মঙ্গলবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০১৯ , ১০:৩৩ এএম
অগ্নিকাণ্ড একটি মারাত্মক মানবসৃষ্ট দুর্যোগ, যার ফলে সারা জীবনের অর্জিত সম্পদ নিমিষেই ধ্বংস হয়ে যায়। অসতর্কতা ও অসাবধানতার ফলে অগ্নিকাণ্ড মানুষ ও সম্পদের বিশাল ক্ষতিসাধন করে। অগ্নিকাণ্ড যেকোনো সময় ঘটতে পারে, তবে এর প্রকোপ ফাল্গুন মাস থেকে সমগ্র শুষ্ক মৌসুমেই বেশি দেখা যায়। অগ্নিকাণ্ডের কারণে এদেশে প্রতিনিয়তই ছোট-বড় অসংখ্য দুর্ঘটনা ঘটে। অগ্নিকাণ্ড যখন কোনও জনবহুল এলাকা বা শিল্প-কারখানাতে ঘটে তখনই এর ভয়াবহতা আমাদেরকে নাড়া দেয়। ইদানীং কারখানা, বস্তি ও ব্যবসা-বিপণিতে সংঘটিত অগ্নিকাণ্ড সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে। সম্প্রতি ঢাকা মহানগরীতে পরপর বেশ কয়েকটি বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এগুলোর মধ্যে ঢাকার চকবাজারস্থ চুড়িহাট্টা, মিরপুরস্থ ভাষানটেক, বনানীর এফ আর টাওয়ার, ডিএনসিসি কাঁচা বাজার ও সুপার মার্কেট, গুলশান-২, খিলগাঁও কাঁচাবাজার, মিরপুরস্থ সিটি পার্ক ভবন উল্লেখযোগ্য। এসব দুর্ঘটনার মধ্যে শুধুমাত্র চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডে মারা যায় ৭২ জন এবং বনানীর এফআর টাওয়ারে ২৮ জন।
এসব দুর্ঘটনায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, সশস্ত্রবাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং ঢাকা জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা/কর্মচারীগণ দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে, যা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণকে সীমিত রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। প্রতিটি দুর্ঘটনায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় কমিটি গঠনের মাধ্যমে তদন্ত পরিচালনা করে অগ্নিকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট কারণ খুঁজে বের করা এবং ভবিষ্যতে অনুরূপ দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কৌশল নির্ধারণে প্রয়াস নেয়।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় ও ঢাকা জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা এবং মৃতব্যক্তিদের সৎকারের জন্য মানবিক সহায়তা প্রদান করা হয়। এর পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের মাঝে খাদ্য সামগ্রী, নগদ টাকা এবং মনোসামাজিক সহায়তা প্রদান করা হয়।
অগ্নিকাণ্ডের প্রধান কারণসমূহ হলো অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার অপ্রতুলতা, অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ, বিভিন্ন ভবনের অনুমোদনহীন ব্যবহার, ভবন ব্যবহারকারীদের জরুরি নির্গমন বিষয়ে জ্ঞান না থাকা, দাহ্য ও বিস্ফোরক পদার্থের অনুমোদনহীন গুদামজাতকরণ। এছাড়া রান্নার পর আগুন সম্পূর্ণ নিভিয়ে না দিলে, বাতাসে উড়ে গিয়ে সেই আগুন বাড়ির বেড়ায় লাগতে পারে; ছাইয়ের আগুন বাতাসে উড়ে অগ্নিকাণ্ড ঘটতে পারে; চুলার উপর খড়ি শুকাতে দিলে খড়িতে আগুন লেগে যেতে পারে, সে আগুন বাড়িঘর পুড়িয়ে দিতে পারে; সিগারেট, বিড়ি ও হুঁকার আগুন থেকে অগ্নিকাণ্ড ঘটতে পারে। এছাড়া গ্রামাঞ্চলে এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে আগুন নেয়ার সময়ও এ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে; জ্বলন্ত কুপি, কয়েল ঘরে রেখে ঘুমালেও অগ্নিকাণ্ড ঘটতে পারে, ঘুমানোর সময় বিছানার ধারে জ্বলন্ত হারিকেন রাখলেও এ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে; ত্রুটিপূর্ণ বিদ্যুৎ সংযোগ থেকে আগুন লাগতে পারে; জ্বলন্ত আবর্জনার স্তূপ থেকেও অগ্নিকাণ্ড লাগতে পারে; শিশুদের আগুন নিয়ে খেলা থেকে এবং আতশবাজি থেকেও অগ্নিকাণ্ড ঘটতে পারে।
এছাড়া গ্যাসের চুলা রান্নার পর বন্ধ না করে চুলার উপর কাপড় শুকাতে দিলে আগুন লাগার আশঙ্কা থাকে; অপরিকল্পিত ও অবৈধভাবে গ্যাস ও বিদ্যুৎ লাইন সংযোগ দেয়াও অগ্নিকাণ্ডের কারণ; ভূমিকম্পের কারণে গ্যাস ও বিদ্যুৎ লাইন থেকে আগুন লেগে যেতে পারে; শত্রুতাবশত অনেকে ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়।
যেহেতু অগ্নিকাণ্ডে জীবন ও সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়, তাই অগ্নিনির্বাপণ অতীব জরুরি। অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে প্রতিটি স্থাপনায় ফায়ার প্রোটেকশন ও ডিটেকশন সিস্টেম তথা ফায়ার সেফটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা এবং সংশোধিত বিল্ডিং কোড মেনে ঘর-বাড়ি নির্মাণ করতে হবে। এছাড়া Street Water Hydrant-এর ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন এবং গ্যাস সিলিন্ডার, বিদ্যুতের লোড ক্যাপাসিটি নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। অফিস, বাসা-বাড়ির নিরাপত্তা প্রহরী, দোকান কর্মচারীদের অগ্নিনির্বাপণ বিষয়ে মৌলিক প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হবে। প্রাথমিক হতে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা কারিকুলামে অগ্নিকাণ্ড ও তার প্রতিকার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। ফায়ার সার্ভিস ও নগর স্বেচ্ছাসেবকদের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য তাদেরকেও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের সাথে সম্পৃক্ত করাসহ সকল ক্ষেত্রে অগ্নিবীমা বাধ্যতামূলক করতে হবে। এছাড়া সমন্বিতভাবে সকল প্রতিষ্ঠানে নিজস্ব ‘response team’ গঠন করতে হবে, অনিরাপদ কেমিক্যাল সামগ্রী অপসারণ, দুর্যোগ ঝূঁকি হ্রাসে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান নিজস্ব আপদকালীন পরিকল্পনা গ্রহণ, নিরাপত্তা বিষয়ক আইন-কানুন প্রতিপালন করতে হবে এবং সর্বোপরি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত কমিটিসমূহ নিজ নিজ অধিক্ষেত্রে দুর্যোগ প্রতিরোধ ও প্রতিকারের লক্ষ্যে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ, বাস্তবায়ন এবং হালনাগাদ করতে হবে।
লেখক: আবদুল কাদের, উপসচিব, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়