রোববার, ১০ মে ২০২৬ , ০৯:০২ পিএম
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে গত বছরের আকাশযুদ্ধের সময় বিশ্বব্যাপী নজরকাড়ে চীনা যুদ্ধবিমান। পাকিস্তান যখন চীনের তৈরি জে-১০সি যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে ফ্রান্সের তৈরি রাফালসহ বেশ কয়েকটি ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার তথ্য দিল, তখন চীনা যুদ্ধবিমান ধারণায় আমূল পরিবর্তন আসে। ফলে বহু বছর ধরে চীনা যুদ্ধবিমানকে পশ্চিমা বা রাশিয়ান প্ল্যাটফর্মের সস্তা বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা থেকে সরে আসে অনেক দেশ।
বার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, মার্কিন কর্মকর্তারা বিশ্বাস করেন যে চীনের তৈরি পাকিস্তানের একটি যুদ্ধবিমান অন্তত দুটি ভারতীয় সামরিক বিমান ভূপাতিত করেছে।
সংস্থাটির অন্য এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভারতের রাফাল ভূপাতিত হওয়ার পেছনে চীনের পিএল-১৫ মিসাইলের পাল্লা বা রেঞ্জ সম্পর্কে ভারতের ভুল হিসাব বড় ভূমিকা রেখেছিল।
চেংদুভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠান এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ২০২৫ সালে তাদের রাজস্ব ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ৭ হাজার ৫৪০ কোটি ইউয়ান (১ হাজার ১০০ কোটি ডলার) হয়েছে। মুনাফা ৬ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৩৪০ কোটি ইউয়ানে দাঁড়িয়েছে। উভয় পরিসংখ্যানই প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ রাজস্ব আয়। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে তাদের বিক্রি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
চীনা এই প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বিক্রির চরম পারফরম্যান্স হিসেবে পাকিস্তানই সবচেয়ে শক্তিশালী বিজ্ঞাপন। পাকিস্তান ২০২২ সালে জে-১০সি বিমান বহরে যুক্ত করেছিল, যাকে রয়টার্স পাকিস্তান বিমান বাহিনীর জন্য একটি 'মেজর আপগ্রেড' বা বড় আধুনিকায়ন হিসেবে বর্ণনা করেছিল। ২০২৫ সালে ভারতের সাথে সংঘর্ষের পর এই যুদ্ধবিমানটি 'ব্যাটল-টেস্টেড' বা যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত সক্ষমতার মর্যাদা লাভ করেছে।
যদিও ওই সংঘর্ষে জে-১০সি-র প্রকৃত ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক রয়ে গেছে। ভারত তাদের বিমান হারানোর কথা স্বীকার করলেও বিস্তারিত প্রকাশ করেনি। অন্যদিকে পাকিস্তানের বড় বড় দাবিগুলো নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, ভারতীয় বিমান বাহিনী বলেছে— ‘যুদ্ধক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতি যুদ্ধেরই অংশ’। আবার ভারত নিজেও পাকিস্তানের বিমান ভূপাতিত করার দাবি করেছে। সত্য সম্ভবত উভয় পক্ষের প্রকাশ্য বর্ণনার চেয়েও অনেক বেশি জটিল। তবুও, পূর্ণাঙ্গ প্রমাণ আসার আগেই সমরাস্ত্র বাজার প্রায়ই ধারণা বা পারসেপশনের ওপর ভিত্তি করে সামনে এগিয়ে যায়।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিপ্রি) ২০২৫ সালের সমরাস্ত্র স্থানান্তর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২৫ সময়কালে পাকিস্তান বিশ্বের পঞ্চম বৃহৎ অস্ত্র আমদানিকারক দেশে পরিণত হয়। এই সময়ে দেশটির সামরিক সরঞ্জাম আমদানি ৬৬ শতাংশ বেড়েছে। এই সময়ে পাকিস্তানের মোট অস্ত্র আমদানির ৮০ শতাংশই সরবরাহ করেছে চীন। পাকিস্তান কেবল এক ক্রেতাই নয়, বরং চীনের প্রতিরক্ষা শিল্পের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রদর্শনী ক্ষেত্র।
২০২৫ সালের জুনে রয়টার্স জানিয়েছিল যে, ইন্দোনেশিয়া খরচ, সামঞ্জস্যতা এবং বিক্রয়োত্তর সেবার কথা বিবেচনা করে চীনের জে-১০ বিমানটি কেনার বিষয়টি বিবেচনা করছে।
অক্টোবরের মধ্যে বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) জানায়, ইন্দোনেশিয়া অন্তত ৪২টি জে-১০সি যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনা করছে, যার বাজেট ধরা হয়েছে ৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এটি একটি বড় ধরণের কৌশলগত সংকেত।
রাফালকে এখনই বাতিলের খাতায় ঠিক হবে না। এটি বিশ্বের অন্যতম সম্ভ্রমের চোখে দেখা মাল্টি-রোল ফাইটার বা বহুমুখী সক্ষমতার যুদ্ধবিমান। ডাসো অ্যাভিয়েশন রাফালকে উচ্চ-তীব্রতার যুদ্ধ মিশনের জন্য একটি শীর্ষস্থানীয় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রচার করে। ২০২৫ সালে ভারত ফ্রান্সের সাথে তার নৌবাহিনীর জন্য ২৬টি রাফাল-মেরিন বিমান কেনার চুক্তি সই করেছে। ডাসো নিশ্চিত করেছে যে, এগুলো ভারতীয় বিমান বাহিনীতে আগে থেকে থাকা ৩৬টি রাফালের সাথে যুক্ত হবে।
সুনাম বা ব্র্যান্ড ভ্যালু একটি বড় বিষয়, আর রাফালের ক্ষতি এখানে চীনের লাভে পরিণত হয়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) মতে, ফরাসি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিশ্বাস করে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর— চীন রাফাল বিক্রি বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করেছে।
বার্তাসংস্থা রয়টার্স-ও ইউএস-চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড সিকিউরিটি রিভিউ কমিশনের বরাত দিয়ে একই ধরণের অভিযোগের কথা জানিয়েছে। চীন এই দাবি প্রত্যাখ্যান করলেও এই বিতর্কটিই প্রমাণ করে যে, আকাশযুদ্ধ এখন তথ্য যুদ্ধের (ইনফরমেশন ওয়ারফেয়ার) স্তরেও বিস্তৃত হয়েছে।
পশ্চিমা ফাইটারগুলোর জায়গায় জে-১০সি নিজের অবস্থান নিতে পারলেও ক্রেতা দেশগুলো এখনও রক্ষণাবেক্ষণ, ইন্টিগ্রেশন এবং রাজনৈতিক নির্ভরতা নিয়ে চিন্তিত থাকবে। কিন্তু চীন এখন জোরালোভাবে বলতে পারে যে, তাদের যুদ্ধবিমানগুলো কেবল যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপীয় বিকল্পের চেয়ে সস্তাই নয়, বরং এগুলো যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত। কারণ ভারত-পাকিস্তান সংঘাত মূলত বিশ্ববাজারের কাছে চীনের প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতাকে নতুন করে চিনতে সহায়তা করেছে বলা যায়।
আরটিভি/এমএম