images

স্বাস্থ্য

নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে তথ্য দিলেন বিশেষজ্ঞরা

সোমবার, ১২ জানুয়ারি ২০২৬ , ০২:২১ পিএম

শীতে কাঁচা খেজুরের রস খাওয়ার আনন্দ অনেক সময় বিষাদে রূপ নেয় নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণে। বাদুড়ের লালা কিংবা প্রস্রাবের মাধ্যমে ছড়ানো এই প্রাণিবাহিত ভাইরাসে প্রতি বছরই দেশে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাইরাসটির উৎস ও সংক্রমণের পথ সম্পর্কে সচেতন থাকলেই এ রোগ প্রতিরোধ সম্ভব।

সাধারণত শীত মৌসুম শুরু হলেই নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ বাড়তে থাকে। প্রতিবছর ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে এর প্রকোপ বেশি দেখা যায়। স্বাস্থ্যখাতের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশের ৩২টি জেলায় নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত মোট ৩৪৩ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২৪৫ জন মারা গেছেন। অর্থাৎ, বাংলাদেশে নিপাহ ভাইরাসে মৃত্যুর হার প্রায় ৭১ শতাংশ।

নিপাহ ভাইরাস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও প্রতিরোধে করণীয় বিষয়ে সংবাদমাধ্যমে কথা বলেছেন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিনের ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান ডা. আরিফা আকরাম বর্না। তিনি জানান, নিপাহ একটি প্রাণিবাহিত ভাইরাস, যার মূল উৎস ফলখেকো বাদুড়। বাদুড়ের লালা বা প্রস্রাবে দূষিত খাবারের মাধ্যমে এই ভাইরাস মানুষে সংক্রমিত হয়।

বিশেষ করে কাঁচা খেজুরের রস কিংবা বাদুড়ে আংশিক খাওয়া ফল খেলে মানুষ সহজেই এ ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে। এ ছাড়া আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির শরীরেও দ্রুত নিপাহ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে।

ডা. আরিফা আকরাম বর্না জানান, ভাইরাসটি শরীরে প্রবেশের ৪ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে সাধারণত উপসর্গ দেখা দেয়। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটি ৪৫ দিন পর্যন্ত সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগীর তীব্র জ্বর, মাথাব্যথা, পেশি ব্যথা, বমিভাব, গলা ব্যথা কিংবা ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো লক্ষণ দেখা যায়।

রোগটি জটিল আকার ধারণ করলে রোগীর মাথা ঘোরা, অতিরিক্ত তৃষ্ণা, জ্ঞান হারানো, অসংলগ্ন আচরণ এবং মারাত্মক শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত সমস্যাও দেখা দিতে পারে। গুরুতর অবস্থায় রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। এমনকি উপসর্গ না থাকলেও নিপাহ ভাইরাস মস্তিষ্কে মারাত্মক প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে বলে সতর্ক করেন বিশেষজ্ঞরা।

নিপাহ ভাইরাস শনাক্তে আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত, প্রস্রাব ও সেরিব্রো স্পাইনাল ফ্লুইড পরীক্ষা করা হয়। আরটিসিআর, এলাইজা ও কালচার পরীক্ষার মাধ্যমে ভাইরাস শনাক্ত করা সম্ভব। তবে এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ জীবাণু হওয়ায় সাধারণত বায়োসেফটি লেভেল-৪ ল্যাবরেটরিতে এসব পরীক্ষা করা হয়। নমুনা সংগ্রহের সময় যদি ভাইরাস নিষ্ক্রিয় করা যায়, তাহলে বায়োসেফটি লেভেল-২ পরীক্ষাগারেও সতর্কতার সঙ্গে পরীক্ষা করা যেতে পারে।

বর্তমানে নিপাহ ভাইরাসের কোনো প্রতিষেধক বা কার্যকর ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হয়নি। তাই সচেতনতার মাধ্যমেই এ রোগ প্রতিরোধের ওপর জোর দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। এ জন্য কাঁচা বা অপরিষ্কার খেজুরের রস পান থেকে বিরত থাকা, দাগ বা কামড়ের চিহ্নযুক্ত ফল না খাওয়া এবং অসুস্থ ব্যক্তি বা প্রাণীর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন
vitous

দেশের যে ৩৫ জেলায় ভয়ংকর ভাইরাস শনাক্ত

এ ছাড়া আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত আইসোলেশনে রাখা ও কন্টাক্ট ট্রেসিং নিশ্চিত করা জরুরি। সন্দেহজনক উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। রোগীর সেবা বা জরুরি প্রয়োজনে সংস্পর্শে এলে মাস্কসহ প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থাও গ্রহণ করতে হবে। নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত মায়ের শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো বন্ধ রাখা এবং রোগী সুস্থ হওয়ার পরও দীর্ঘমেয়াদি মস্তিষ্কজনিত জটিলতার আশঙ্কায় নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখার কথাও জানান বিশেষজ্ঞরা।

চিকিৎসকদের মতে, নিপাহ ভাইরাস প্রতিরোধ ও মৃত্যুঝুঁকি কমাতে সরকারি উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নজরদারি জোরদার, প্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ আরোপ, গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার এবং পোস্টার ও লিফলেটের মাধ্যমে জনসচেতনতা বাড়ানো গেলে এ মারাত্মক ভাইরাস থেকে নিরাপদ থাকা সম্ভব।

আরটিভি/এসকে