মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬ , ০১:১১ পিএম
তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে কূটনৈতিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করার পাশাপাশি পাকিস্তান নীরবে ইরানের সামরিক ও যুদ্ধবিমানগুলোকে নিজেদের বিমানঘাঁটিতে অবস্থানের অনুমতি দিয়েছিল। এ বিষয়ে অবগত কয়েক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এর মাধ্যমে বিমানগুলোকে সম্ভাব্য মার্কিন বিমান হামলা থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করা হয়ে থাকতে পারে।
একই সময়ে ইরান কিছু বেসামরিক বিমান প্রতিবেশী আফগানিস্তানেও পাঠিয়ে রেখেছিল। ওই ফ্লাইটগুলোর মধ্যে সামরিক বিমান ছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজকে এমনটাই জানিয়েছেন দুই মার্কিন কর্মকর্তা। এই পদক্ষেপগুলো একসঙ্গে ইঙ্গিত দেয়, চলমান সংঘাতের বিস্তার ঠেকাতে প্রকাশ্যে মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করলেও আড়ালে ইরান নিজেদের অবশিষ্ট সামরিক ও বিমানসম্পদ সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করছিল।
জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত স্পর্শকাতর বিষয় হওয়ায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলা মার্কিন কর্মকর্তারা সিবিএসকে জানান, এপ্রিলের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই তেহরান একাধিক বিমান পাকিস্তানের নূর খান বিমানঘাঁটিতে পাঠায়। পাকিস্তানের গ্যারিসন শহর রাওয়ালপিন্ডির ঠিক বাইরে অবস্থিত এই ঘাঁটিটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা।
সেখানে পাঠানো সামরিক সরঞ্জামের মধ্যে ছিল ইরানি বিমানবাহিনীর একটি আরসি-১৩০ বিমান। এটি লকহিড সি-১৩০ হারকিউলিস কৌশলগত পরিবহন বিমানের গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও নজরদারির জন্য ব্যবহৃত একটি সংস্করণ। এ বিষয়ে মন্তব্য চাইলে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড সিবিএস নিউজকে আফগান ও পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলে।
পাকিস্তানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নূর খান বিমানঘাঁটি সম্পর্কিত অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি সিবিএসকে বলেন, নূর খান ঘাঁটি শহরের একেবারে কেন্দ্রস্থলে। সেখানে বিপুলসংখ্যক বিমান রাখা হলে তা জনসাধারণের চোখ এড়িয়ে গোপন রাখা সম্ভব নয়।
সিবিএস নিউজকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আফগানিস্তানের এক বেসামরিক বিমান চলাচল কর্মকর্তা জানান—যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে মাহান এয়ারের একটি ইরানি বেসামরিক বিমান কাবুলে অবতরণ করেছিল। পরে ইরানের আকাশসীমা বন্ধ হয়ে গেলে বিমানটি কাবুল বিমানবন্দরেই অবস্থান করছিল।
এরপর মার্চে তালেবান নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যে পাকিস্তান কাবুলে বিমান হামলা শুরু করে। ইসলামাবাদ অভিযোগ করেছিল, আফগান তালেবান জিহাদি সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান (টিটিপি) পাকিস্তানকে নিরাপদ আশ্রয় দিচ্ছে। তখন সম্ভাব্য পাকিস্তানি বিমান হামলা থেকে কাবুল বিমানবন্দরকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে তালেবানের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ ওই ইরানি বিমানটিকে ইরান সীমান্তের কাছাকাছি হেরাত বিমানবন্দরে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ওই বিমান চলাচল কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, আফগানিস্তানে থাকা এটিই ছিল শেষ ইরানি বিমান।
তালেবান সরকারের প্রধান মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ আফগানিস্তানে কোনো ইরানি বিমানের উপস্থিতির কথা অস্বীকার করেছেন। তিনি সিবিএস নিউজকে বলেন, ‘না, এটা সত্য নয় এবং ইরানের এমন কিছু করার প্রয়োজনও নেই।’
ইসলামাবাদ পুরো সংকটজুড়ে দুই দিক সামলানোর কৌশল নিয়েছে। একদিকে তারা ওয়াশিংটনের কাছে নিজেদের স্থিতিশীলতা রক্ষাকারী মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরছে, অন্যদিকে এমন কোনো পদক্ষেপ এড়িয়ে চলছে যা তেহরান বা চীনকে বিরূপ করতে পারে। কারণ, ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সমর্থক হিসেবে বিবেচিত হয় চীনকে।
এদিকে, ইরানের সর্বশেষ যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যুদ্ধক্ষতির ক্ষতিপূরণ, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে জানিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম। ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান ব্রডকাস্টিং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে এসব শর্ত প্রকাশ করে। এর এক দিন আগেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তেহরানের পাল্টা প্রস্তাবকে ‘পুরোপুরি অগ্রহণযোগ্য’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তবে ইরানের প্রস্তাবের কোন দিকগুলো তাকে ক্ষুব্ধ করেছে, তা তিনি স্পষ্ট করেননি।
এই প্রত্যাখ্যান এমন এক যুদ্ধবিরতিকে আরও নড়বড়ে করে তুলেছে, যা এখন কেবল নামেমাত্র টিকে আছে বলেই মনে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্প এই সপ্তাহে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের জন্য বেইজিং সফরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সেখানে ইরান যুদ্ধ, বাণিজ্য বিরোধ ও তাইওয়ান ইস্যুর পাশাপাশি আলোচনার প্রধান বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
এদিকে রোববারও হরমুজ প্রণালির আশপাশে ছোট পরিসরে সংঘর্ষ চলতে থাকে, যা ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধবিরতির ভঙ্গুরতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত রোববার (১২ মে) জানিয়েছে, সপ্তাহের শুরুতে কয়েকটি হামলার পর আবারও ইরানি ড্রোন তাদের ভূখণ্ডকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। এর আগে, গত সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার সময় মার্কিন নৌবাহিনীর তিনটি ডেস্ট্রয়ার হামলার মুখে পড়ে। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র প্রণালির সংলগ্ন ইরানের দুটি বন্দরে হামলা চালায়।
আরটিভি/এমএ