বুধবার, ২০ মে ২০২৬ , ০৫:০৬ পিএম
ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির এক বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে দেশটিতে তীব্র ক্ষোভ, ব্যঙ্গ ও অনলাইন প্রতিবাদ শুরু হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘তেলাপোকা জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামে একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক আন্দোলন এখন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল-জাজিরা ও ভারতের একাধিক সংবাদমাধ্যম এ নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, অভিনব এই অনলাইন আন্দোলনের নেপথ্যে রয়েছেন ৩০ বছর বয়সী ডিজিটাল মিডিয়া স্ট্র্যাটেজিস্ট অভিজিৎ দীপকে। যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জনসংযোগ বিষয়ে সদ্য স্নাতক শেষ করা এই তরুণ গত কয়েক দিন ধরে প্রায় নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন সামাজিক মাধ্যমে আসা হাজারো মানুষের বার্তার জবাব দিতে।
ঘটনার শুরু গত ১৫ মে শুক্রবার। খোলা আদালতে এক মামলার শুনানির সময় ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত ও বিচারপতি যোগমাল্য বাগচীর বেঞ্চ ক্ষোভ প্রকাশ করেন। প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেন, ‘কিছু পরজীবী পুরো ব্যবস্থার ওপর আক্রমণ করছে।’ এ সময় বেকার তরুণদের একাংশকে ‘তেলাপোকা’র সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, ‘এমন কিছু তরুণ আছে যারা কোনো চাকরি পায় না বা পেশায় জায়গা করতে পারে না। তাদের কেউ মিডিয়ায় যায়, কেউ সামাজিক মাধ্যমে, কেউ আরটিআই (তথ্য অধিকার) কর্মী বা অন্য ধরনের কর্মী হয়ে সবাইকে আক্রমণ করতে শুরু করে।’
প্রধান বিচারপতির এই মন্তব্য দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ভারতের ‘জেন-জি’ অর্থাৎ তরুণ প্রজন্মের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এর প্রতিবাদে ১৬ মে অভিজিৎ দীপকে এক্স (সাবেক টুইটার) ও ইনস্টাগ্রামে ‘তেলাপোকা জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামের একটি প্রতীকী ও ব্যঙ্গাত্মক প্ল্যাটফর্ম চালুর ঘোষণা দেন। দলটির সদস্য হওয়ার যোগ্যতা হিসেবে রসাত্মকভাবে উল্লেখ করা হয়—‘বেকার, অলস, সার্বক্ষণিক অনলাইনে থাকা এবং পেশাদারভাবে ক্ষোভ প্রকাশের ক্ষমতাসম্পন্ন’। দলটির নির্বাচনি প্রতীক নির্ধারণ করা হয়েছে ‘মোবাইল ফোন’।
দেখতে দেখতে এই ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন এক বিশাল রূপ নেয়। মাত্র চার দিনে দলটির ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজগুলোতে কয়েক লাখ মানুষ যুক্ত হয়েছেন। এমনকি তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) সংসদ সদস্য মহুয়া মৈত্র ও কীর্তি আজাদের মতো মূলধারার রাজনীতিকেরাও সামাজিক মাধ্যমে এই দলে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে রসাত্মক পোস্টে অংশ নিয়েছেন।
দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার মুখে গত শনিবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত তার বক্তব্যের একটি ব্যাখ্যা দেন। তিনি দাবি করেন, তার মন্তব্যটি ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তিনি ভারতের বেকার যুবসমাজকে লক্ষ্য করে কিছু বলেননি; বরং যারা ‘ভুয়া ও জাল ডিগ্রি’ নিয়ে আইন বা গণমাধ্যমের মতো পেশায় প্রবেশ করে ব্যবস্থার ক্ষতি করছে, তাদের উদ্দেশ্য করে এই কথা বলেছিলেন। তিনি আরও বলেন, ‘ভারতের তরুণ সমাজই উন্নত ভারতের মূল স্তম্ভ।’
প্রধান বিচারপতি ব্যাখ্যা দিলেও তরুণদের ক্ষোভ কমেনি। বিশ্লেষকদের মতে, ‘তেলাপোকা জনতা পার্টি’ কেবল একটি কৌতুক নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে ভারতের শিক্ষিত তরুণদের দীর্ঘদিনের জমানো ক্ষোভ ও হতাশা। মোদি সরকারের গত ১২ বছরের শাসনামলে বাড়তে থাকা বেকারত্ব, তীব্র মূল্যস্ফীতি, প্রশ্ন ফাঁস কেলেঙ্কারি এবং প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলার বিরুদ্ধে এটি যুবসমাজের একটি প্রতীকী প্রতিরোধ।
ব্যঙ্গাত্মক এই দলটির ৫ দফা ইশতেহারে কিছু গুরুতর দাবিও তোলা হয়েছে। যেমন—অবসর গ্রহণের পর সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিদের রাজ্যসভার সদস্য পদ বা কোনো রাজনৈতিক পুরস্কার দেওয়া যাবে না, দলবদল করা আইনপ্রণেতাদের ২০ বছরের জন্য নির্বাচনে নিষিদ্ধ করতে হবে এবং সিবিএসই বা বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ফি ও অনিয়ম বন্ধ করতে হবে।
আন্দোলনের উদ্যোক্তা অভিজিৎ দীপকে বলেন, ‘ক্ষমতাসীনরা মনে করেন সাধারণ নাগরিকেরা বুঝি তেলাপোকা বা পরজীবী। তাদের জানা উচিত, পচা জায়গাতেই তেলাপোকার জন্ম হয়। বর্তমান ভারতের শাসনব্যবস্থার অবস্থাও তেমনই।’
আরটিভি/এআর