images

মুক্তমত

নীলফামারীর প্রাণের স্পন্দন ‘বড় মাঠ’

রোববার, ৩১ মে ২০২৬ , ০৩:৩২ পিএম

নীলফামারী শহরের প্রাণকেন্দ্রে বিস্তৃত এক খোলা সবুজ প্রান্তর— স্থানীয়দের কাছে যার পরিচয় “বড় মাঠ”। শহরের মানুষের সকাল-বিকেলের গল্প, অবসর কাটানোর ঠিকানা এবং স্বাস্থ্যচর্চার কেন্দ্র এই মাঠ। একই সঙ্গে এটি তরুণদের মিলনমেলা ও নীলফামারীর সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

মনে হয় যেন এই মাঠকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে পুরো নীলফামারী শহর। মাঠের চারপাশে রয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, লাইব্রেরি, শহীদ মিনার, মাঠের একপাশে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী নীলফামারী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, কাছেই নীলফামারী পৌরসভা, র‌্যাব ক্যাম্প, শিল্পকলা একাডেমি, শহীদ মিনার, ঈদগাহ ও মসজিদ। কিছুটা দূরে রয়েছে নীলফামারী সরকারি কলেজসহ আরও কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ফলে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পুরো এলাকাজুড়ে থাকে মানুষের সরব উপস্থিতি।

fdhfd

ভোরের আলো ফোটার আগেই নীলফামারীর বড় মাঠের দিন শুরু হয়ে যায়। ফজরের আজান শেষ হতেই ধীরে ধীরে মানুষ হাঁটতে হাঁটতে মাঠে আসতে শুরু করেন। কারও হাতে পানির বোতল, কেউ ট্র্যাকস্যুট পরে দ্রুত পায়ে হাঁটছেন। 

সকালের কোমল আলো, ঠাণ্ডা বাতাস আর খোলা আকাশের নিচে মাঠজুড়ে তৈরি হয় এক অন্যরকম প্রশান্ত পরিবেশ। কেউ ধীর পায়ে হাঁটছেন, কেউ দৌড়াচ্ছেন, কেউ আবার শরীরচর্চায় ব্যস্ত। ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপসহ নানা রোগে আক্রান্ত অনেক মানুষ নিয়মিত এখানে হাঁটতে ও ব্যায়াম করতে আসেন। মাঠের পাশে স্থাপন করা হয়েছে বিভিন্ন ব্যায়ামের সরঞ্জামও। তরুণ থেকে বৃদ্ধ—সব বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে সকালবেলার বড় মাঠ হয়ে ওঠে এক প্রাণবন্ত স্বাস্থ্যচর্চার কেন্দ্র।

eeee

সূর্য যত ওপরে উঠতে থাকে, ততই বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়। ধীরে ধীরে ব্যস্ত হয়ে ওঠে মাঠের চারপাশ। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও নানা বয়সী মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। মাঠের চারপাশজুড়ে থাকা গাছগুলো শহরের ব্যস্ততার মাঝেও এনে দিয়েছে স্বস্তির ছায়া। সেই ছায়ার নিচে বসানো বেঞ্চে কেউ পত্রিকা পড়ছেন, কেউ চুপচাপ মাঠের দিকে তাকিয়ে সময় কাটাচ্ছেন। অনেকের কাছেই বড় মাঠ মানে ব্যস্ত জীবনের মাঝখানে একটু শান্তির আশ্রয়।

দুপুরের দিকে মাঠের চিত্র বদলে যায়। আশপাশের স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। ক্লাস শেষে বন্ধুবান্ধব মিলে কেউ বেঞ্চে বসে আড্ডা দেয়, কেউ ঘাসের ওপর বসে কাটায় অবসর সময়। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের এক মিলনমেলায় পরিণত হয় বড় মাঠ।

বিকেল নামতেই মাঠ যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। একদিকে ক্রিকেট, অন্যদিকে ফুটবল খেলায় মেতে ওঠে কিশোর ও তরুণরা। ছোট ছোট শিশুরা দৌড়াদৌড়ি করছে, তরুণরা চিৎকার করে বন্ধুদের উৎসাহ দিচ্ছে। অফিস শেষে চাকরিজীবীরাও এসে বসেন মাঠের চারপাশে। পরিবার নিয়ে অনেকে হাঁটতে বের হন। শিশুদের হাসি, তরুণদের উচ্ছ্বাস আর মানুষের ভিড়ে পুরো এলাকা তখন উৎসবমুখর হয়ে ওঠে।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে মাঠের চারপাশের খাবারের দোকানগুলোতেও বাড়তে থাকে ভিড়। ফুচকা, চটপটি, ঝালমুড়িসহ নানা মুখরোচক খাবারের দোকানে পরিবার ও তরুণদের উপস্থিতি চোখে পড়ে। কেউ গল্প করছেন, কেউ নীরবে বসে সময় কাটাচ্ছেন। ব্যস্ত শহুরে জীবনের ক্লান্তি ভুলে একটু স্বস্তি খুঁজে নেন সবাই।\

gfhfg

রাত গভীর হলেও বড় মাঠের প্রাণচাঞ্চল্য পুরোপুরি থেমে যায় না। আলো-আঁধারির মধ্যেও তখন মাঠের কোনো বেঞ্চে চলছে গল্প, কোথাও ভেসে আসছে হাসির শব্দ, আবার কেউ নীরবে বসে কাটাচ্ছেন সময়।

শুধু বিনোদন বা খেলাধুলার স্থান হিসেবেই নয়, বড় মাঠ নীলফামারীর মানুষের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও প্রতীক। বিভিন্ন জাতীয় দিবস, সাংস্কৃতিক আয়োজন, খেলাধুলা ও সামাজিক কর্মসূচিতে বারবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে এই মাঠ।

সময় বদলেছে, বদলেছে শহরও। চারপাশে বেড়েছে দালান-কোঠা, যানবাহন আর ব্যস্ততা। কিন্তু নীলফামারীর বড় মাঠ এখনো আগের মতোই মানুষকে একত্র করে রাখে। শহরের হাজারো স্মৃতি, সম্পর্ক আর প্রতিদিনের জীবনের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই মাঠ।

লেখক : কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী

আরটিভি/টিআর