images

আন্তর্জাতিক

আমাজনে পাওয়া গেল ৩ হাজার বছরের পুরোনো ‘হারানো শহর’

বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬ , ০১:১৪ পিএম

দক্ষিণ আমেরিকার ইকুয়েডরের আমাজন জঙ্গলে পাওয়া বিশাল প্রাচীন বসতি নিয়ে নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে চমকপ্রদ তথ্য। দীর্ঘদিন ধরে যাকে ‘হারানো শহর’ বলা হচ্ছিল, সেটি আসলে একক কোনো শহর নয়—বরং জটিল ও বিস্তৃত এক প্রাচীন মানবসভ্যতার নেটওয়ার্ক।

গবেষকদের মতে, প্রায় ৩ হাজার বছর আগে এই অঞ্চলে মানুষ মাটি কেটে উঁচু ঢিবি, প্ল্যাটফর্ম, রাস্তা ও খাল তৈরি করে একটি বিশেষ ধরনের নগর কাঠামো গড়ে তুলেছিল, যা প্রচলিত শহরের ধারণা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।

মাটি দিয়ে গড়া বিশাল সভ্যতা

আন্তর্জাতিক বার্তাসংস্থা বিবিসি জানায়, ইকুয়েডরের আপানো নদী উপত্যকায় পাওয়া এই স্থাপনাগুলোতে হাজার হাজার মাটির ঢিবি, রাস্তা, চত্বর এবং বসবাসের কাঠামো রয়েছে। উপগ্রহভিত্তিক লেজার প্রযুক্তির মাধ্যমে গবেষকরা জানতে পারেন, পুরো এলাকায় প্রায় সাড়ে সাত হাজারের বেশি মানবনির্মিত কাঠামো ছড়িয়ে আছে।

এগুলোর মধ্যে রয়েছে বসবাসের জন্য ছোট প্ল্যাটফর্ম, বড় আকারের ধর্মীয় বা আনুষ্ঠানিক স্থাপনা এবং সংযোগের জন্য সরু ও দীর্ঘ রাস্তা।

গবেষকদের নতুন ব্যাখ্যা

পন্টিফিসিয়া ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক আলদেন ইয়েপেস এবং অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কোনো একক শহর নয়, বরং এক ধরনের বিকেন্দ্রীভূত নগর ব্যবস্থা। যেখানে অনেক ছোট ছোট বসতি একসঙ্গে একটি নেটওয়ার্ক হিসেবে কাজ করত।

গবেষক মাইকেল হেকেনবার্গারের মতে, এটি ইউরোপীয় ধাঁচের শহরের মতো নয়; বরং এমন এক নগর ব্যবস্থা যেখানে জনবসতি ছিল ছড়িয়ে ছিটিয়ে কিন্তু পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত।

কীভাবে গড়ে উঠেছিল এই কাঠামো

গবেষণায় ধারণা করা হচ্ছে, মানুষ প্রতিদিন মাটি পরিবহন করে এই বিশাল কাঠামো তৈরি করেছিল। অনেক জায়গায় রাস্তা এতটাই সোজা ও পরিকল্পিত যে, গবেষকরা একে প্রায় নিখুঁত চেকারবোর্ড নকশার সঙ্গে তুলনা করছেন।

এখানে ভুট্টা, শিম, কাসাভা ও আলু চাষ হতো বলে ধারণা করা হচ্ছে। পাশাপাশি সমষ্টিগত উৎসব ও পানীয় গ্রহণের প্রমাণও পাওয়া গেছে।

এখনও অজানা অনেক প্রশ্ন

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সভ্যতার জনসংখ্যা কত ছিল বা তারা কীভাবে সংগঠিত ছিল—এ বিষয়ে এখনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। এমনকি এখানে কোনো কবরস্থান বা মানব কঙ্কালেরও পরিষ্কার প্রমাণ মেলেনি।

গবেষক ফ্লোরেনসিও ডেলগাদো প্রশ্ন তুলেছেন—“সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, মানুষগুলো কোথায়?”

‘হারানো শহর’ নয়, ভুল ধারণা

অনেক গবেষক বলছেন, এই কাঠামোকে ‘হারানো শহর’ বলা ভুল ধারণা তৈরি করে। কারণ এটি কখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি, বরং স্থানীয়রা আগেও এ সম্পর্কে জানতেন।

কানাডার গবেষক ক্যাথরিন রিস-টেইলর মনে করেন, ‘হারানো শহর’ শব্দটি অতিরঞ্জিত ধারণা দেয় এবং প্রকৃত ইতিহাসকে আড়াল করে।

স্থানীয়দের বর্তমান জীবন ও সংরক্ষণ

বর্তমানে এই এলাকাগুলো সাধারণ মানুষের বসবাস ও কৃষিজমির সঙ্গে মিশে আছে। অনেক স্থাপনা ব্যক্তিগত জমির মধ্যে থাকায় স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে সংরক্ষণ নিয়ে দ্বন্দ্বও তৈরি হচ্ছে।

তবে কিছু স্থানীয় মানুষ ও স্বেচ্ছাসেবী দল ‘ঐতিহ্য রক্ষী’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাটির এই প্রাচীন কাঠামোগুলো রক্ষা করছে এবং পর্যটকদের জন্য পরিচিত করে তুলছে।

নতুন দিগন্তের ইঙ্গিত

গবেষকরা মনে করছেন, আমাজনের এই আবিষ্কার প্রমাণ করছে যে, প্রাচীন আমাজন ছিল শুধুই বন্য অঞ্চল নয়—বরং এক সময় জটিল ও উন্নত মানবসভ্যতার কেন্দ্র ছিল, যা এখনো পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি।

তথ্যসূত্র: বিবিসি 


আরটিভি/জেএমএ