শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬ , ০৬:২৯ পিএম
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম চীন সফর নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমে ব্যাপক উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এই সফরকে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে একটি বড় মোড় হিসেবে দেখছে ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলো। মোংলা বন্দরের অর্থনৈতিক অঞ্চল, তিস্তা নদী প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা, সম্ভাব্য সামরিক সহযোগিতা এবং বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক করিডোর নিয়ে নয়াদিল্লিতে বেশ উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ যে ধীরে ধীরে চীনের দিকে আরও ঝুঁকছে, তা ভারতের ঐতিহ্যগত প্রভাব বলয়ের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন ভারতীয় বিশ্লেষকরা।
মোংলায় চীনের প্রবেশ ঘিরে উদ্বেগ
শুক্রবার (২৬ জুন) টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, বাগেরহাটের মোংলা বন্দরের পাশে ১১০ একর জমিতে অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইপিজেড) গড়ে তোলার চুক্তি চূড়ান্ত করেছে বাংলাদেশ ও চীন। এই জমি আগে ভারতের জন্য বরাদ্দ ছিল। কিন্তু ২০২৫ সালে প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার সেই বরাদ্দ বাতিল করে দেয়।
টাইমস অব ইন্ডিয়া বলেছে, বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলাকে ঘিরে চীনের এই বিনিয়োগ বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরে বেইজিংয়ের কৌশলগত উপস্থিতি আরও মজবুত করবে। পাকিস্তানের গোয়াদর থেকে আফ্রিকার জিবুতি পর্যন্ত চীনের বন্দর বিনিয়োগের ধারায় মোংলা একটি নতুন সংযোজন হতে পারে।
ইন্ডিয়া টুডে আরও সরাসরি প্রশ্ন তুলেছে, ভারতের কি উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত? পত্রিকাটির মতে, এটি শুধু একটি অর্থনৈতিক প্রকল্প হাতছাড়া হওয়া নয়, বরং ভারতের পূর্ব উপকূলের কাছাকাছি চীনের দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতির দরজা খুলে দিতে পারে।
তিস্তা প্রকল্পে ভারতের 'সংবেদনশীল স্নায়ু'
চীন সফরে তারেক রহমান তিস্তা নদীর ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে বেইজিংয়ের সহযোগিতা চেয়েছেন। এ বিষয়টি প্রায় সব ভারতীয় গণমাধ্যমেই বড় করে এসেছে।
দ্য হিন্দু জানিয়েছে, তিস্তা নিয়ে ভারত-বাংলাদেশের বিরোধ অনেক পুরনো। শেখ হাসিনা সরকার ভারতের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করলেও বর্তমান সরকার অপেক্ষা না করে নিজস্ব উন্নয়ন পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে চায়।
দ্য প্রিন্ট লিখেছে, তিস্তা প্রকল্প ভারতের কাছে খুবই স্পর্শকাতর। কারণ নদীটি পশ্চিমবঙ্গ ও সিকিম হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে এবং এর অবস্থান শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেনস নেক’এর খুব কাছাকাছি। এই করিডোর ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের একমাত্র স্থল যোগাযোগ। তাই সেখানে চীনের যেকোনো উপস্থিতি নয়াদিল্লিকে চিন্তিত করে।
১৩টি সমঝোতা ও নতুন করিডোর আলোচনা
এনডিটিভি ও ইন্ডিয়া টুডে জানিয়েছে, সফরে বাংলাদেশ ও চীন ১৩টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নদী ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো সহ বিভিন্ন খাতে এসব চুক্তি হয়েছে।
চীনা প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে বৈঠকে চট্টগ্রাম ও মোংলায় চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে ঐকমত্য হয়। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে আলোচনায় চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর নিয়েও কথা হয়েছে। ভারতীয় মাধ্যমগুলো বলছে, এটি আগের বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার (বিসিআইএম) করিডোরের একটি সংক্ষিপ্ত সংস্করণ।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতার জল্পনা
এনডিটিভি জানিয়েছে, বাংলাদেশ ২৪টি চীনা জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনা করছে। বাস্তবায়িত হলে পাকিস্তানের পর বাংলাদেশ হবে এই মডেলের দ্বিতীয় বিদেশি ব্যবহারকারী। এছাড়া 'টু প্লাস টু' সংলাপের মাধ্যমে দুই দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত আলোচনার বিষয়েও সমঝোতা হয়েছে বলে জানা গেছে।
শি জিনপিং তারেক রহমানকে বলেছেন, চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় সমর্থন দেয় এবং বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করে। ভারতীয় মাধ্যম এই বক্তব্যকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছে।
উদ্বেগ কতটা যৌক্তিক
আউটলুক ম্যাগাজিনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নয়াদিল্লির উদ্বেগ মূলত অর্থনৈতিক নয়, বরং ভূগোল ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত। মোংলা, তিস্তা এবং লালমনিরহাট বিমানঘাঁটিকে ঘিরে চীনা সম্পৃক্ততার সম্ভাবনা ভারতের জন্য নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে।
তবে ভারতও চুপ করে নেই। নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী পর্যটক ভিসা চালু করার ঘোষণা দিয়েছেন। নিরাপত্তা ও জ্বালানি খাতে সহযোগিতাও চলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ এখন একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে চায়। চীনের অর্থনৈতিক সহায়তা নেবে, আবার ভারতের সঙ্গে ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক সম্পর্কও বজায় রাখবে।
ভারতীয় গণমাধ্যমে তারেক রহমানের এই সফরকে শুধু দ্বিপাক্ষিক সফর হিসেবে নয়, বরং আঞ্চলিক কৌশলগত ভারসাম্যে সম্ভাব্য বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
আরটিভি/ এসকেডি