images

আন্তর্জাতিক

এক নজরে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের চার দশক শত্রুতার ইতিহাস

শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬ , ০৭:০৫ পিএম

চার দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা উত্তেজনা, সংঘাত ও অবিশ্বাস— এই তিন শব্দেই সংক্ষেপে তুলে ধরা যায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে শুরু হওয়া এই বৈরিতা সময়ের সঙ্গে আরও জটিল হয়েছে। সাম্প্রতিক সংঘাত ও ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির প্রেক্ষাপটে আবারও আলোচনায় বসছে দুই দেশ।

নিচে ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হলো এই দীর্ঘ শত্রুতার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো—

🔴 ১৯৭৯: জিম্মি সংকটে সম্পর্কের ভাঙন

১৯৭৯ সালের ৪ নভেম্বর তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে হামলা চালিয়ে ৫২ জন কূটনীতিক ও কর্মীকে জিম্মি করে ইরানি শিক্ষার্থীরা। অপসারিত শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির প্রত্যর্পণের দাবিতে এ ঘটনা ঘটে। টানা ৪৪৪ দিন জিম্মি থাকার পর ১৯৮১ সালে তাদের মুক্তি মেলে। এর মধ্যেই ১৯৮০ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

🔴 ২০০২: ‘অ্যাক্সিস অব ইভিল’ ঘোষণা

১৯৯৫ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ইরানের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। এরপর ২০০২ সালে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ইরানকে ‘অ্যাক্সিস অব ইভিল’-এর অংশ হিসেবে ঘোষণা দেন।

যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ—ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন দিয়ে আসছে। ২০১৯ সালে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরকে (আইআরজিসি) সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে ওয়াশিংটন।

🔴 ২০১৮: পারমাণবিক চুক্তি ভেঙে যায়

২০০০-এর দশকের শুরুতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়ে। দীর্ঘ আলোচনার পর ২০১৫ সালে ভিয়েনায় স্বাক্ষরিত হয় ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি।

তবে ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র সেই চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ায় এবং নতুন করে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, যা দুই দেশের সম্পর্ককে আবারও উত্তপ্ত করে তোলে।

🔴 ২০২০: জেনারেল সোলেইমানি নিহত

২০২০ সালের ৩ জানুয়ারি বাগদাদে মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত হন ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ডার কাসেম সোলেইমানি।

ওয়াশিংটনের দাবি ছিল, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আসন্ন হামলার পরিকল্পনা করছিলেন।

এর জবাবে ইরান ইরাকে মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়, যা পরিস্থিতিকে যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়।

🔴 ২০২৫: পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা

২০২৫ সালের জুনে ইসরাইল-ইরান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়।

ওয়াশিংটন দাবি করে স্থাপনাগুলো ধ্বংস হয়েছে, তবে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে সন্দেহ রয়ে যায়।

🔴 ২০২৬ ফেব্রুয়ারি: খামেনি নিহত

আরও পড়ুন
Web-Image---Copy

বিমান হামলায় মোজতবা খামেনির চেহারা গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত, হারিয়েছেন পা

২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সমন্বিত হামলায় নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ করে দেয়, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা দেয়।

🔴 ২০২৬ এপ্রিল: ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ও আলোচনা

সাম্প্রতিক সংঘাতে হাজারো মানুষের প্রাণহানি ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধাক্কার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই সপ্তাহের একটি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়।
এই প্রেক্ষাপটে আজ পাকিস্তানের ইসলামাবাদে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল বৈঠকে বসার কথা।

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিরা আলোচনায় অংশ নেবেন।
তবে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও কৌশলগত মতপার্থক্যের কারণে সমঝোতা এখনো অনিশ্চিত।

যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হবে ২২ এপ্রিলের মধ্যেই কোনো স্থায়ী সমাধান না এলে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

>>> চার দশকের ইতিহাস বলছে— সংলাপ ও সংঘাত, এই দুইয়ের মাঝেই আটকে আছে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সম্পর্ক। বর্তমান আলোচনা সফল হবে কিনা, সেটিই এখন বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

আরটিভি/এমএইচজে