মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬ , ০৮:০৭ পিএম
সান ফ্রান্সিসকো উপসাগরের মাঝখানে অবস্থিত আলকাট্রাজ দ্বীপের নাম শুনলে আজও মানুষের মনে ভেসে ওঠে এক দুর্ভেদ্য কারাগারের ছবি। যে দ্বীপের চারপাশের বরফশীতল পানি আর উত্তাল স্রোত একসময় বিশ্বের দুর্ধর্ষ অপরাধীদের পালানোর স্বপ্নকে চুরমার করে দিত, সেই ‘অজেয়’ জলপথ জয় করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে একটি বন্য কোয়োট। নেকড়ে সদৃশ এই প্রাণীর এমন দুঃসাহসিক অভিযানে খোদ বিজ্ঞানীরাও বিস্মিত। খবর এপির।
বছরের শুরুতে যখন আলকাট্রাজ দ্বীপে প্রথম কোয়োটটিকে দেখা যায়, তখন জীববিজ্ঞানীরা ভেবেছিলেন এটি হয়তো নিকটবর্তী সান ফ্রান্সিসকো শহর থেকে মাত্র এক মাইল পথ সাঁতরে এসেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক ডিএনএ পরীক্ষা বিজ্ঞানীদের সেই ধারণা পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিসের বন্যপ্রাণী পরিবেশবিদ বিল মের্কেল এক বিবৃতিতে জানান, এই পুরুষ কোয়োটটি আসলে সান ফ্রান্সিসকো নয়, বরং ৩ দশমিক ২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ‘অ্যাঞ্জেল আইল্যান্ড’ থেকে সাঁতরে আলকাট্রাজে পৌঁছেছে।
সমুদ্রের প্রতিকূল স্রোত ও হাড়কাঁপানো ঠান্ডা জয় করে ৩ কিলোমিটারেরও বেশি পথ পাড়ি দেওয়া কোনো বন্য প্রাণীর জন্য বিরলতম ঘটনা। জানুয়ারির প্রথম দিকে ধারণ করা একটি ভিডিওতে কোয়োটটির সেই মরণপণ লড়াইয়ের চিত্র উঠে এসেছে।
ভিডিওতে দেখা যায়, উত্তাল ঢেউয়ের মধ্যে কেবল মাথাটুকু ভাসিয়ে প্রাণীটি আপ্রাণ চেষ্টা করছে তীরে ওঠার। দীর্ঘক্ষণ সাঁতার কাটার পর যখন সে পাথুরে দ্বীপে পা রাখে, তখন তাকে দেখতে ছিল পুরোপুরি বিধ্বস্ত।
রেবেকা হাসন নামের এক পর্যটক আলকাট্রাজ ভ্রমণে গিয়ে কোয়োটটির ছবি তুলেছিলেন। তিনি জানান, দ্বীপে ওঠার সময় ওকে ভেজা ইঁদুরের মতো দেখাচ্ছিল। কিন্তু কিছুক্ষণ পর সে যখন পর্যটকদের সামনে দিয়ে যাচ্ছিল, তখন তাকে বেশ সুস্থ ও সাবলীল লাগছিল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোয়োটরা সাধারণত নতুন সঙ্গী অথবা নিজের জন্য নিরাপদ কোনো নতুন এলাকার সন্ধানে এমন ভয়ঙ্কর ঝুঁকি নিয়ে থাকে। তবে আলকাট্রাজের মতো জায়গায় পৌঁছানো কোনোভাবেই সাধারণ ব্যাপার নয়।
১৯৩০ থেকে ১৯৬০-এর দশক পর্যন্ত এই দ্বীপে অবস্থিত ফেডারেল কারাগার থেকে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন ৩৬ জন কয়েদি। কিন্তু সমুদ্রের তীব্র স্রোত আর ঠান্ডার কাছে হার মেনে প্রায় সবাই ধরা পড়েছেন অথবা প্রাণ হারিয়েছেন। যে পথ মানুষের কাছে ছিল যমদূত, সেই পথই অবলীলায় জয় করল এই বন্য প্রাণী। এটি যেন প্রকৃতির এক রহস্যময় শক্তির প্রকাশ।
আলকাট্রাজ দ্বীপটি সামুদ্রিক পাখিদের নিরাপদ প্রজনন ক্ষেত্র হওয়ার কারণে কর্তৃপক্ষ কোয়োটটিকে ধরে অন্য স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু কোয়োটটি যেন বিজ্ঞানীদের সঙ্গে কানামাছি খেলছে। জানুয়ারি মাসের পর থেকে সেটিকে আর দ্বীপে দেখা যায়নি। কোনো ক্যামেরা বা ফাঁদেও সে ধরা দেয়নি।
বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, হয়তো আবারও কোনো নতুন গন্তব্যের টানে সে একইভাবে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে অন্য কোথাও চলে গেছে। এই ঘটনা প্রাণীবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক বিস্ময়কর অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
আরটিভি/এআর