images

আন্তর্জাতিক / দক্ষিণ আমেরিকা

৩২ ঘণ্টা পর ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে জীবিত উদ্ধার ১৮ দিনের শিশু

রোববার, ২৮ জুন ২০২৬ , ০১:২৫ পিএম

চারপাশে কেবলই ধ্বংসস্তূপ। ইতিমধ্যে প্রাণ হারিয়েছেন এক হাজার চারশত জনেরও বেশি মানুষ। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় পঞ্চাশ হাজারেরও বেশি বাসিন্দা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয়। সব মিলিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় এখন আশার আলো খুবই ক্ষীণ। তবুও বুধবার (২৪ জুন) দেশটিতে আঘাত হানা জোড়া ভূমিকম্পের পর ধ্বংসস্তূপ থেকে বেঁচে যাওয়ার অসাধারণ কিছু অলৌকিক ঘটনা স্তব্ধ জাতিকে নতুন করে সাহস জোগাচ্ছে।  

শুক্রবার (২৬ জুন) দেশটির সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত লা গুয়াইরা শহরে ধ্বংসস্তূপের নিচে টানা বত্রিশ ঘণ্টা আটকে থাকার পর আঠারো দিন বয়সী এক নবজাতককে জীবিত উদ্ধার করা হয়। তাকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধারের সময় উপস্থিত মানুষ উল্লাস ও করতালিতে ফেটে পড়েন। কম্বলে মোড়ানো শিশুটিকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে উদ্ধারকর্মীদের হাত থেকে তার অশ্রুসজল বাবার কাছে তুলে দেওয়া হয়। এর ঠিক নব্বই মিনিট পর শিশুটির মাকেও ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে জীবিত উদ্ধার করতে সমর্থ হন উদ্ধারকারীরা। হাসপাতালে ওই মাকে জানানো হয়, ভূমিকম্পের সময় নিজের শরীর দিয়ে আগলে রাখার কারণেই অলৌকিকভাবে তার সন্তানের জীবন বেঁচে গেছে।

আরও পড়ুন
5

ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৪৩০, নিখোঁজ ৫১ হাজার

লা গুয়াইরায় আরেকটি ধসে পড়া আবাসিক ভবন থেকে চব্বিশ ঘণ্টা পর চার বছর বয়সী এক শিশুকে উদ্ধার করা হয়। পরে উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপ থেকে তার মা ও বাবাকেও জীবিত বের করে আনেন। ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ বলেন, এই অলৌকিক ঘটনাগুলো চরম দুর্যোগের মধ্যেও দেশবাসীকে কিছুটা আনন্দ ও বেঁচে থাকার আশা দিচ্ছে।

মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে পরপর ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। ভূবিজ্ঞানের ভাষায় এ ধরনের পরপর ঘটা ভূমিকম্পকে ‘ডাবলেট’ বলা হয়। এতে দেশটিতে দুইশত পঞ্চাশটিরও বেশি বহুতল ভবন ধসে পড়েছে। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা প্রধান টম ফ্লেচার জানান, ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়াদের জীবিত উদ্ধারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘সোনালি সময়’ দ্রুত শেষ হয়ে আসছে।

রোববার(২৮ জুন) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানায়, ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে শীর্ষ আইনপ্রণেতা হোর্হে রদ্রিগেজ নিশ্চিত করেছেন যে মৃতের সংখ্যা বেড়ে এখন এক হাজার চারশত ত্রিশ জনে দাঁড়িয়েছে। এই দুর্যোগে আহত হয়েছেন আরও তিন হাজারেরও বেশি। ভয়াবহ এই সংকটে জাতিসংঘের পাশাপাশি ব্রাজিল, কানাডা, মেক্সিকো, কলম্বিয়া, যুক্তরাজ্য ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ সারা বিশ্ব থেকে জরুরি উদ্ধারকারী দল এবং মানবিক সহায়তা পাঠানো হয়েছে।

তবে রাজধানী কারাকাসের ঠিক উত্তরে অবস্থিত লা গুয়াইরা অঞ্চলে ত্রাণ তৎপরতার ধীরগতি নিয়ে মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বাড়ছে। ভারী যন্ত্রপাতির অভাব এবং সরকারের সীমিত উপস্থিতির কারণে বাসিন্দারা এখনো খালি হাতেই ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে স্বজনদের খুঁজছেন। কারাকাসের একটি বিধ্বস্ত এলাকায় ভারপ্রাপ্ত নেত্রী সফরে গেলে স্থানীয় বাসিন্দারা তাকে লক্ষ্য করে তীব্র বিদ্রূপ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

ভূমিকম্পে নিজের ষোলো বছর বয়সী মেয়েকে হারানো মারহোসলি সালাসার নামের এক নারী আর্তনাদ করে বলেন, ‘আমি আমার পাঁচ মাসের ছোট্ট গায়েলকে খুঁজছি। আমাদের এখানে ভারী যন্ত্রপাতি ও জরুরি সহায়তা প্রয়োজন। এখন পর্যন্ত সরকারের কোনো কর্মকর্তাকেই আমরা পাশে দেখিনি।’ শত শত ভবন ও হাসপাতাল ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় আহতদের অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্রে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

এদিকে ভেনেজুয়েলার এই ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞে গভীর মর্মাহত হওয়ার কথা জানিয়েছেন ব্রিটিশ রাজা তৃতীয় চার্লস ও রানি ক্যামিলা। এক সরকারি বিবৃতিতে রাজা চার্লস ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে বলেন, এই অত্যন্ত কঠিন সময়ে আমরা যেসব মানুষ তাদের প্রিয়জন ও ঘরবাড়ি হারিয়েছেন, তাদের সবার পাশে আছি।

জাতিসংঘের এক প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই জোড়া ভূমিকম্পে সরাসরি ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ৬৭০ কোটি মার্কিন ডলার। দ্বিতীয় ভূমিকম্পটি ছিল গত এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূকম্পন। এই দুর্যোগ এমন এক সময়ে আঘাত হানল, যখন তেলসমৃদ্ধ দেশটি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তীব্র অর্থনৈতিক ধসের সঙ্গে লড়াই করছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে নিকোলাস মাদুরোকে অপসারণের পর থেকে দেশটি একটি নাজুক রাজনৈতিক রূপান্তর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় ঘোষণা করেছে, ভূমিকম্প-পরবর্তী জরুরি ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ভেনেজুয়েলা সরকারের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করা হবে।

আরটিভি/আর