images

আন্তর্জাতিক

যেসব দেশে সামাজিক মাধ্যমে পোস্টের জন্য হচ্ছে জেল-নির্বাসন

সোমবার, ১৮ মে ২০২৬ , ০৩:৪২ পিএম

ইরান-ইসরায়েল সংঘাত শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি উপসাগরীয় দেশে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট, মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়ার জেরে গ্রেফতার, কারাদণ্ড, বহিষ্কার এবং নাগরিকত্ব বাতিলের ঘটনা বেড়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো এসব পদক্ষেপকে মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর কঠোর দমননীতি হিসেবে উল্লেখ করেছে।

বিশেষ করে কুয়েত ও বাহরাইনে সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, ইনফ্লুয়েন্সার এবং সাধারণ নাগরিকদের বিরুদ্ধে জাতীয় নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত করা, ভুয়া খবর ছড়ানো, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ উসকে দেওয়া এবং মোবাইল ফোনের অপব্যবহারের অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

কুয়েতের নিরাপত্তা আদালত গত ২৩ এপ্রিল সামাজিক মাধ্যম-সম্পর্কিত মামলায় ১৩৫ জনের বিরুদ্ধে রায় দেয়। এর মধ্যে ১৭ জনকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একজন পলাতক আসামিকে মোট ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ১০৯ জনকে পোস্ট মুছে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং নয়জনকে খালাস দেওয়া হয়।

খালাস পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন সাংবাদিক ও লেখক আহমেদ শিহাব-এলদিন। পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে কুয়েতে গিয়ে তিনি আটক হন। তার বিরুদ্ধে ভুয়া তথ্য ছড়ানো ও জাতীয় নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগ আনা হয়েছিল। ৫২ দিন আটক থাকার পর তাকে নির্দোষ ঘোষণা করা হয়।

যুদ্ধ শুরুর পর কুয়েত নতুন এক ডিক্রি জারি করে, যেখানে সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় এমন তথ্য প্রকাশের জন্য তিন থেকে ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং বড় অঙ্কের জরিমানার বিধান রাখা হয়। একই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবিরোধী বিষয়ে বিশেষ আদালত গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কুয়েতি নাগরিক জানিয়েছেন, শুধু পোস্ট করা নয়, কোনো পোস্টে লাইক দেওয়া বা প্রতিক্রিয়া জানানোর কারণেও মানুষকে আটক করা হচ্ছে। এমনকি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর আশঙ্কায় শোক প্রকাশ করাও নজরদারির আওতায় এসেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

তিনি আরও জানান, বেশিরভাগ আটক ব্যক্তি শিয়া সম্প্রদায়ের হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি তৈরি হয়েছে। কিছু অন্তঃসত্ত্বা নারীসহ আটক ব্যক্তিদের কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলেও দাবি করা হয়।

কুয়েতের নতুন নাগরিকত্ব আইনের ১৩ নম্বর ধারায় রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, ধর্ম অবমাননা বা দেশের রাজনৈতিক-সামাজিক ব্যবস্থার ক্ষতির অভিযোগে নাগরিকত্ব বাতিলের সুযোগ রাখা হয়েছে। ১৪ নম্বর ধারায় বিদেশি রাষ্ট্রের স্বার্থে কাজ করলে নাগরিকত্ব প্রত্যাহারের বিধান রয়েছে।

মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলছে, এসব আইনি পরিবর্তনের ফলে সাংবাদিকতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা কঠিন হয়ে পড়ছে এবং মানুষের মধ্যে আত্মনিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে।

অন্যদিকে বাহরাইন সরকার জানিয়েছে, শত্রুভাবাপন্ন ইরানি কর্মকাণ্ডকে সমর্থন এবং বিদেশি পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগে ৬৯ জনের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, বাদশাহ হামাদ বিন ইসা আল খলিফার নির্দেশনায় জাতীয়তা আইনের আওতায় এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, অনেক আটক ব্যক্তিকে আইনজীবীর সহায়তা নিতে দেওয়া হয়নি এবং ন্যায়বিচারের সুযোগ সীমিত করা হয়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এর তথ্য অনুযায়ী, সংঘাত শুরুর পর বাহরাইনে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ, যুদ্ধবিরোধী মত প্রকাশ এবং অনলাইনে ভিডিও বা তথ্য শেয়ার করার অভিযোগে দমন-পীড়ন বেড়েছে।

একজন বাহরাইনি কর্মীর দাবি, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রায় ৩০৪ জনকে আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে নারী, অপ্রাপ্তবয়স্ক ও বিদেশি নাগরিকও রয়েছেন।

বাহরাইনের সরকার বলছে, গ্রেফতারগুলো শুধুমাত্র অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে করা হয়েছে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ, ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের মতো সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক এবং অনলাইনে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এদিকে উপসাগরীয় অঞ্চলের আরও কয়েকটি দেশও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা দুর্বল করার অভিযোগে বিভিন্ন গোষ্ঠীকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে এসব গোষ্ঠীর সঙ্গে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড বা হিজবুল্লাহর সম্পর্ক থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

আরটিভি/এসকে