মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬ , ০৮:৪১ পিএম
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান তীব্র সংঘাতের মধ্যেই মার্কিন সামরিক বাহিনীর জন্য এক বড় ধরনের সাইবার নিরাপত্তা বিপর্যয় সামনে এসেছে। যুদ্ধ চলাকালে ওই অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের মোবাইল নেটওয়ার্ক হ্যাক করে মার্কিন সেনা ও সামরিক ঠিকাদারদের অবস্থান ও গতিবিধি নজরদারি করেছে ইরান। লন্ডনভিত্তিক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটি মূলত 'মোবাইল সার্ভেইল্যান্স মনিটর' নামের একটি বিশেষ গবেষণা প্রকল্পের টেলিযোগাযোগ-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। একই সঙ্গে এই স্পর্শকাতর বিষয়টি সম্পর্কে গভীরভাবে অবগত আছেন এমন একাধিক উচ্চপদস্থ সূত্রের বক্তব্যের ভিত্তিতে এই দীর্ঘ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে সংবাদমাধ্যমটি।
এই চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনটি প্রকাশ্যে আসার পর যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতাদের মধ্যে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা খাতের নীতিপ্রণেতারা এখন আশঙ্কা করছেন যে আন্তর্জাতিক রোমিং ব্যবস্থা এবং স্মার্টফোনভিত্তিক সাধারণ বিজ্ঞাপন প্রযুক্তির কারণে মার্কিন সামরিক সদস্যরা সহজেই প্রতিপক্ষের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারেন। আধুনিক প্রযুক্তির এই যুগে যেকোনো স্থানে অবস্থান নেওয়ার পর স্মার্টফোনের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট ধরে তাঁদের ট্র্যাক করা খুবই সহজ হয়ে পড়েছে।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা বেশ কিছুদিন ধরেই বিষয়টি নিয়ে অত্যন্ত সন্দিহান ছিলেন। তাদের জোরালো ধারণা, ইরান অথবা তাদের মদদপুষ্ট মিত্র গোষ্ঠীগুলো স্থানীয় মোবাইল অপারেটরদের মধ্যকার আন্তর্জাতিক রোমিং চুক্তির বড় ধরনের ত্রুটিকে কাজে লাগিয়েছে। এই আইনি ও প্রযুক্তিগত ফাঁকফোকর ব্যবহার করে সহজেই মার্কিন সেনাদের অবস্থান নিখুঁতভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
নজরদারির এই পদ্ধতি কেবল সরাসরি নেটওয়ার্ক হ্যাকিংয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরান-সংশ্লিষ্ট সামরিক গোষ্ঠীগুলো অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত সাধারণ মোবাইল বিজ্ঞাপন-সংক্রান্ত তথ্যভান্ডার ব্যবহার করেছে। ইরাকের কুর্দি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে কর্তব্যরত মার্কিন সেনাদের মোবাইল ফোনের অবস্থান অনুসরণে তারা এই বিজ্ঞাপন প্রযুক্তির ফাঁকফোকরকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।
বিশ্বখ্যাত সাইবার নিরাপত্তা গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিটিজেন ল্যাবের জ্যেষ্ঠ গবেষক গ্যারি মিলার এই বিষয়ে তার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিয়েছেন। তিনি বলেন, ইরানের কাছে যেকোনো মোবাইল ব্যবহারকারীর তাৎক্ষণিক এবং ধারাবাহিকভাবে ভৌগোলিক অবস্থান শনাক্ত করার মতো অত্যন্ত আধুনিক ও শক্তিশালী প্রযুক্তিগত সক্ষমতা রয়েছে। মোবাইল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তারা যে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহারকারীদের ও মার্কিন সামরিক বাহিনীকে নিয়মিত অনুসরণ করছে, তাতে সাইবার বিশেষজ্ঞদের অবাক হওয়ার কিছুই নেই।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যুদ্ধের ময়দানে শারীরিক লড়াইয়ের চেয়েও এখন সাইবার ও ডিজিটাল নজরদারির যুদ্ধ অনেক বেশি কার্যকর হয়ে উঠছে। সামান্য একটি মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন বা আন্তর্জাতিক রোমিং সুবিধার মাধ্যমে যেভাবে মার্কিন সেনাদের মতো সুরক্ষিত বাহিনীর তথ্য চলে যাচ্ছে, তা বিশ্বজুড়ে ভবিষ্যৎ সমরাস্ত্র নীতি এবং সেনা মোতায়েন প্রক্রিয়ায় বড় পরিবর্তন আনতে বাধ্য করবে। এই ঘটনার পর ওয়াশিংটনে মার্কিন সামরিক বাহিনীর স্মার্টফোন ব্যবহারের নীতিমালা আরও কঠোর করার দাবি উঠেছে।
আরটিভি/এআর