মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ , ০৮:৫৫ পিএম
বাংলাদেশে পরিবেশ ধ্বংস নতুন কোনো ঘটনা নয়। নদী দখল, বায়ু দূষণ, শব্দ দূষণ, বন উজাড়, প্লাস্টিকের আগ্রাসন—সবই আমাদের নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা। তবু আশ্চর্য বাস্তবতা হলো, এত ক্ষতির পরও পরিবেশ এখনো বাংলাদেশে শক্ত কোনো রাজনৈতিক ন্যারেটিভ হয়ে উঠতে পারেনি। পরিবেশ আন্দোলন আছে, সমস্যা আছে, তথ্য আছে—কিন্তু নেই সেই ভাষা, যা ক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
আমরা পরিবেশকে প্রায়ই দেখি একটি ভালো কাজ হিসেবে—গাছ লাগানো, পরিষ্কার অভিযান, দিবস পালন। কিন্তু খুব কমই দেখি এটিকে অধিকার, ন্যায়বিচার ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার প্রশ্ন হিসেবে। ফলে পরিবেশের আলোচনা থেমে যায় সহানুভূতিতে, রূপ নেয় না প্রতিবাদে।
সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো—ক্ষতির গল্প আছে, কিন্তু দায়ের গল্প নেই। আমরা বলি নদী মরে যাচ্ছে, কিন্তু বলি না কার সিদ্ধান্তে সেই নদীর মৃত্যু। বলি বায়ু দূষণে শিশুরা অসুস্থ, কিন্তু প্রশ্ন করি না—কেন অবৈধ ইটভাটা বছরের পর বছর চলছে, কার ছত্রচ্ছায়ায়। যখন দায় নির্ধারণ হয় না, তখন আন্দোলনও দাঁতহীন হয়ে পড়ে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো তথাকথিত “উন্নয়ন বনাম পরিবেশ” দ্বন্দ্ব। এক্সপ্রেসওয়ে, শিল্পাঞ্চল, বিদ্যুৎকেন্দ্র—এসব প্রকল্পকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন পরিবেশের প্রশ্ন তোলা মানেই উন্নয়নবিরোধিতা। অথচ বাস্তবতা হলো, দূষিত বাতাসে অসুস্থ জনগোষ্ঠী, পানিশূন্য শহর, বসবাসের অযোগ্য নগর—কোনোটাই টেকসই উন্নয়নের লক্ষণ নয়। পরিবেশ ধ্বংস করে যে উন্নয়ন, তা আসলে ভবিষ্যৎকে বন্ধক রাখা।
রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও রয়েছে দ্বৈততা। কাগজে-কলমে আইন আছে, নীতিমালা আছে, প্রতিষ্ঠান আছে—যেমন পরিবেশ অধিদপ্তর। কিন্তু বাস্তবে প্রয়োগ দুর্বল, শাস্তি বিরল, জবাবদিহি অনুপস্থিত। এই ব্যবধান নাগরিকদের মধ্যে হতাশা তৈরি করে—এবং আন্দোলনের ভাষাকে করে নিস্তেজ।
পরিবেশ দূষণ কোনো বানানো গল্প নয়, কোনো অতিরঞ্জিত ভয়ের কল্পকাহিনিও নয়। এটি আমাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা। বাংলাদেশে পরিবেশের প্রায় প্রতিটি সেক্টরই আমরা ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছি। নদীকে আমরা মেরে ফেলছি—শিল্পবর্জ্য, দখল আর বালু উত্তোলনের মাধ্যমে। বাতাসকে বিষাক্ত করছি ইটভাটা, পুরোনো যানবাহন আর নিয়ন্ত্রণহীন নির্মাণকাজে। শহরের মাটি প্লাস্টিক, পলিথিন আর বিষাক্ত বর্জ্যে শ্বাসরুদ্ধ। শব্দদূষণে মানুষ, পাখি, শিশু—কেউই নিরাপদ নয়। বন উজাড় হচ্ছে উন্নয়নের নামে, আর পাহাড় কাটা হচ্ছে প্রশাসনের চোখের সামনেই।
এই বাস্তবতার মাঝেই আমাদের একটি সহজ গল্প শেখানো হয়—পরিবেশ রক্ষা মানে ব্যক্তিগত আচরণ বদলানো। আপনি ময়লা ফেলবেন না, প্লাস্টিক কম ব্যবহার করবেন, গাছ লাগাবেন। নিঃসন্দেহে এগুলো প্রয়োজনীয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শুধু ব্যক্তি পর্যায়ের দায় চাপিয়ে দিয়ে কি পরিবেশ বাঁচানো সম্ভব? যে নদীতে প্রতিদিন হাজার হাজার টন শিল্পবর্জ্য পড়ে, সেখানে একজন নাগরিকের সচেতনতা কতটা কার্যকর? যে শহরে পরিকল্পনাহীন উন্নয়ন, সেখানে একজন মানুষের পরিবেশবান্ধব অভ্যাস কীভাবে কাঠামোগত ধ্বংস ঠেকাবে?
পরিবেশ ধ্বংসের বড় সিদ্ধান্তগুলো আসে নীতিনির্ধারণের টেবিল থেকে—কোথায় শিল্প হবে, কোন ইটভাটা বৈধ হবে, কোন নদী দখলমুক্ত হবে, কোন আইন কার্যকর হবে আর কোনটি কাগজেই থাকবে। এখানে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া কোনো পরিবর্তন সম্ভব নয়। যখন দূষণকারী প্রতিষ্ঠান শাস্তি পায় না, যখন পরিবেশ আইন প্রয়োগ হয় নির্বাচনী হিসাব–নিকাশে, তখন ব্যক্তি পর্যায়ের নৈতিকতা একা পড়ে যায়।
পরিবেশ সুরক্ষা তাই কেবল নৈতিকতার বিষয় নয়; এটি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রশ্ন। সরকার কী ধরনের উন্নয়ন চায়, কীকে অগ্রাধিকার দেয়, কার স্বার্থ রক্ষা করে—এসবের ওপরই পরিবেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। ব্যক্তি সচেতনতা প্রয়োজন, কিন্তু তা কখনোই বিকল্প হতে পারে না রাষ্ট্রের দায় এড়িয়ে যাওয়ার।
পরিবেশ বাঁচাতে হলে আমাদের গল্প বদলাতে হবে। আপনি সচেতন হন—এই বাক্যের পাশে যোগ করতে হবে, রাষ্ট্র ও রাজনীতি জবাবদিহির আওতায় আসুক। কারণ নদী, বাতাস, বন—এগুলো ব্যক্তির হাতে নয়; রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তেই বাঁচে বা মরে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মধ্যবিত্ত ও তরুণদের ব্যক্তিগত কষ্ট এখনো রাজনৈতিক দাবিতে রূপ নিচ্ছে না। বায়ু দূষণে অফিসগামী মানুষ ক্লান্ত, শব্দ দূষণে ঘুমহীন শহর, প্লাস্টিকে নষ্ট ড্রেনেজ—সবাই ভোগে, কিন্তু কেউ বলে না: “এটা আমার ভোটের প্রশ্ন।” যতদিন পরিবেশ ভোটের মানদণ্ড হবে না, ততদিন রাজনীতিও একে গুরুত্ব দেবে না।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, Fridays for Future (FFF) হলো ২০১৮ সালে Greta Thunberg–এর নেতৃত্বে শুরু হওয়া একটি আন্তর্জাতিক তরুণদের জলবায়ু আন্দোলন। এর লক্ষ্য ছিল সরকারগুলোকে বিজ্ঞানভিত্তিক ও শক্তিশালী জলবায়ু নীতি নিতে বাধ্য করা।
আন্দোলনটি কেবল রাস্তায় প্রতিবাদেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; ইউরোপীয় পার্লামেন্টসহ রাজনৈতিক ফোরামে জলবায়ু ইস্যুকে সরাসরি ভোট ও নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
এই চাপের ফলে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সবুজ রাজনীতি শক্তিশালী হয় এবং European Green Party ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান নেয়। অনেক দেশ নির্গমন কমানো ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্য বাড়াতে বাধ্য হয়।
গবেষণা দেখায়, FFF তরুণ ভোটারদের মানসিকতা বদলে জলবায়ুকে ভোটের গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় পরিণত করেছে এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে পরিবেশবান্ধব প্রতিশ্রুতি দিতে চাপ সৃষ্টি করেছে।
বাংলাদেশে পরিবেশ আন্দোলন তাই এখনো ইভেন্ট-কেন্দ্রিক। বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আলোচনা হয়, ছবি ওঠে, বিবৃতি আসে—কিন্তু নির্বাচনী ইশতেহারে পরিবেশ অনুপস্থিত থাকে। প্রার্থীদের কেউ জিজ্ঞেস করে না—পাঁচ বছরে বায়ু দূষণ কমাতে আপনি কী করবেন? নদী রক্ষা আপনার অগ্রাধিকার তালিকায় কোথায়?
এই জায়গায় আমাদের ন্যারেটিভ বদলানো জরুরি। পরিবেশকে বলতে হবে মানবাধিকার ও ন্যায়ের ভাষায়। বলতে হবে—পরিবেশ ধ্বংস মানে স্বাস্থ্যহানি, অর্থনৈতিক ক্ষতি, সামাজিক বৈষম্য। প্রশ্ন তুলতে হবে—উন্নয়ন কার জন্য, আর ক্ষতি কার ঘাড়ে?
বাংলাদেশে পরিবেশ সংকট ভয়াবহ হলেও পরিবেশের গল্প এখনো দুর্বল। কারণ আমরা দুঃখের কথা বলছি, কিন্তু ক্ষমতার প্রশ্ন তুলছি না। যেদিন পরিবেশ হবে ভোটের ইস্যু, সেদিনই এটি হয়ে উঠবে প্রকৃত রাজনৈতিক ইস্যু।
পরিবেশ সংকট বাংলাদেশে আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, এটি বর্তমানের রাজনৈতিক বাস্তবতা। বাতাসে শ্বাস নেওয়া, নিরাপদ পানি পাওয়া, বসবাসযোগ্য শহরে থাকা—এসব কোনো বিলাসিতা নয়, নাগরিক অধিকার। তবু আমরা পরিবেশকে এখনো ব্যক্তিগত নৈতিকতার বিষয় হিসেবে দেখছি, রাষ্ট্রের দায় ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রশ্ন হিসেবে নয়। এই দৃষ্টিভঙ্গিই আমাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।
যতদিন পরিবেশ ধ্বংসের দায় নির্ধারিত হবে না, যতদিন দূষণকারী শক্তিগুলো জবাবদিহির বাইরে থাকবে, ততদিন কোনো গাছ লাগানো কর্মসূচি বা সচেতনতামূলক দিবস পরিবেশকে রক্ষা করতে পারবে না। পরিবেশ রক্ষার লড়াই মানে ক্ষমতার কাঠামোকে প্রশ্ন করা, উন্নয়নের নামে কারা লাভবান হচ্ছে আর কারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে—এই প্রশ্ন সামনে আনা।
পরিবেশ যখন ভোটের ইস্যু হবে, যখন নাগরিকরা বলবে—পরিবেশ আমার জীবনের প্রশ্ন, আমার ভোটের প্রশ্ন—ঠিক তখনই রাজনীতিও বাধ্য হবে একে গুরুত্ব দিতে। বাংলাদেশে পরিবেশ আন্দোলনের ভবিষ্যৎ তাই রাস্তার স্লোগানে নয়, ব্যালটের ভাষায় লিখতে হবে। কারণ পরিবেশ বাঁচে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তে, আর রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত বদলায় রাজনৈতিক চাপে।
লেখক: পরিবেশ ও নারী অধিকারকর্মী
আরটিভি/এসআর