সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬ , ০৬:৪৭ পিএম
ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোয় বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদদের চাকরি ছাড়ার প্রবণতা আশঙ্কাজনক রূপ নিয়েছে। সম্প্রতি একসঙ্গে শতাধিক অভিজ্ঞ কর্মী পদত্যাগ করায় দেশের শীর্ষস্থানীয় এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি বড় ধরনের কর্মীসংকটে পড়েছে।
জার্মানির গণমাধ্যম ডয়চে ভেলের এক প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানান যায়।
কেন্দ্রীয় সরকারের মহাকাশ বিষয়ক দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ইসরোয় বর্তমানে ২০ হাজারের বেশি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১৫ হাজারেরও কম কর্মী। অর্থাৎ প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার পদ শূন্য পড়ে রয়েছে, যা মোট পদের এক-চতুর্থাংশের চেয়েও বেশি। গগনযান মিশনের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের লঞ্চ ভেহিকল ডিরেক্টর ভিক্টর জোসেফ টি গত ফেব্রুয়ারি মাসে পদত্যাগ করার পর এই সংকট আরও প্রকাশ্যে আসে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই গণ-পদত্যাগের প্রধান কারণ ভারতের বেসরকারি মহাকাশ শিল্পের অভাবনীয় ও দ্রুত বিস্তার। ২০২০ সালে মহাকাশ খাতকে বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করার পর থেকে দেশে স্টার্টআপের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। ২০১৪ সালে যেখানে মাত্র একটি মহাকাশ স্টার্টআপ ছিল, ২০২৫ সালের মধ্যে তা ৪০০ ছাড়িয়ে গেছে। স্কাইরুট অ্যারোস্পেস, অগ্নিকুল কসমসের মতো উদীয়মান কোম্পানিগুলো বিপুল বিদেশি বিনিয়োগ পাওয়ায় বিজ্ঞানীদের আকর্ষণীয় বেতন ও সুযোগ-সুবিধা দিতে পারছে। ইসরোর একজন নবাগত বিজ্ঞানী যেখানে বছরে ১০-১২ লাখ টাকা পান এবং খোদ চেয়ারম্যানের বেতন যেখানে প্রায় ৩০ লাখ টাকা, সেখানে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি বেতনের প্রস্তাব দিচ্ছে। ফলে তরুণ ও অভিজ্ঞ গবেষকেরা দলে দলে সরকারি চাকরি ছেড়ে করপোরেট দুনিয়ায় ঝুঁকছেন।
বেতনের পাশাপাশি ইসরোর অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক জটিলতা এবং সাম্প্রতিক কিছু ব্যর্থতাও বিজ্ঞানীদের মোহভঙ্গের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গগনযান বা মঙ্গলযান-২-এর মতো মেগা প্রকল্পগুলোর সময়সীমা বারবার পিছিয়ে যাওয়ায় কর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। এছাড়া গত এক বছরে পোলার স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকলের পর পর দুটি মিশন ব্যর্থ হওয়ায় প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক মনোবল ভেঙে পড়েছে। তরুণ বিজ্ঞানীরা এখন সরকারি চাকরির ধরাবাঁধা নিরাপত্তার চেয়ে বেসরকারি খাতের চ্যালেঞ্জিং পরিবেশকে বেশি পছন্দ করছেন।
এদিকে, এই কর্মীসংকট ঠেকাতে মহাকাশ দপ্তর গত ১৪ জুলাই একটি কড়া নির্দেশিকা জারি করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে যুক্ত গ্রুপ-এ বিজ্ঞানীদের পদত্যাগ বা স্বেচ্ছাবসরের আবেদন এখন আর সহজে গ্রহণ করা হবে না। তবে ইসরোর সাবেক চেয়ারম্যান সি মাধবন নায়ার মনে করেন, শুধু নিয়ম চাপিয়ে মেধাবীদের ধরে রাখা যাবে না। এর জন্য আর্থিক প্রণোদনা ও কাজের স্বীকৃতি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সাবেক বিজ্ঞানী তপন মিশ্রও মনে করেন, কর্মীদের মনের ভেতর থেকে প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করার গৌরব ও অহমিকা হারিয়ে যাচ্ছে, যা ফিরিয়ে আনা জরুরি।
সরকারি এই সংকটের সমান্তরালে দেশের বেসরকারি মহাকাশ খাত কিন্তু বড় মাইলফলক স্পর্শ করেছে। শ্রীহরিকোটা থেকে বেসরকারি উদ্যোগে তৈরি প্রথম রকেট বিক্রম-১ সফলভাবে উৎক্ষেপণ করেছে স্কাইরুট অ্যারোস্পেস। এই কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা পবনকুমার চন্দনা ও নাগাভারত ডাকা দুজনেই ইসরোর সাবেক বিজ্ঞানী। এমনকি ইসরোর সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান এস সোমনাথও সম্প্রতি অগ্নিকুল কসমস নামের একটি স্টার্টআপের বোর্ডে যোগ দিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা এই পরিবর্তনকে ভারতীয় মহাকাশ গবেষণার নতুন যুগের সূচনা হিসেবে দেখলেও, ইসরোর মতো জাতীয় প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখতে সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
আরটিভি/এআর