images

আন্তর্জাতিক / মধ্যপ্রাচ্য

এবার ভয়াবহ বিপদে পড়েছে ইরান

রোববার, ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ , ০২:০৪ পিএম

বিগত ১০০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিবেশগত ও সামাজিক বিপদের মুখে পড়েছে ইরান। পারমাণবিক কর্মসূচি, প্রক্সি বাহিনী ও সামরিক উৎপাদনে অর্থ ঢালতে গিয়ে নিজেদের সবচেয়ে মৌলিক সমস্যার সমাধানকে দীর্ঘদিন উপেক্ষা করেছে দেশটি। এই খামখেয়ালিপনার ফলস্বরূপ দেশটি এখন ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়েছে। কেননা দেশটির রাজধানী তেহরান এখন আক্ষরিক অর্থেই ডে জিরো বা শূন্য দিবসের প্রহর গুণছে—যেদিন এই বিশাল শহরের পানি ফুরিয়ে যাবে।

তবে শুধু তেহরান একা নয়, ইরানের বেশিরভাগ অংশই দ্রুতগতিতে চরম পানি সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছে। অর্থাৎ এমন একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে পানির চাহিদা স্থায়ীভাবে প্রাকৃতিক সরবরাহের চেয়ে বেশি হয়ে গেছে। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর যে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান এখন রাজধানী স্থানান্তর এবং প্রায় এক কোটি মানুষকে বাধ্যতামূলকভাবে সরিয়ে নেওয়ার (ইভাকুয়েশন) চিন্তা করছেন।

আরও পড়ুন
Iran

শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে ইরান

মূলত এই সংকটের পেছনে রয়েছে বেশ কিছু গুরুতর কারণ। তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে গত ছয় বছর ধরে চলা তীব্র খরাকে চিহ্নিত করা যায়, যেখানে বর্ষাকালেও ইরানে তেমন বৃষ্টি হয়নি। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রচুর পানি লাগে এমন কৃষিকাজ এবং পানি ও জ্বালানিতে ভর্তুকি দেওয়ার ফলে ভূগর্ভস্থ জলাধার (অ্যাকুইফার) থেকে অতিরিক্ত পানি উত্তোলন।ফলে সঞ্চিত ভূগর্ভস্থ পানির ভাণ্ডার নিঃশেষ হয়ে গেছে।

এছাড়া তেহরানের মতো প্রধান প্রধান শহরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও কর্মসংস্থানের কেন্দ্রীভূতকরণ পানির সম্পদের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করেছে। ভূগর্ভস্থ পানির ক্ষয় এতটাই তীব্র যে তেহরান মালভূমির কিছু অংশ দেবে যাচ্ছে এবং মাটির নিচে পানি জমার ভৌত জায়গা সংকুচিত হয়েছে। ফলে যদি বৃষ্টি ফিরেও আসে, অতীতে যতটা পানি মাটির নিচে জমা হতো, এখন আর ততটা হবে না। কারণ পানি জমার সেই ভৌত জায়গা সংকুচিত হয়ে গেছে।

তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় জোরালো উদ্যোগের বদলে ইরান সরকার তেহরানে নির্দিষ্ট সময় পর পর পানির সরবরাহ বন্ধের পরিকল্পনা করছে। ইতোমধ্যেই কিছু এলাকায় রাতের বেলায় পাইপে পানির সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। 

তেহরানের গড়পড়তা পরিবারগুলো তাদের আয়ের ১০ শতাংশ এখন পানির পেছনে ব্যয় করছে এবং অনেক মানুষ গোসল ও অন্যান্য মৌলিক পরিচ্ছন্নতা ছাড়াই দিন কাটাচ্ছে। দুঃখজনকভাবে শাসকগোষ্ঠী এই সংকট থেকেও সরাসরি মুনাফা লুটছে।  

কেননা এই ভয়াবহ সংকটের মধ্যেও ইরানের রেভ্যুলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) একটি পানি মাফিয়া তৈরি করেছে। এই চক্র পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য হাজার হাজার বছর ধরে টিকে থাকা হ্রদ ও নদী শুকিয়ে ফেলছে। এই পানি যাচ্ছে শুধু তাদের কাছেই, যারা আর্থিকভাবে তা কিনতে সক্ষম।  

অন্যদিকে, বৃষ্টির জন্য গণপ্রার্থনার আয়োজন ছাড়াও শাসকগোষ্ঠী বাতাসে প্রচুর পরিমাণে রাসায়নিক লবণ ছিটানোর মতো বিতর্কিত কৌশল নিয়েছে। কিন্তু এই ক্লাউড সিডিং বা কৃত্রিম মেঘ তৈরির প্রক্রিয়া নিশ্চিতভাবে বৃষ্টি নামানোর বদলে গাছপালা ধ্বংস করছে ও মানুষের শ্বাসকষ্ট বাড়িয়ে দিচ্ছে। মানুষ এখন ঘরবন্দি থাকতে বাধ্য হচ্ছে ও ইরানি সমাজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে শুরু করেছে।

এদিকে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ইরানীদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, তারা যদি বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়, তবে ইসরায়েল পানি সংকট সমাধানে বিশেষজ্ঞ পাঠাবে।

যদিও এই পানি সংকট প্রাকৃতিক কারণ ও ভুল নীতির এক নির্দিষ্ট মিশ্রণের ফল। তবু ইরান একা নয়। উদাহরণস্বরূপ, প্রতিবেশী আফগানিস্তানে তীব্র পানি সংকট দেখা দেওয়ায় কাবুল শহরের পানি সরবরাহ বাড়ানোর জন্য বড় বড় সেচ প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। এই প্রকল্পগুলো বিতর্কমুক্ত নয়। কারণ এর প্রভাব সীমান্তের ওপারে অন্য জায়গার পানি সরবরাহেও পড়তে পারে। ঠিক এই কারণেই মিসর তার পার্শ্ববর্তী দেশ ইথিওপিয়ার বাঁধ প্রকল্পগুলোর তীব্র বিরোধিতা করে আসছে।

আরটিভি/এআর