বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৬ , ০৫:৩৩ পিএম
তেহরান-ওয়াশিংটন যুদ্ধবিরতি কার্যকরের ২৪ ঘণ্টা পার হওয়ার আগেই লেবাননে ভয়ংকর হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। বুধবারের (৮ এপ্রিল) এ হামলায় দেশটির রাজধানী বৈরুত ও অন্যান্য অঞ্চলে প্রাণ হারিয়েছেন কমপক্ষে ২৫৪ জন। সেইসঙ্গে এখন পর্যন্ত আহত হয়েছেন ১ হাজার ১০০ জনেরও বেশি মানুষ। আরও বাড়তে পারে হতাহতের সংখ্যা।
লেবাননে নারকীয় এ হত্যাযজ্ঞ চালানোর পর চাঞ্চল্যকর এক দাবি করা হয়েছে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে। দেশটির কর্মকর্তারা বলছেন, তারা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসনের সঙ্গে বোঝাপড়া করেই এ হামলা চালিয়েছেন তারা।
টানা ৩৮ দিনের সংঘাতের পর গত মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) ১৫ দিনের অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। এই যুদ্ধবিরতিকে স্থায়ীভাবে যুদ্ধাবসানের দিকে পরিচালনা করা নিয়ে আলোচনা ও চলমান কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেই বুধবার লেবাননজুড়ে একযোগে শতাধিক বিমান হামলা পরিচালনা করে ইসরায়েলি বিমানবাহিনী।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) তাদের এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এ অভিযানে অংশ নিয়েছে ইসরায়েলি বিমান বাহিনীর ৫০টি যুদ্ধবিমান এবং ১০ মিনিটে পুরো লেবাননে ১০০ বারেরও বেশি বোমাবর্ষণ করা হয়েছে।
অধিকাংশ বোমা ফেলা করা হয়েছে লেবাননের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে। ফলে, ধ্বংস ও প্রাণহানির মাত্রা ছিল অনেক বেশি।
এক প্রতিবেদনে বার্তাসংস্থা এএফপি জানিয়েছে, অল্প সময়ের ব্যবধানে এতো হতাহত ও তাদের স্বজনদের সামলাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে বৈরুত ও লেবাননের অন্যান্য শহর-গ্রামের হাসপাতালগুলো। ধ্বংসস্তূপ আটকা পড়াদের উদ্ধারে বেগ পেতে হচ্ছে উদ্ধারকারী বাহিনীর সদস্যদেরও।
ইরানের সমর্থন ও মদতপুষ্ট বিশ্বের বৃহত্তম সশস্ত্র ইসলামি গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। লেবাননভিত্তিক এই গোষ্ঠীটির প্রতিষ্ঠা গত শতকের আশির দশকে এবং জন্মলগ্ন থেকেই হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের চরম শত্রু।
হিজবুল্লাহকে পুরোপুরি দমন করতে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে লেবাননে সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। পরে ২০২৫ সালের অক্টোবরে মাসে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে লেবাননের সরকারের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তি করেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি হঠাৎ ইরানে হামলা করে বসে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী। প্রথম ধাক্কাতেই নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখায় ইরানও। এই যুদ্ধ শুরুর তিনদিনের মাথায় অর্থাৎ ২ মার্চ থেকে যুদ্ধবিরতি ভেঙে লেবাননেও অভিযান শুরু করে ইসরায়েলি বিমান বাহিনী। পরে মার্চের মাঝামাঝি বিমান অভিযানের সঙ্গে যুক্ত হয় স্থল অভিযানও।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি আলোচনায় লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করতে চাইছে ইরান। এ অবস্থায় বুধবার লেবাননে যে হত্যাযজ্ঞ চালালো ইসরায়েল, তাতে চরম ক্ষুব্ধ হয়েছে তেহরান। লেবাননে হামলা অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার হুমকিও দিয়েছে তারা।
সেইসঙ্গে ইসরায়েলি এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা রেডক্রস সোসাইটি। ঘনবসতিপূর্ণ বৈরুতসহ লেবাননের আবাসিক এলাকাগুলোতে পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই ভারী বিস্ফোরক ব্যবহারের জন্য ইসরায়েলের কড়া সমালোচনা করেছে তারা। এই হামলাকে বেসামরিক জনগণের ওপর ‘গণহত্যা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে সংস্থাটি।
এছাড়া, জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার টার্ক-এর মতে, লেবাননে হত্যাকাণ্ড ও ধ্বংসযজ্ঞের মাত্রা সত্যিই ভয়াবহ। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এমন রক্তপাত বিশ্বাস করা কঠিন। এটি শান্তি প্রক্রিয়ার ওপর বিরাট চাপ সৃষ্টি করছে, যা সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
একইসঙ্গে সতর্ক করে তিনি বলেন, এই ধরনের হামলার ব্যাপকতা এবং ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের কিছু বক্তব্য ( দক্ষিণ লেবাননের অংশ দখল বা সংযুক্ত করার ইঙ্গিত রয়েছে) গভীর উদ্বেগজনক।
আরটিভি/এসএইচএম