রোববার, ২৪ মে ২০২৬ , ০৭:৫৬ পিএম
সমগ্র মুসলিম বিশ্বে আয়োজন চলছে পবিত্র ঈদুল আজহা যার অপর নাম কোরবানির ঈদ। কোরবানির ঈদের প্রকৃত আনন্দ ত্যাগের মাধ্যমে। কিন্তু কি সেই ত্যাগ? কীসের ত্যাগ? এটা জানতে হলে, কোরবানির মূল তাৎপর্য অনুধাবন করতে হলে আমাদেরকে প্রথমে কোরবানি শব্দটির অর্থ নিয়ে ভাবতে হবে।
কোরবানি শব্দটি এসেছে ‘কুরব’ ধাতু থেকে। যার অর্থ সান্নিধ্য, নৈকট্য ইত্যাদি। সুফিবাদী দর্শনে ‘কুরবিয়াত’ শব্দটি এই অর্থে প্রচলিত আছে যে, আল্লাহর কুরবিয়াত হাসিল করা অর্থাৎ আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জন করা।
বর্তমানে আমাদের সমাজে কোরবানি যে রূপে দেখতে পাই সেটা হচ্ছে মূলত পশু কোরবানির প্রথা। এই পশু উৎসর্গ করা, বলি দেওয়া বা কোরবানি করা এটা হচ্ছে একটি প্রতীকী অনুষ্ঠান যা কোরবানির মূল তাৎপর্যকে তুলে ধরার চেষ্টা করে।
আল্লাহর নৈকট্য প্রাপ্তির জন্য আল্লাহ মুমিনের কাছ থেকে কোরবানি দাবি করেন। অর্থাৎ আল্লাহ চান বান্দা ত্যাগ স্বীকারের মাধ্যমে তাঁর সান্নিধ্য অর্জন করুক। একজন মানুষ যখন আরেকজন মানুষের জন্য কোনরকম ত্যাগ স্বীকার করে, তখন এই দুই জন মানুষ একে অপরের সান্নিধ্য লাভ করে, একে অপরের নৈকট্য প্রাপ্ত হয়, একে অপরের মধ্যে দূরত্ব হ্রাস পায়। একজন অতিথিকে ভালোভাবে আপ্যায়ন করা একটা কোরবানি। এই আপ্যায়নের মাধ্যমেও অতিথির সঙ্গে গৃহকর্তার দূরত্ব হ্রাস পায় বা আন্তরিকতা বৃদ্ধি পায়, একে অপরের নৈকট্য প্রাপ্তি হয়। তাই আল্লাহও তাঁর প্রিয় বান্দাদের পরীক্ষা হিসেবে তাঁর প্রতি সমর্পণের দৃষ্টান্ত হিসেবে বান্দার কোরবানি চান।
ইসলামে কোরবানির যে ধারণাটি আছে সেটি আমরা পেয়েছি জাতির পিতা ইব্রাহিম (আ.)-এর মাধ্যমে। আল্লাহ ইব্রাহিমকে (আ.) প্রত্যাদেশ করেছিলেন যে, ‘তুমি তোমার প্রিয়বস্তু কোরবানি করো। অর্থাৎ প্রিয়বস্তু উৎসর্গ করো’। তিনি অনেক চিন্তা করে, আল্লাহর বারংবার প্রত্যাদেশের পরে তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছালেন যে তাঁর ইহজগতে সবচেয়ে প্রিয় বস্তু হচ্ছে বৃদ্ধ বয়সে তিনি যে সন্তান লাভ করেছেন, অর্থাৎ ইসমাইল (আ.)। সেই পুত্র সন্তানটাই হচ্ছে তাঁর প্রিয়বস্তু এবং আল্লাহ তাঁকেই উৎসর্গ করার জন্য আহ্বান করছেন।
ইব্রাহিম (আ.) তাঁর পুত্রকে নিয়ে কোরবানি দেওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ হলেন। তিনি যখন তাঁর পুত্রের গলায় ছুরি চালানোর জন্য প্রস্তুত হলেন, তখন আল্লাহ তাঁর নিয়তকে কবুল করে নিলেন এবং তাঁর পুত্রের বদলে প্রতীকীরূপে একটি পশু দুম্বা কোরবানি করার জন্য নির্দেশ দিলেন। সুতরাং বোঝা গেল, কোরবানি করার জন্য আল্লাহর চাওয়া ছিল সবচেয়ে প্রিয় বস্তু।
ইব্রাহিম (আ.)-এর এই আদর্শ অনুসারে আমাদেরও যদি কোরবানির নিয়ত করতে হয়। বর্তমানে ইব্রাহিম (আ.)-এর থেকে প্রচলিত সেই কোরবানি আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর সময় পর্যন্ত এবং আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর পর থেকে এখন পর্যন্ত চলে আসছে।
বর্তমান দুনিয়ার এই দুইশো কোটি মুসলমানের মধ্যে সাড়ে ৮ কোটি কেবল উদ্বাস্তু। গত দুই দশকে এই জাতির অন্তত পঁচিশ লক্ষ মানুষ পরাশক্তিধর দেশগুলোর আগ্রাসনের শিকার হয়ে তাদের বোমা ও বুলেটের আঘাতে, তাদের রাসায়নিক অস্ত্রের বিষক্রিয়ায় নির্মম মৃত্যুবরণ করেছে। পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদীরা অন্যায়ভাবে আক্রমণ করে মুসলিম দেশগুলো দখল করে নিচ্ছে, হত্যা ও নিপীড়ন চালাচ্ছে। তলোয়ার দিয়ে, বন্দুক দিয়ে, বেয়োনেট দিয়ে খুচিয়ে খুচিয়ে, বাড়িঘরে আগুন দিয়ে নির্মমভাবে পৈশাচিক কায়দায় হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে। মুসলিম নারীদেরকে বন্দি করে ইউরোপ-আফ্রিকার বেশ্যালয়গুলোতে বিক্রি করে দিচ্ছে, ঘরে আটকে রেখে খ্রিষ্টানদের ঔরসজাত সন্তান জন্ম দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। আর শিশুগুলোকে রাসায়নিক বিষক্রিয়ার দ্বারা হত্যা করা হচ্ছে। মুসলিমরা মাথা তুলে দাঁড়াতে চাইলেই, প্রতিবাদ করতে চাইলেই তাদের উপর নির্যাতনের মাত্রা আরও বহুগুণে বেড়ে যাচ্ছে।
যে জাতি একদিন ছিল সেরা জাতি, সেই জাতি এখন অন্য জাতির লাথি মার খেয়ে গোলামির দিন যাপন করছে। এই যখন সমগ্র দুনিয়ায় মুসলিম জাতির অবস্থা, এভাবেই যখন আমরা অন্য জাতির দ্বারা সামরিকভাবে পরাজিত, নিগৃহীত, তাদের তৈরি জীবনবিধান দিয়ে আমাদের সমাজজীবন পরিচালিত হচ্ছে, তখন জাতির মুক্তির জন্য সংগ্রাম না করে এবং দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য নিজের জীবন ও সম্পদ কোরবানি না করে ব্যক্তিগতভাবে যত ইবাদতবন্দেগি আর পশু কোরবানি করা হোক, আমল করা হোক তা যে আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না এটি বোঝার জন্য মহাপণ্ডিত হওয়ার দরকার পড়ে না, সাধারণ জ্ঞানেই বোঝা যায়। আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করার জন্য আজ শুধু প্রতীকী কোরবানি নয়, সত্যিকারের জান-মালেরও কোরবানি করার সময় এসেছে।
লেখক : সমাজকর্মী
আরটিভি/এমএম