মঙ্গলবার, ২৫ নভেম্বর ২০২৫ , ০৭:৪৬ পিএম
মানবদেহের এক রহস্যময় সম্পদ হলো রক্ত, আর এর মধ্যে সবচেয়ে বিরল হলো ‘আরএইচ নাল’ (Rh-null) নামে পরিচিত এক বিশেষ রক্তের ধরন। পৃথিবীতে মাত্র ৫০ জন মানুষের শরীরে এই রক্ত আছে বলে জানা গেছে। এই রক্ত এতটাই বিরল যে বিজ্ঞানীরা এবং চিকিৎসকরা একে ‘গোল্ডেন ব্লাড’ বা ‘সোনার রক্ত’ নামে ডাকেন। এই মানুষগুলো কখনো দুর্ঘটনায় পড়লে, তাদের বাঁচানো কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে, কারণ তাদের শরীরে দেওয়ার মতো রক্ত পাওয়া যায় না।
এই বিরল পরিস্থিতির কারণে যাদের শরীরে এই রক্ত আছে, তাদের নিজেদের রক্ত সংগ্রহ করে জমিয়ে বা ফ্রিজ করে রাখতে বলা হয়। তবে বিজ্ঞানীদের একটি দল বর্তমানে ল্যাবরেটরিতে এই ‘সোনার রক্ত’ কৃত্রিমভাবে তৈরি করার চেষ্টা করছেন, যা ভবিষ্যতে বিরল রক্তের অধিকারী অসংখ্য মানুষের প্রাণ বাঁচাতে পারে।
‘আরএইচ নাল’ কেন এত দামি?
প্রতি ৬০ লাখ মানুষের মধ্যে মাত্র একজনের শরীরে এই বিশেষ রক্তের দেখা মেলে। রক্ত সঞ্চালনের ক্ষেত্রে ‘আরএইচ নাল’ রক্তের কদর অনেক বেশি, কারণ এই রক্তে আরএইচ পরিবারের ৫০টি অ্যান্টিজেনের একটিও থাকে না।
বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই রক্ত ব্যবহার করে ‘সার্বজনীন রক্ত সঞ্চালন’ ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব। অর্থাৎ এমন এক রক্ত যা প্রায় সব মানুষকে দেওয়া যাবে, কারণ বর্তমানে রক্ত দেওয়ার ক্ষেত্রে শরীরের ইমিউন সিস্টেমের যে বাধা থাকে, এই রক্ত সেই বাধা দূর করতে সক্ষম।
ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের সেল বায়োলজির অধ্যাপক অ্যাশ টোয়ে বলেন, আরএইচ অ্যান্টিজেনগুলো শরীরে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। কিন্তু যার রক্তে এগুলো নেই, তার রক্ত সবার জন্য নিরাপদ। বিশেষ করে জরুরি মুহূর্তে যখন রোগীর রক্তের গ্রুপ জানা থাকে না, তখন এই রক্ত দিলে কোনো অ্যালার্জিক রিঅ্যাকশন বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ভয় থাকে না।
গবেষণায় দেখা গেছে, জিনগত পরিবর্তনের কারণেই মানুষের শরীরে এই বিরল রক্ত তৈরি হয়। বিজ্ঞানীরা এখন এই রহস্যকে কাজে লাগিয়েছেন। ২০১৮ সালে অধ্যাপক টোয়ে এবং তার দল ল্যাবে এই রক্ত তৈরি করতে সক্ষম হন। তারা অপরিণত লোহিত রক্তকণিকা নিয়ে ‘ক্রিসপার’ নামের জিন এডিটিং প্রযুক্তি ব্যবহার করেন। এর মাধ্যমে তারা রক্তের প্রধান পাঁচটি গ্রুপের জন্য দায়ী জিনগুলো সরিয়ে ফেলেন। ফলে এমন এক রক্তকোষ তৈরি হয় যা প্রায় সবার শরীরেই মানিয়ে যায়। একে বলা হচ্ছে ‘আল্ট্রা-কম্পিটিবল’ রক্ত।
অধ্যাপক টোয়ে স্কারলেট থেরাপিউটিকস নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। তারা বিরল রক্তের মানুষদের রক্ত সংগ্রহ করে ল্যাবে তা থেকে আরও রক্তকণিকা তৈরি করছেন, যা জরুরি সময়ের জন্য সংরক্ষণ করা যাবে। আমেরিকা, কানাডা এবং স্পেনের বিজ্ঞানীরাও স্টেম সেল ব্যবহার করে কৃত্রিমভাবে এই বিরল রক্ত তৈরির চেষ্টা করছেন।
তবে জিন এডিটিং প্রযুক্তি নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিতর্ক ও কড়া নিয়মকানুনের কারণে এই কৃত্রিম রক্ত সাধারণ রোগীদের জন্য সহজলভ্য হতে আরও অনেক ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা পরীক্ষার প্রয়োজন।
অধ্যাপক টোয়ে বলেন, আপাতত মানুষের শরীর থেকে রক্ত নেওয়াই সবচেয়ে সহজ ও সস্তা উপায়। তবে যাদের রক্তের গ্রুপ খুবই বিরল এবং দাতা পাওয়া যায় না, ল্যাবে তাদের জন্য রক্ত তৈরি করা গেলে সেটা হবে এক বিরাট সাফল্য।
সূত্র: বিবিসি
আরটিভি/এআর