images

আন্তর্জাতিক

ফিলিস্তিনের পক্ষে থেকেও ইসরায়েলকে জ্বালানি দিয়ে সাহায্য ব্রাজিলের

রোববার, ১৪ জুন ২০২৬ , ১০:৫০ এএম

গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযানের কড়া সমালোচনা করেছেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। তিনি এই পরিস্থিতিকে ‘পরিকল্পিত গণহত্যা’ বলে উল্লেখ করেছেন। তবে একই সময়ে ইসরায়েলের সঙ্গে ব্রাজিলের বাণিজ্যিক সম্পর্ক, বিশেষ করে জ্বালানি রপ্তানি অব্যাহত থাকায় দেশটিতে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

২০২৫ সালে ফ্রান্স সফরের সময় লুলা গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা করেন। এদিকে প্রেসিডেন্টের বিশেষ উপদেষ্টা সেলসো আমোরিম গত সপ্তাহে আইনপ্রণেতাদের জানান, ব্রাজিল ইসরায়েলের সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তি পুনর্বিবেচনা করছে। তিনি মূলত সামরিক সহযোগিতার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন।

তবে আমোরিম শুরুতেই কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করার সম্ভাবনা নাকচ করে দেন। তার যুক্তি, এমন সিদ্ধান্ত ইসরায়েলে অবস্থানরত ব্রাজিলীয় নাগরিকদের জন্য সমস্যা তৈরি করতে পারে।

সম্পর্ক ছিন্নের বিকল্প পথের প্রস্তাব

সাও পাওলোর পন্টিফিকাল ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ব্রুনো হুবারম্যান এই যুক্তির সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন। যদিও তিনি স্বীকার করেন, ইসরায়েলে থাকা ব্রাজিলীয়দের জন্য কনস্যুলার সহায়তা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।

তবে তার মতে, এর বাস্তবসম্মত সমাধান রয়েছে। হুবারম্যান বলেন, বর্তমানে তেল আবিবে যেসব ব্রাজিলীয় নাগরিক কনস্যুলার সেবা নেন, তারা চাইলে ফিলিস্তিনে ব্রাজিলের দূতাবাস থেকেও সেই সেবা নিতে পারেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, অধিকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লাহ শহরে ব্রাজিল এরই মধ্যে এ ধরনের সেবা দিয়ে আসছে।

তার ভাষায়, রামাল্লাহ ও পূর্ব জেরুজালেমে কনস্যুলার সেবা থাকায় ইসরায়েল নামে পরিচিত ওই ভূখণ্ডে বসবাসকারী ব্রাজিলীয়দের জন্য সহজ বিকল্প তৈরি করা সম্ভব।

অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রভাব

আরেক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও অধ্যাপক ব্রুনো লিমা রোচা মনে করেন, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে ব্রাজিল সরকারের অনীহার পেছনে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কারণ রয়েছে।

তার মতে, অতীতের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ, ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধ, ১৯৭৩ সালের ইয়োম কিপুর যুদ্ধ কিংবা লেবাননে ইসরায়েলের অভিযানের সময় ব্রাজিলের রাজনীতিতে এত সংখ্যক জায়নবাদপন্থী ও ইভানজেলিক্যাল মতাদর্শের আইনপ্রণেতা ছিল না।

তিনি বলেন, আজকের পশ্চিমা বিশ্বের উগ্র ডানপন্থিদের মতোই এদের অবস্থান শতভাগ ইসরায়েলপন্থি। এটি চরম ডানপন্থার নতুন বিন্যাস।

রোচার মতে, ব্রাজিলের অবস্থান অনেক আরব দেশের মতোই দ্ব্যর্থক। কারণ গত কয়েক দশকে বহু আরব ও মুসলিম দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে, বিশেষ করে বাণিজ্যিক সম্পর্ক, আরও জোরদার করেছে।

তিনি বলেন, লুলা আসলে অনেক আরব ও মুসলিম রাষ্ট্র যা করে, তাই করছেন। তারা যদি কঠোর অবস্থান না নেয়, তাহলে একটি লাতিন আমেরিকান দেশের কাছ থেকে আরও কঠোর অবস্থান কীভাবে আশা করা যায়?

তবে তিনি বর্তমান পরিস্থিতিকে গণহত্যা হিসেবে উল্লেখ করে ব্রাজিল ও ইসরায়েলের মধ্যে সম্পর্ক ছিন্নের পক্ষে মত দেন। অন্তত লুলার বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সাময়িকভাবে বাণিজ্য স্থগিত করার পরামর্শ দেন তিনি।

সরকারের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে নাগরিক সমাজ

এদিকে সামাজিক আন্দোলন, রাজনৈতিক দল, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী ও শিক্ষাবিদদের একটি বড় অংশ ব্রাজিল সরকারকে ইসরায়েলের ওপর চাপ বাড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছে। তাদের দাবি, ফিলিস্তিনে গণহত্যা বন্ধে ব্রাজিলকে ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্য বাতিল করতে হবে। বিশেষ করে জ্বালানি রপ্তানি বন্ধ এবং ইসরায়েলি পণ্যের বর্জনের দাবি জোরালো হয়েছে।

গত ১৫ জুন ব্রাজিলের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে অংশগ্রহণকারীরা লুলা সরকারের কাছে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ করার আহ্বান জানান।

ব্রাজিল-ইসরায়েল বাণিজ্যের চিত্র

২০২৪ সালে ইসরায়েলের ১২তম বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার ছিল ব্রাজিল। ইসরায়েলের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের ২.১ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করেছে দেশটি।

আমেরিকা মহাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের পর ব্রাজিল ছিল ইসরায়েলের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার।

একই বছরে ব্রাজিল ইসরায়েলে ৭২৫.১ মিলিয়ন বা ৭২.৫১ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করে, যা ২০২৩ সালের তুলনায় ৯ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি।

অন্যদিকে, ইসরায়েল থেকে ব্রাজিল আমদানি করে ১.১ বিলিয়ন বা ১১০ কোটি ডলারের পণ্য, যা আগের বছরের তুলনায় ১৪.৯ শতাংশ কম।

রপ্তানি বাড়লেও এবং আমদানি কমলেও ব্রাজিলের বাণিজ্য ঘাটতি অব্যাহত রয়েছে। ২০২৪ সালে দেশটির ঘাটতি ছিল ৪২৫ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডলার।

সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হয় জ্বালানি

২০২৪ সালে ব্রাজিল থেকে ইসরায়েলে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হওয়া পণ্য ছিল জ্বালানি তেল, যা মোট রপ্তানির ৩০ শতাংশ। এরপর ছিল গরুর মাংস (২৩ শতাংশ) এবং সয়াবিন (১১ শতাংশ)।

অন্যদিকে, ইসরায়েল থেকে ব্রাজিলে রপ্তানির মধ্যে কীটনাশক, জৈব ও রাসায়নিক সার মিলিয়ে ছিল মোট রপ্তানির ৪৪ শতাংশ। বিমান ও বিমানযন্ত্রাংশ ছিল ৪.৮ শতাংশ।

২০২৫ সালেও ঘাটতি

২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত সময়েও ব্রাজিলের বাণিজ্য ঘাটতি অব্যাহত রয়েছে।

এই সময়ে ইসরায়েলে ব্রাজিলের রপ্তানি ছিল ২১৯ মিলিয়ন বা ২১ কোটি ৯০ লাখ ডলার। বিপরীতে আমদানি হয়েছে ৫২৮ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। ফলে পাঁচ মাসেই ব্রাজিলের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩০৮ মিলিয়ন বা ৩০ কোটি ৮০ লাখ ডলার।

সম্পর্ক ছিন্ন করলে কার ক্ষতি বেশি?

অর্থনীতিবিদ ডায়ানা শাইবের মতে, বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করলে অর্থনৈতিক প্রভাব অবশ্যই পড়ে। তবে সেই প্রভাব নির্ভর করে পারস্পরিক নির্ভরতার মাত্রার ওপর।

তিনি বলেন, ইসরায়েল ব্রাজিলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হলেও কেন্দ্রীয় কোনো বাজার নয়। ২০২৪ সালে দেশটি ব্রাজিলের মোট রপ্তানির মাত্র ০.৪ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করেছে।

তার মতে, ব্রাজিল সহজেই নতুন বাজার খুঁজে নিতে পারবে। অন্যদিকে ইসরায়েলের জন্য পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন।

শাইব বলেন, ব্রাজিল ছিল ইসরায়েলের ১২তম বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। বিশেষ করে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মতো অপরিহার্য পণ্যে ইসরায়েলের নির্ভরতা বেশি।

তার মতে, সম্পর্ক ছিন্নের অর্থনৈতিক প্রভাবের চেয়ে রাজনৈতিক বার্তাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে। তিনি বলেন, এটি মানবাধিকার এবং যুদ্ধবিরতির পক্ষে আন্তর্জাতিক চাপের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি শক্তিশালী কূটনৈতিক বার্তা হবে।

সামরিক সহযোগিতাও রয়েছে

বাণিজ্যের পাশাপাশি ইসরায়েলের সঙ্গে ব্রাজিলের সামরিক সহযোগিতাও রয়েছে। ২০২২ সালের এপ্রিলে সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারো সংগঠিত অপরাধ দমনে দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করেন।

চুক্তিতে গোয়েন্দা তথ্য, তথ্যপ্রযুক্তি ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সহযোগিতার বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল।

কূটনৈতিক সংকট

২০২৪ সালের মে মাসে প্রেসিডেন্ট লুলা তেল আবিব থেকে রাষ্ট্রদূত ফ্রেদেরিকো মেয়ারকে প্রত্যাহার করেন। এর আগে ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় লুলাকে ‘অবাঞ্ছিত ব্যক্তি’ ঘোষণা করেছিল।

সংকটের সূত্রপাত হয়, যখন লুলা গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে অ্যাডলফ হিটলারের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তুলনা করেন।

পরে ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূতকে পূর্বঘোষণা ছাড়াই একটি হলোকাস্ট স্মরণ অনুষ্ঠানস্থলে নিয়ে যাওয়া হয়, যা কূটনৈতিক অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

পরবর্তী সময়ে মেয়ারকে জেনেভায় বদলি করা হয়। এরপর থেকে ইসরায়েলে ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূতের পদটি শূন্য রয়েছে।

সেলসো আমোরিম এই ঘটনাকে কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ‘নাটকীয় বার্তা’ বলে বর্ণনা করেছেন।

সূত্র: ব্রাজিল দে ফাতো

আরটিভি/এসএস