রোববার, ২৬ জুলাই ২০২৬ , ০১:৩৬ পিএম
ইরানের অভ্যন্তরে সরাসরি স্থলসেনা নামিয়ে তাদের অত্যন্ত সুরক্ষিত পারমাণবিক কেন্দ্রগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়ার এবং গচ্ছিত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কবজা করার এক অভূতপূর্ব ও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক পরিকল্পনার ছক কষছে যুক্তরাষ্ট্র। কূটনৈতিক উপায়ে পারমাণবিক সংকট মোকাবিলার পথ পুরোপুরি রুদ্ধ হয়ে পড়ায় পেন্টাগন এখন সামরিক ইতিহাসের অন্যতম বিপজ্জনক এই কৌশল বাস্তবায়নের চিন্তা করছে।
শনিবার (২৫ জুলাই) বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে ওয়াশিংটন পোস্ট ।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের উপকমিশনার জোসেফ রজার্স বলেন, ‘আমি স্বীকার করতে চাই না, তবে ইরানের পারমাণবিক উপাদান অপসারণের সবচেয়ে সম্ভাব্য উপায় হলো একটি সামরিক অভিযান। কারণ, কূটনৈতিক আলোচনা দ্রুত কোনো ফল দিচ্ছে না।’
সামরিক পরিকল্পনার সঙ্গে পরিচিত একটি সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে জানানো হয়, অত্যন্ত জটিল এই অভিযানে হাজারো স্থলসেনা ইরানের কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে প্রবেশ করবে। তাদের বিস্ফোরক ফাঁদ (বুবি ট্র্যাপ) এড়িয়ে এগোতে হবে, ধ্বংসস্তূপ সরাতে নির্মাণকর্মীদের কাজে লাগাতে হবে এবং পুরো এলাকা ঘিরে একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষাবলয় গড়ে তুলতে হবে। এরপর বিশেষ অভিযান বাহিনীর একটি ছোট দল সরাসরি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উদ্ধার করবে।
এনিয়ে জোসেফ রজার্স বলেন, আমার মনে হয় এটি সামরিক ইতিহাসের সবচেয়ে, অথবা অন্যতম সবচেয়ে, জটিল অভিযান হবে। তিনি আরও বলেন, এটি হবে একটি বিরাট লজিস্টিকনির্ভর এবং যুদ্ধপরিস্থিতিতে পরিচালিত কঠিন অভিযান। ইরানের সামরিক সক্ষমতা অনেকটাই ধ্বংস হয়েছে, তবে তারা এখনও ভেনেজুয়েলার ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে পাহারা দেয়া কিউবান বাহিনীর চেয়ে অনেক বেশি সক্ষম।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন স্পেশাল অপারেশন্সের সিল টিম সিক্সের সিলভার স্কোয়াড্রন, দ্বিতীয় রেঞ্জার ব্যাটালিয়ন এবং ২১তম অর্ডন্যান্স কোম্পানি এই অভিযানে অংশ নিতে পারে। মূলত ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ফোরদো ও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ইসফাহান পারমাণবিক কেন্দ্র থেকে ইউরেনিয়াম সরিয়ে নেওয়ার কাজ করবে ২১তম অর্ডন্যান্স কোম্পানি।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে জানায়, ইরানের কাছে ২০ হাজার পাউন্ডেরও বেশি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে।
রজার্স বলেছেন, যেসব স্থাপনা থেকে উপাদান সংগ্রহ করা হবে, সেগুলোর চারপাশে নিরাপদ নিরাপত্তাবলয় গড়ে তুলতে হবে। এর জন্য স্থলবাহিনীকে পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিতে হবে এবং বিমানঘাঁটি পর্যন্ত নিরাপদ কনভয় চলাচলের পথ নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি জানান, মার্কিন সেনাদের ধ্বংস হয়ে যাওয়া প্রবেশপথ খনন করে খুলতে হবে, একই সঙ্গে ইরানের সামরিক বাহিনীর সম্ভাব্য হামলাও প্রতিহত করতে হবে।
ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম মেয়াদে হোয়াইট হাউসের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদে (এনএসসি) ইরানের গণবিধ্বংসী অস্ত্র মোকাবিলাবিষয়ক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা রিচার্ড গোল্ডবার্গ বলেন, প্রশ্ন হলো, আপনি কতক্ষণ এ ধরনের অভিযান চালিয়ে যেতে পারবেন এবং একই সঙ্গে কীভাবে সব সেনাকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনবেন?
তার মতে, এই অভিযানের জন্য এমন একটি আকাশপথ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে, যাতে মার্কিন সামরিক বিমান নিরাপদ স্থানে যাতায়াত করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, এ মুহূর্তে আকস্মিক হামলার কোনো সুযোগ নেই। লক্ষ্যবস্তু কোথায় আছে, আমরা জানি; ইরানও জানে। এর আগে গত মাসে সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্ভাব্য অভিযানের আশঙ্কায় ইরান ইসফাহান স্থাপনার টানেলগুলোতে মাইন ও বিস্ফোরক পেতে রেখেছে।
এদিকে, গত এক মাসে ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র থেকে শত শত সেন্ট্রিফিউজ সরিয়ে নেয়ার খবর প্রকাশের পর পিকঅ্যাক্স মাউন্টেননতুন সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে উঠে এসেছে।
গোল্ডবার্গ বলেন, আমরা জানি না সেখানে কতগুলো সেন্ট্রিফিউজ রয়েছে। সেগুলো খুলে নেওয়া হবে, ধ্বংস করা হবে নাকি বাইরে নিয়ে আসা হবে—এটা নিশ্চিত নয়। তবে যদি পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে বিশেষ অভিযান চালানো হয়, তাহলে সম্ভবত তার কারণ হবে আকাশ হামলায় স্থাপনাটি ধ্বংস করা সম্ভব নয় বলে মনে করা।
তিনি বলেন, শুধু বিমান হামলাই যথেষ্ট হবে কিনা, তা নির্ভর করবে ভবনটির নকশা ও দুর্বল অংশ সম্পর্কে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তথ্যের ওপর।
তার মতে, ফোরদোতে বাঙ্কার-বাস্টার বোমা হামলার সময় যেমন স্থাপনাটির দুর্বল এয়ার শ্যাফটকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল, এখানেও তেমন কৌশল প্রয়োজন হতে পারে।
গোল্ডবার্গ বলেন, এটি হবে ধ্বংসের মিশন। যদি স্থাপনার ভেতরে প্রবেশ করতে হয়, তাহলে উদ্দেশ্য হবে পুরো স্থাপনাটিই ধসিয়ে দেয়া।
তবে ইসফাহান ও ফোরদোর তুলনায় পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে দ্রুত সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করেন তিনি।
তার ভাষায়, পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের অভিযানটি সম্ভাব্যভাবে মাদুরো অভিযানের মতো হতে পারে। কারণ সেখানে গোপনে প্রবেশ করে বিস্ফোরক স্থাপন করা এবং দ্রুত সেখান থেকে বেরিয়ে আসাই হবে মূল কৌশল।
আরটিভি/এআর