexperienced নারীদের সংসদে বসান, তখন নারী অধিকার ও সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত নারীর সমস্যার সমাধান হয় না। বাংলা ঠিকমতো পড়তে না পারা, রাজনৈতিক লিটারেসি বা সংসদের কাজের ধারণা না থাকা নারীরা কীভাবে দেশের বাস্তব সমস্যা সমাধান করতে পারবে? কীভাবে তারা দেশের অর্ধেক জনগণকে, অর্থাৎ নারীদের, যথাযথভাবে প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে?
এভাবে নারী কোটার ব্যবহার নারীর মর্যাদা অবমূল্যায়ন করে। এটি নারীর গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্ব নয়; গণতন্ত্রের নাম ব্যবহার করে নারীকে প্রদর্শনের বিষয় বানিয়ে নারীপ্রতিনিধিত্বকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়।
সর্বোপরি প্রশ্ন হলো, রিকশাচালক সংসদে প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে কি? সমস্যা পেশা নয়, সমস্যা দক্ষতা। তিনি কি রাষ্ট্রচালনার জ্ঞান রাখেন, আইন, সংবিধান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও রাজনৈতিক দর্শন বোঝেন, জাতীয় বাজেট, অর্থনীতি এবং পররাষ্ট্রনীতি বুঝতে পারবেন? দেশের জটিল সংকট মোকাবিলার জন্য সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন?
যদি উত্তর না হয়, তাহলে তাকে সংসদে পাঠানো জনগণের প্রতি অবিচার। রাষ্ট্র পরিচালনা করতে আবেগ লাগে না, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মস্তিষ্ক লাগে। প্লেটো এর শিপ অফ দ্যা স্টেট অনুযায়ী, ভুল হাতে রাষ্ট্রের দায়িত্ব দিলে জাহাজের মতো রাষ্ট্রও ডুবে যায়।
লেখক: শিক্ষক ও গবেষক
আরটিভি/আইএম