images

আন্তর্জাতিক / বিজ্ঞান

নতুন প্রজাতির সাপের সন্ধান

রোববার, ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ , ০৪:৫২ পিএম

২০১৫ সালের বর্ষার এক ধূসর দিনে ভারতের কেরালার পালাক্কাদ জেলার জেলিাপাড়া গ্রামের কফি বাগানে গাছপালা পরিচর্যায় নেমেছিলেন পর্যটন গাইড বেসিল পি. দাস এবং তার বাবা। সাড়ে তিন একরের সেই খামারের মাটি খোঁড়ার সময়ই বেরিয়ে এলো ছোট, কালো ও ক্রিম রঙের একটি সাপ, যা আগে কখনো দেখেননি তারা। এই সাধারণ ঘটনাটিই দশ বছর পর জন্ম দিল এক বৈপ্লবিক আবিষ্কারের। 
 
বাসিল পি. দাস সাপটির ছবি তুলে পাঠান তার প্রকৃতিবিদ বন্ধু ডেভিড ভি. রাজুকে। রাজু প্রজাতিটি শনাক্ত করতে না পারায় তার পরামর্শে দাস সাপটিকে একটি ফুলের টবে রাখেন। অবশেষে সাপটির নমুনা হস্তান্তর করা হয় শিল্ডটেইল ম্যাপিং প্রজেক্টের (এসএমপি) পরিচালক বিবেক সিরিয়াকের কাছে। এসএমপি হলো ঢাল-লেজ সাপ বা শিল্ডটেইল সাপদের নথিভুক্ত করার একটি নাগরিক বিজ্ঞান উদ্যোগ।

আরও পড়ুন
15

ব্রেস্ট ক্যানসারের ভ্যাকসিন নিয়ে সুখবর দিলেন বিজ্ঞানীরা

দীর্ঘ এক দশক পর জানা গেল, দাস পরিবার যে সাপটি খুঁজে পেয়েছিলেন, তা বিজ্ঞান জগতে সম্পূর্ণ নতুন একটি প্রজাতি—যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘রাইনোফিস সিরুভানিয়েনসিস’(Rhinophis siruvaniensis)। দাস আনন্দের সঙ্গে বলেন, যখন জানলাম এটি নতুন একটি প্রজাতি, আমি খুব খুশি হয়েছিলাম। কারণ এখন আমি এর ইতিহাসের অংশ।

এই নতুন শিল্ডটেইল প্রজাতিটির বর্ণনা গত অক্টোবর ২০২৫-এ ‘এভলিউশনারি সিস্টেমেটিক্স’ জার্নালের একটি গবেষণা পত্রে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স (আইআইএসসি), ওয়ানাদ ওয়াইল্ড এবং অলাভজনক প্রতিষ্ঠান কলিঙ্গ ফাউন্ডেশনের বিজ্ঞানী ও গবেষকরা। এই গবেষণাটি সিরুভানি পাহাড় থেকে সংগৃহীত তিনটি নমুনার ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে। সিরুভানি পাহাড়টি পশ্চিমঘাট পর্বতমালার কেরালা এবং তামিলনাড়ু অংশে অবস্থিত। 

Fig5_VPCteam_fieldwork_2014

চকচকে এই সাপটি দেখতে বাদামী-কালো এবং ক্রিম-সাদা রঙের। এর গায়ে গাঢ় ছোপ ছোপ দাগ রয়েছে এবং লেজের ডগা গম্বুজ আকারের। এর অনন্য আঁশের বিন্যাস, রং এবং ডিএনএ বিশ্লেষণের মাধ্যমেই এটিকে অন্যান্য পরিচিত প্রজাতি থেকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, শিল্ডটেইল সাপগুলো হলো ছোট আকারের, বিষহীন এবং মাটির নিচে গর্তে বাস করা একদল সাপ। এদের লেজের ডগা ঢাল বা ডিস্কের মতো দেখতে হওয়ায় এদের এই নামকরণ করা হয়েছে। এরা ইউরোপেলটিডি (Uropeltidae) পরিবারভুক্ত। বর্তমানে ভারত ও শ্রীলঙ্কায় এই সাপের ৭৩টি পরিচিত প্রজাতি রয়েছে। রাইনোফিস (Rhinophis) হলো এদের দ্বিতীয় সর্বাধিক বৈচিত্র্যপূর্ণ গণ, যার ২৬টি প্রজাতি রয়েছে এবং এটিই একমাত্র গণ যা ভারত ও শ্রীলঙ্কা উভয় স্থানেই পাওয়া যায়। ভারতে এ পর্যন্ত এই গণের ছয়টি প্রজাতি শনাক্ত হয়েছে।

Fig2_Rhinophis_siruvaniensis_2
 এই গবেষণার অন্যতম লেখক বিবেক ফিলিপ সিরিয়াক, যিনি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে শিল্ডটেইল নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি জানান, অতীতে তাদের গবেষণা পশ্চিমঘাট পর্বতমালার উঁচু বনাঞ্চল এবং সংরক্ষিত এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু কফি বাগানের মতো চাষের জমিতেও যে অজানা প্রজাতি থাকতে পারে, এই আবিষ্কার তারই ইঙ্গিত দেয়। 

গবেষকরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, এই গর্তবাসী সাপগুলো ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এদের খুলির গঠন ও খাদ্যাভ্যাস এদের মাটির পরিবেশের সঙ্গে অত্যন্ত বিশেষায়িত করে তুলেছে, যা পরিবেশগত পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা সীমিত করতে পারে। তাদের প্রজনন, ভূগর্ভে জীবনযাপন বা কখন তারা উপরে আসে—এসব বিষয়ে তথ্য সীমিত থাকায় তাদের হুমকির মাত্রা নিরূপণ করা কঠিন।

গবেষণায় মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ (যা শুধু মাতৃসূত্র থেকে আসে) বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নতুন আবিষ্কৃত আর. সিরুভানিয়েনসিস-এর সঙ্গে রাইনোফিস মেলানোলিউকাস-এর (যা ২০২০ সালে ওয়ানাদ থেকে আবিষ্কৃত হয়) জিনগতভাবে ২-৪ শতাংশ পার্থক্য রয়েছে। যদিও একজন বিশেষজ্ঞ শুধুমাত্র মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ-এর ওপর নির্ভর করার বিষয়ে সমালোচনা করেছেন এবং পরামর্শ দিয়েছেন আরও নির্ভরযোগ্য পদ্ধতির মাধ্যমে প্রজাতির অবস্থা নিশ্চিত করার। 

তবে এই আবিষ্কার প্রমাণ করে যে শিল্ডটেইল নিয়ে গবেষণা এখনও অনেক বাকি এবং নাগরিকদের অংশগ্রহণ (সিটিজেন সায়েন্স) এ ধরনের আবিষ্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এদের বিলুপ্তির ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে বিজ্ঞানীরা রাইনোফিস সিরুভানিয়েনসিস-এর নিউক্লিয়ার ডিএনএ নিয়ে আরও গভীর গবেষণার পরিকল্পনা করেছেন।

আরটিভি/এআর