বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬ , ০৮:৪৪ পিএম
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাত ২৭তম দিনে গড়িয়েছে। প্রথম আঘাতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে তার পরিবারসহ হত্যার পরও দেশটির ইসলামী শাসনতন্ত্রের অবসান ঘটাতে না পেরে একের পর এক নেতা ও কমান্ডারকে হত্যা করে চলেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। শক্ত জবাব দিয়ে চলেছে তেহরানও। ইসরায়েলের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনাগুলোতে ভয়ংকর সব হামলা চালিয়ে যাচ্ছে দেশটি।
এরই ধারাবাহিকতায় এবার ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) মিলিটারি কন্ট্রোল সেন্টার অব কমান্ড দপ্তর এবং পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরানের সামরিক বাহিনীর অভিজাত শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)।
বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) ইরানি সংবাদমাধ্যম ফার্স নিউজের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে এ তথ্য।
আইডিএফের মিলিটারি সেন্টার অব কমান্ড দপ্তর ইসরায়েলের রাজধানী জেরুজালেমে অবস্থিত। আর পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির অবস্থান মৃত সাগর (ডেড সি)-এর দক্ষিণে। বৃহস্পতিবার ভোরের দিকে এ হামলা পরিচালনা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে আইআরজিসি।
অবশ্য ইসরায়েলের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত এ দাবির বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।
প্রসঙ্গত, ইরানের পরমাণু প্রকল্প এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে গত ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২১ দিন ধরে সংলাপ চলে তেহরান এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে। ২৭ ফেব্রুয়ারি কোনো প্রকার সমঝোতা চুক্তি ছাড়াই শেষ হয় সেই সংলাপ।
পরের দিন ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একই সময়ে ইরানে সামরিক অভিযান ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’ শুরু করে ইসরায়েলও।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এ যৌথ হামলার প্রথম ধাক্কাতেই প্রাণ হারান ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তার পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য। ২৭ দিন ধরে চলমান যুদ্ধে এরই মধ্যে প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলী লারিজানি, সামরিক বাহিনীর অভিজাত শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর শীর্ষ কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপৌরসহ বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে হারিয়েছে ইরান। দেশটির বিভিন্ন সামরিক-বেসামরিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও ধ্বংস কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া, ইরানের ২ হাজারের বেশি মানুষ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন এখন পর্যন্ত।
তবে, পাল্টা জবাব দিচ্ছে ইরানও। যুদ্ধের শুরু থেকেই ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলের ৬ দেশ সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্তর আরব আমিরাত, ওমানে অবস্থিত মার্কিন সেনাঘাঁটি ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে দফায় দফায় ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা শুরু করে ইরান, যা এখনও চলছে। সেইসঙ্গে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়ে বিশ্ববাজারে জ্বালানী তেলের সংকটও তৈরি করে ফেলেছে দেশটি।
এ অবস্থায় ইরানে আরও ভয়ংকর আঘাত হানার পরিকল্পনা আঁটছে যুক্তরাষ্ট্র; ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে স্থল হামলা চালানোর। ইতোমধ্যে এ ব্যাপারে বিস্তারিত পরিকল্পনাও প্রকাশ করেছে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। যুক্তরাষ্ট্রের এমন পরিকল্পনার মুখে এবার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে অবরোধ জারির হুমকি দিয়েছে ইরান।
বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) আইআরজিসি’র এক উচ্চপদস্থ সেনাকমান্ডার ফার্স নিউজকে এ প্রসঙ্গে বলেছেন, শত্রুপক্ষ যদি ইরানের দ্বীপপুঞ্চ বা ইরানের ভূখণ্ডে স্থল অভিযানের পরিকল্পনা নেয়, অথবা পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরে তৎপরতা বৃদ্ধি করে তাহলে বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে নতুন ফ্রন্ট খুলবে আইআরজিসি।
বাব আল-মান্দেব প্রণালিটির অবস্থান ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে। সংকীর্ণ এই জলপথটি একদিকে লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে, অপরদিকে সুয়েজ খালে নৌযানের চলাচল অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণও করে।
জ্বালানি পণ্যের বৈশ্বিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও এই প্রণালি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যে সমুদ্র উপকূলে যেসব তেলখনি আছে, সেসব থেকে উৎপদিত তেলের ১২ শতাংশ বাব আল-মান্দেব দিয়েই পরিবহন করা হয়।
বাব আল-মান্দেবের অবস্থান ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলে হলেও এই প্রণালিতে অবরোধ জারির সক্ষমতা আছে ইরানের। কারণ, ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করে ইরানের সমর্থন ও মদতপুষ্ট সশস্ত্র রাজনৈতিক গোষ্ঠী হুথি বিদ্রোহীরা।
আইআরজিসির ওই কর্মকর্তা ফার্স নিউজকে জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে হুথি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা হয়েছে আইআরজিসির এবং হুথি নেতারা এক্ষেত্রে ইরানকে পূর্ণ সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
আরটিভি/এসএইচএম