রোববার, ০৪ জানুয়ারি ২০২৬ , ০৫:৫৬ পিএম
বিশ্ব রাজনীতি শনিবার (৩ জানুয়ারি) এক অভূতপূর্ব ও নাটকীয় পরিবর্তনের সাক্ষী হলো। লাতিন আমেরিকার অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় মার্কিন ‘ডেল্টা ফোর্স’- এক ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করে দেশটির কট্টরপন্থী সমাজতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক আটক করে নিউইয়ার্কে নিয়ে যায়। তবে ঘটনাটি কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। এটি বিশ্বজুড়ে এক প্রবল ভয় ও আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। ওয়াশিংটনের এই সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের পর আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—ভেনেজুয়েলা কি কেবল শুরু? হোয়াইট হাউসের পরবর্তী লক্ষ্য কি তবে ইরান?
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলার ঘটনা আন্তর্জাতিক রীতিনীতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এটির মাধ্যমে সার্বভৌম আঞ্চলিক অধিকার উপেক্ষা করে দেশটির ভেতরেই সম্ভবত একটি নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি করতে চাচ্ছে মার্কিন প্রশাসন। যা তাদের পুরনো কৌশল হিসেবেই পরিচিত। এই আক্রমণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবাধ ক্ষমতার একটি অসাধারণ ও বিপজ্জনক দাবিকে চিহ্নিত করে, যা দেশটির ‘ বিশৃঙ্খলার নীতিকে’ই আরও দৃঢ় করছে। এদিকে গত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানে চলমান গণবিক্ষোভকে সমর্থন জানিয়ে দেশটির বিরুদ্ধেও সামরিক হামলার হুমকি দিয়েছিলেন।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই ‘লার্জ-স্কেল স্ট্রাইক’ কেবল মাদুরোকে সরানোর জন্য নয়, বরং এটি ইরান, রাশিয়া ও চীনের মতো দেশগুলির প্রতি একটি কঠোর সতর্কবার্তা। বিশেষ করে ইরানে চলমান সাম্প্রতিক বিক্ষোভ এবং তার প্রতি ট্রাম্পের খোলাখুলি সমর্থন এই শঙ্কাকে আরও ঘনীভূত করছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের এই শত্রু দেশটির ওপরও হয়তো একই ধরনের কোনো সামরিক পরিকল্পনা সাজাচ্ছে পেন্টাগন। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র অন্যান্য দেশের ক্ষমতা পরিবর্তনে পরোক্ষ সাহায্য বা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ওপর নির্ভর করত। কিন্তু ২০২৬ সালের এই অভিযান প্রমাণ করছে যে, ট্রাম্প প্রশাসন এখন ‘ডিরেক্ট অ্যাকশন’ বা সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের পথে হাঁটছে।
ভেনেজুয়েলার মতো একটি সার্বভৌম দেশে ঢুকে দেশটির প্রেসিডেন্টকে সস্ত্রীক তুলে নিয়ে যাওয়া আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে চরম বিতর্কিত হলেও, ওয়াশিংটন একে একটি ‘সফল অপরাধ দমন অভিযান’ হিসেবে চিত্রায়িত করছে। এই সাফল্যই এখন ট্রাম্প প্রশাসনকে ইরানের মতো শক্তিশালী শত্রুর বিরুদ্ধেও সাহসী করে তুলতে পারে। এছাড়া ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতির সাথে ইরানের অভ্যন্তরীণ অবস্থার এক অদ্ভুত মিল পাওয়া যাচ্ছে। ইরানে গত কয়েক দিন ধরে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও বেকারত্বের দাবিতে ব্যাপক বিক্ষোভ চলছে। এই বিক্ষোভ দমনে তেহরান যখন কঠোর অবস্থান নিয়েছে, ঠিক তখনই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক বিস্ফোরক হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
এদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী হেগসেথ জানিয়েছেন, ট্রাম্পের নীতি হচ্ছে ‘শক্তির মাধ্যমে শান্তি’ প্রতিষ্ঠা করা। আর ভেনেজুয়েলায় হামলা তারই বহিঃপ্রকাশ। আমেরিকার নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে এই ধরনের সাহসী সিদ্ধান্ত অপরিহার্য ছিল বলেও তিনি জানান। ফলে আমেরিকা নিজেদের স্বার্থে যেকোনো দেশেই প্রয়োজনে হামলা পরিচালনা করতে পারে।
মূলত তেল ও গ্যাস—এই দুটি সম্পদের নিয়ন্ত্রণই হলো আধুনিক ভূ-রাজনীতির মূল চাবিকাঠি। ভেনেজুয়েলা ও ইরান উভয় দেশই বিশ্বের বৃহত্তম জ্বালানি মজুতধারী দেশগুলোর অন্যতম। ভেনেজুয়েলায় হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। যদি ইরানের পারস্য উপসাগরে কোনো ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়, তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ ধস নামতে পারে। শুক্রবার (২ জানুয়ারি) ট্রাম্প জানিয়েছেন, যদি ইরান তার নিজ দেশের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালায়, তবে আমেরিকা তাদের উদ্ধারে এগিয়ে আসবে।
তবে ইরান ও ভেনেজুয়েলার সামরিক শক্তি এক নয়। ইরানের শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং এক বিশাল প্রক্সি নেটওয়ার্ক মার্কিন বাহিনীর জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে, যা গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েল ভালোভাবেই টের পেয়েছে। ১২ দিনের যুদ্ধে ইরান তার সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শন করে বুঝিয়ে দিয়েছিল তারা এতো সহজে হাল ছাড়ার মানসিকতায় নেই। এছাড়া দেশটির ভৌগোলিক অবস্থানও বহিঃশত্রুদের জন্য সুবিধার নয়, যা যুক্তরাষ্ট্রের আফগান যুদ্ধের দুঃসহ স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে পারে।
আরটিভি/এআর