images

মুক্তমত

দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে যারা জল ঘোলা করতে চায়, তাদের মতলব খারাপ 

বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬ , ০৮:০৬ পিএম

বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে ব্যাপক আলোচনা, সমালোচনা ও বিদ্রূপ লক্ষ্য করা যায়। কেউ কেউ বিষয়টিকে এমনভাবে উপস্থাপন করেন যেন এটি সম্পূর্ণ অন্যায়, অনৈতিক বা সমাজবিরোধী একটি কাজ। অথচ বাস্তবতা হলো— বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় আইন এবং ইসলামি শরিয়ত উভয় ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে দ্বিতীয় বিয়ের অনুমোদন রয়েছে। তাই কোনো ব্যক্তি যদি ধর্মীয় বিধান ও প্রচলিত আইন মেনে দ্বিতীয় বিয়ে করতে চান, তাহলে সেটিকে অযথা বিতর্কিত করা বা সামাজিকভাবে হেয় করার প্রবণতা যৌক্তিক নয়।

ইসলামে বিয়ে একটি পবিত্র সামাজিক ও ধর্মীয় বন্ধন। ইসলাম মানবিক বাস্তবতা, সামাজিক প্রয়োজন ও নৈতিকতার বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে পুরুষকে একাধিক বিয়ের সীমিত অনুমতি দিয়েছে। পবিত্র কোরআনের সূরা আন-নিসা’র ৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তোমরা তোমাদের পছন্দমতো দুই, তিন বা চারজন নারীকে বিয়ে করতে পারো; তবে যদি আশঙ্কা কর যে তাদের মধ্যে ন্যায়বিচার করতে পারবে না, তবে একজনই।’ অর্থাৎ ইসলাম একাধিক বিয়েকে বাধ্যতামূলক করেনি, বরং ন্যায়বিচার, দায়িত্বশীলতা ও সামর্থ্যের শর্তে অনুমোদন দিয়েছে।

পবিত্র আল-কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন— ‘আর তোমরা নারীদের সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।’ — সূরা আন-নিসা: ১৯

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, ইসলাম বিবাহিত জীবনে ন্যায়, সদাচরণ ও দায়িত্বশীলতার উপর গুরুত্বারোপ করেছে। তবেঁ, একাধিক বিয়ের ক্ষেত্রে স্ত্রীর অধিকার রক্ষা ও উত্তম আচরণ অপরিহার্য।

হাদিসে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন— ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম।’ — সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৮৯৫

এই হাদিস প্রমাণ করে, বিয়ে শুধু অনুমতির বিষয় নয়; বরং দায়িত্ব, ন্যায়বিচার, উত্তম চরিত্র ও পারিবারিক অধিকার রক্ষার বিষয়ও বটে।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— ইসলাম কখনও কামনা-বাসনার বেপরোয়া চর্চাকে উৎসাহ দেয়না। বরং বৈধ সম্পর্কের মাধ্যমে সমাজকে পরকীয়া, ব্যভিচার ও বিবাহবহির্ভূত অনৈতিক সম্পর্ক থেকে রক্ষা করার একটি বাস্তবসম্মত পথ দেখিয়েছে। বর্তমানে সমাজে গোপন সম্পর্ক, অবৈধ সহবাস, প্রতারণা ও পারিবারিক অবক্ষয়ের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সে তুলনায় আইনসিদ্ধ ও সামাজিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বিয়ে অবশ্যই অধিক সম্মানজনক ও দায়িত্বশীল ব্যবস্থা।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় আইনেও দ্বিতীয় বিয়ে পুরোপুরি নিষিদ্ধ নয়। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ অনুযায়ী একজন মুসলিম পুরুষ নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ বা সিটি করপোরেশনের সালিশ কাউন্সিলের অনুমতি নিতে হয় এবং বিদ্যমান স্ত্রীর বিষয়ে তথ্য প্রদান করতে হয়। আইন অমান্য করে গোপনে দ্বিতীয় বিয়ে করলে শাস্তির বিধানও রয়েছে। অর্থাৎ রাষ্ট্র চায়— যেকোনো বিয়ে যেন স্বচ্ছতা, দায়িত্ব ও আইনি কাঠামোর মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়।

বর্তমান সমাজব্যবস্থায় পরকীয়া, প্রতারণা, ধর্ষণ এবং বিয়ের আশ্বাস দিয়ে অনৈতিক সম্পর্কের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে প্রায়ই দেখা যায়— দীর্ঘদিন সম্পর্কের পর বিয়ের দাবিতে প্রেমিক বা প্রেমিকার বাড়িতে অবস্থান, পারিবারিক বিরোধ কিংবা আইনি জটিলতার ঘটনা। পাশাপাশি বিবাহবিচ্ছেদের পর একাধিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া ও দায়িত্বহীন জীবনযাপন সমাজে অস্থিরতা বাড়াচ্ছে।

এসব সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছে শিশুরা। অনেক ক্ষেত্রে বাবা-মা আলাদা সংসার গড়লেও সন্তানরা থেকে যায় অবহেলা, মানসিক কষ্ট ও অনিশ্চয়তার মধ্যে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, সামাজিক দায়বদ্ধতার অভাব এবং অনিয়ন্ত্রিত সম্পর্কের প্রবণতা সমাজে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

সচেতন মহলের মতে, পরিবার ও সমাজকে সুরক্ষিত রাখতে নৈতিক শিক্ষা, পারিবারিক দায়িত্ববোধ এবং বৈধ ও সম্মানজনক সম্পর্কের গুরুত্ব বাড়াতে হবে। একইসঙ্গে সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চা জোরদার না হলে ভবিষ্যতে এ সংকট আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।

দুঃখজনকভাবে, অনেকেই দ্বিতীয় বিয়ের প্রসঙ্গ এলেই কেবল আবেগ দিয়ে বিচার করেন। অথচ, সমাজে এমন বহু বাস্তবতা রয়েছে যেখানে দ্বিতীয় বিয়ে কোনো পরিবার, নারী কিংবা সন্তানের জন্য কল্যাণকর হতে পারে। যেমন— কেউ দীর্ঘদিন অসুস্থ, সন্তান ধারণে অক্ষম, অথবা পারিবারিক বিশেষ পরিস্থিতিতে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে দ্বিতীয় বিয়ে হতে পারে। আবার অনেক বিধবা, তালাকপ্রাপ্ত বা অসহায় নারীর জন্যও বৈধ বিয়ে একটি নিরাপদ সামাজিক আশ্রয় হতে পারে।

তবে, এটিও সত্য যে দ্বিতীয় বিয়ের নামে প্রতারণা, দায়িত্বহীনতা বা নারীর প্রতি অবিচার কখনো গ্রহণযোগ্য নয়। ইসলাম যেমন অনুমতি দিয়েছে, তেমনি কঠোরভাবে ন্যায়বিচার ও দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছে। একজন পুরুষ যদি স্ত্রীদের অধিকার রক্ষা করতে না পারেন, আর্থিক ও মানসিক দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হন, তাহলে তার জন্য একাধিক বিবাহ নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। তাই, দ্বিতীয় বিয়ের বিষয়টি শুধু ‘অনুমতি আছে’ এই যুক্তিতে নয়, বরং দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতার আলোকে দেখতে হবে।

সমাজে মতভেদ থাকতেই পারে। কিন্তু, কারো ব্যক্তিগত ও বৈধ সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে চরিত্রহনন, ট্রল কিংবা সামাজিক বিদ্বেষ ছড়ানো সভ্য আচরণ নয়। রাষ্ট্রীয় আইন ও ধর্মীয় বিধানকে সম্মান করে যদি কেউ দ্বিতীয় বিয়ে করেন, তাহলে সেটিকে ব্যক্তিগত ও বৈধ অধিকার হিসেবেই দেখা উচিত। ভিন্নমত থাকতে পারে; তবে তা যেন শালীনতা ও যুক্তির সীমা অতিক্রম না করে।

সবশেষে বলা যায়, দ্বিতীয় বিয়েকে কেন্দ্র করে আবেগতাড়িত বিভাজন নয়, বরং দায়িত্বশীল ও বাস্তবধর্মী আলোচনা প্রয়োজন। সমাজে অনৈতিক সম্পর্ক বৃদ্ধি পাওয়ার চেয়ে বৈধ, স্বচ্ছ ও দায়িত্বপূর্ণ পারিবারিক বন্ধন অবশ্যই উত্তম। তাই কোনো বিষয়ে মতামত দেওয়ার আগে ধর্মীয় বিধান, রাষ্ট্রীয় আইন এবং সামাজিক বাস্তবতা—এই তিনটি বিষয় বিবেচনায় রাখা জরুরি।

লেখক: আরিফ বিল্লাহ, সাংগঠনিক সম্পাদক, আমজনতার দল

আরটিভি/এসএইচএম