সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬ , ০২:১৯ পিএম
বাংলাদেশের জেলার গুলোর মধ্যে অন্যতম ময়মনসিংহ। সেই ময়মনসিংহের মধ্যে অন্যতম উপজেলার নাম ত্রিশাল। এই ত্রিশালের মফস্বলের মাঝেই গড়ে উঠেছে একটি বিশ্ববিদ্যালয়। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।
ত্রিশালের বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ পেরিয়ে যখন সকালের কুয়াশা ধীরে ধীরে সরে যায়, তখন সূর্যের আলো এসে পড়ে সবুজে মোড়ানো এই বিশ্ববিদ্যালয়ে। চারপাশে ধানক্ষেত, দূরে গ্রামীণ পথ, মাঝখানে তরুণদের স্বপ্নে ভরা এক ক্যাম্পাস এ যেন গ্রামবাংলার বুকেই দাঁড়িয়ে থাকা জ্ঞানের এক আলোকস্তম্ভ।
শহরের কোলাহল ও যানবাহনের শব্দ থেকে দূরে, মফস্বলের শান্ত পরিবেশে গড়ে ওঠা এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি হাজারো শিক্ষার্থীর আশা, সংগ্রাম, ভালোবাসা আর স্বপ্নের ঠিকানা। এখানে দিনের শুরু হয় পাখির কিচিরমিচির শব্দে আর শিক্ষার্থীদের ব্যস্ত পদচারণায়। কেউ ক্লাসে ছুটছে, কেউ লাইব্রেরিতে বসে পড়ছে, কেউবা সবুজ ঘাসে কিংবা হলের রুমে বসে বন্ধুর সঙ্গে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করছে।
প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ও আদর্শ
২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রেম ও দ্রোহের কবি কাজী নজরুল ইসলামের নাম। বিদ্রোহ, মানবতা ও সাম্যের কবি কাজী নজরুল ইসলামের আদর্শ, তাঁর চেতনা, অসাম্প্রদায়িকতা, সাম্য ও সাংস্কৃতিক জাগরণ ক্যাম্পাসজুড়ে এক বিশেষ আবহ তৈরি করেছে। এখানে পড়াশোনা মানে শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান নয়, মানে সংস্কৃতি, সাহিত্য ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চাও তাইতো এই বিশ্ববিদ্যালয়কে সাংস্কৃতিক বিশ্ববিদ্যালয়ও বলা হয়।
গ্রামঘেরা পরিবেশ, মনোযোগী শিক্ষা
মফস্বলের বিশ্ববিদ্যালয় বললেই অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে সুযোগ-সুবিধা কেমন? কিন্তু এই ক্যাম্পাসে এসে বোঝা যায়, প্রকৃতির নৈকট্য কখনো কখনো বড় শক্তি হয়ে ওঠে। শহরের যানজট বা শব্দদূষণ নেই, আছে প্রশান্ত পরিবেশ। ফলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারে সহজেই।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী নেকবার কবির সাজিদ বলেন, `শহরে পড়লে হয়তো আরও সুযোগ পেতাম, কিন্তু এখানে যে শান্তি পাই, সেটা অন্য কোথাও পাওয়া কঠিন। এখানের পরিবেশ গ্রামীণ, খরচ তুলনামূলক কম, বন্ধুত্ব, সম্প্রীতি সবকিছু যেন একটু বেশি আন্তরিক।'
একাডেমিক ও সাংস্কৃতিক প্রাণচাঞ্চল্য
বর্তমানে বিভিন্ন অনুষদ ও বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। নিয়মিত সেমিনার, কর্মশালা ও গবেষণা কার্যক্রম বিশ্ববিদ্যালয়কে একাডেমিকভাবে সমৃদ্ধ করছে।
একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক আয়োজন এই ক্যাম্পাসের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। নজরুলসংগীত, আবৃত্তি, নাটক কিংবা জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠান সবখানেই শিক্ষার্থীদের সরব উপস্থিতি। পবিত্র রমজান মাসে কেন্দ্রীয় ইফতার আয়োজন কিংবা বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগ ক্যাম্পাসে একধরনের পারিবারিক বন্ধন তৈরি করে। এখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কও অনেকটাই ঘনিষ্ঠ ও আন্তরিক।
হল জীবন ও মানবিক সম্পর্ক
আবাসিক হলের জীবন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। সন্ধ্যায় হলের বারান্দায় আড্ডা, পরীক্ষার আগে রাত জেগে গ্রুপ স্টাডি, কিংবা কোনো উৎসবকে ঘিরে সম্মিলিত প্রস্তুতি এসব মুহূর্তই গড়ে তোলে স্মৃতিময় এক ছাত্র জীবন। গ্রামাঞ্চলের মানুষের সঙ্গেও বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক নিবিড়। স্থানীয় বাজার, চায়ের দোকান কিংবা পথচলতি মানুষের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সহজ যোগাযোগ একধরনের সামাজিক সম্প্রীতির চিত্র তুলে ধরে। এখানের গ্রামাঞ্চলের মানুষ এই বিশ্ববিদ্যালয়কে ত্রিশাল ভার্সিটি কিংবা নজরুল ভার্সিটি নামেই চিনে।
চ্যালেঞ্জও আছে
তবে সবকিছুই যে নিখুঁত, তা নয়। যোগাযোগব্যবস্থা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা কিংবা আবাসন সংকট এসব চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে। কখনো কখনো শিক্ষার্থীরা স্বাস্থ্যগত সমস্যা, আধুনিক চিকিৎসা, ময়মনসিংহ শহরে যাওয়ার সহজ যাতায়াত ব্যবস্থা নেই। শহরে যেতে হলে অনেক সময় দীর্ঘ জ্যাম পেরিয়ে যেতে হয়।
তবুও সীমাবদ্ধতার মাঝেও এগিয়ে চলার চেষ্টা থেমে নেই। প্রশাসনের বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা ও শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও এগিয়ে নিচ্ছে।
সম্ভাবনার দিগন্ত
মফস্বলের এই বিশ্ববিদ্যালয় আজ শুধু একটি আঞ্চলিক শিক্ষাকেন্দ্র নয়, এটি রাজধানী ঢাকা থেকে কাছে হওয়ায় উচ্চশিক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ ভরকেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। গবেষণা সম্প্রসারণ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক সংযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে ভবিষ্যতে এটি আরও বৃহৎ পরিসরে ভূমিকা রাখবে এমন প্রত্যাশা সবার।
সবুজে ঘেরা, সরলতায় ভরা এই ক্যাম্পাস যেন প্রমাণ করে উচ্চশিক্ষার আলোকবর্তিকা জ্বালাতে সবসময় বড় শহরের প্রয়োজন হয় না। কখনো গ্রামবাংলার নীরব প্রকৃতিও হয়ে উঠতে পারে জ্ঞানের উজ্জ্বল বাতিঘর। তাইতো এখান থেকেই প্রতি বছর কেও বিসিএস, বিজিএস, বার কাউন্সিল, শিক্ষকতা সহ অন্যান্য চাকরী পরীক্ষায় সাফল্যের সাথে ভালো করছে।
মফস্বলের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা এই বিশ্ববিদ্যালয় তাই শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, এটি এক স্বপ্নের নাম যেখানে গ্রাম আর জ্ঞান হাত ধরাধরি করে এগিয়ে চলছে আগামীর পথে।
নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে প্রশাসনের ভাবনা
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় এর উন্নয়ন নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য ডা. মাহাবুবুর রহমান লিটন। তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল এবং প্রতিষ্ঠার পেছনে তাঁরও অবদান রয়েছে।
তিনি বলেন, 'বৃহত্তর ময়মনসিংহ সাংস্কৃতিক ফোরামের ছোট্ট একটি ঘর থেকে শুরু করে আজ বিশ্ববিদ্যালয় এই অবস্থানে এসেছে। যখনই এখানে আসি, মনে হয় কী থেকে কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে এই প্রতিষ্ঠান।'
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের স্মৃতি তুলে ধরে তিনি জানান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া কে নিয়ে এসে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করানো হয়েছিল। দীর্ঘ ১৭ বছর পর ক্যাম্পাসে ফিরে এসে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশের প্রশংসা করেন এবং বলেন, অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় এখানকার পরিবেশ আরও সুন্দর ও স্বতন্ত্র, যা সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল।
তবে উন্নয়নের পথে কিছু সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরেন তিনি। শিক্ষার্থীর তুলনায় শিক্ষকসংখ্যা কম, ভবনগুলোর মধ্যে পর্যাপ্ত দূরত্ব নেই, সবুজায়নের অভাব রয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়তনও তুলনামূলকভাবে ছোট এমন বাস্তব চিত্র তুলে ধরে তিনি জানান, ভবিষ্যতে জমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেবর বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। তাঁর ভাষায়, জনাব তারেক রহমান এর নেতৃত্বে নতুন সরকারের সহযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও মানসম্মত ও আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. মোঃ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, `গত ১৭ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের যে উন্নয়ন হওয়ার কথা ছিল, তা পুরোপুরি সম্ভব হয়নি। বাজেট ও জনবল সংকট এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।' তবে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং তাঁর সন্তান জনাব তারেক রহমান জাতীয় কবির নামে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে বিশেষ নজর দেবেন।'
লেখক: শিক্ষার্থী, আইন ও বিচার বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
আরটিভি/এসকে