images

মধ্যপ্রাচ্য

মধ্যপ্রাচ্যে ফের যুদ্ধের দামামা, শান্তি আলোচনা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা

শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬ , ১০:৩৮ পিএম

টানা ৩৮ দিনের সংঘাতের পর যে সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে, তার মেয়াদ ফুরিয়ে আসছে দ্রুত। এর মধ্যে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় বিবাদমান দুই পক্ষ এক দফা স্থায়ী যুদ্ধবিরতি টানার লক্ষ্যে আলোচনার টেবিলে বসলেও ভেস্তে গেছে তা। ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে নিজেদের শর্ত মেনে নিতে এখন নানাভাবে চাপ দিয়ে যাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সাময়িক যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার আগে ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফেরাতে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে পাকিস্তান ও মিসরও। 

মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির লক্ষ্যে সবশেষ গতকাল একটু নমনীয় হলেও যুক্তরাষ্ট্রের একের পর এক উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডে আবারও বেঁকে বসেছে তেহরান। ফলে, অনেকটা নিশ্চিতিভাবেই আবারও যুদ্ধের দামামা বেজে উঠতে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে।   

শনিবার (১৮ এপ্রিল) রয়টার্স, আল জাজিরা, মিডল ইস্ট মনিটরসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন বিশ্লেষণে পাওয়া গেছে এমন ইঙ্গিত। 

সাময়িক যুদ্ধবিরতির মধ্যে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত শান্তি আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর থেকেই ইরানকে বিভিন্ন হুমকি-ধমকি ও চাপ দিয়ে যাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এরই অংশ হিসেবে হরমুজ প্রাণালিতে অবরোধ জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। সেইসঙ্গে লেবাননে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে যুক্তরাষ্ট্রের ছত্রছায়ায় লাগাতার হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। 

এদিকে আবারও শান্তি আলোচনার পথে পা বাড়ানোর ইঙ্গিত হিসেবে গতকাল শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ খুলে দেওয়ার ঘোষণা দেয় ইরান। কিন্তু, এরপরও ইরানের বন্দরগুলোতে নিজেদের অবরোধ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প; সেইসঙ্গে দেন ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিজের কব্জায় নেওয়ার হুমকিও। ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ইরান ‘সবকিছুতে রাজি’ হয়েছে। এর মধ্যে দেশটির সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে যৌথভাবে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ও রয়েছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরানের ইউরেনিয়াম নিজের দখলে নিয়ে কোনো সেনার প্রয়োজন হবে না তার। চুক্তির মাধ্যমেই ইরানে গিয়ে তাদের ইউরেনিয়াম নিয়ে নেওয়া হবে। 

মূলত, ট্রাম্পের এমন কর্মকাণ্ডই তাঁতিয়ে তুলেছে তেহরানকে; তৈরি হয়েছে চরম অবিশ্বাস। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২৪ ঘণ্টা না পেরোতেই আবারও হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। দেশটির সামরিক বাহিনীর অপারেশনাল কমান্ড ‘খাতাম আল-আম্বিয়া’ এক বিবৃতিতে মার্কিন অবরোধকে ‘জলদস্যুতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছে, ‘মার্কিন জলদস্যুতার কারণেই হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। এখন থেকে এই কৌশলগত নৌপথটি সশস্ত্র বাহিনীর কঠোর ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণে থাকবে।’

ইরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে, যতক্ষণ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরমুখী এবং ইরান থেকে ছেড়ে যাওয়া জাহাজগুলোর চলাচলের পূর্ণ স্বাধীনতা ফিরিয়ে না দেবে, ততক্ষণ এ কড়াকড়ি বজায় থাকবে।

আরও পড়ুন
moztaba-khamenie

হরমুজ বন্ধের পর এবার শত্রুপক্ষকে ভয়ংকর বার্তা মোজতবা খামেনির

এ পদক্ষেপের পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে ভয়ংকর এক বার্তা দিয়েছেন ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি। শনিবার নিজের টেলিগ্রাম চ্যানেলে দেওয়া বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, ইরানের ‌নৌবাহিনী শত্রুদের নতুন পরাজয়ের তিক্ত স্বাদ আস্বাদন করানোর জন্য প্রস্তুত রয়েছে।

ইরানের সেনাবাহিনী প্রতিষ্ঠার বার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে দেওয়া বার্তায় যুদ্ধের সময় ওই অঞ্চলে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ লক্ষ্য করে চালানো ড্রোন হামলার প্রশংসা করেন তিনি।

মোজতবা খামেনি বলেন, ইরানের সেনাবাহিনী শত্রুদের দুর্বলতা ও অপমানিত হওয়ার বিষয়টি বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচন করেছে। ইরানি ড্রোন মার্কিন ও জায়নবাদী অপরাধীদের ওপর বজ্রপাতের মতো আঘাত করেছে।

এদিকে হরমুজে নতুন করে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও সেনা মোতায়েনের খবরও পাওয়া গেছে ইতোমধ্যে। শনিবার এক সাক্ষাৎকারেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, আলোচনা এগোলেও ইরান কিছুটা ‘চালাকি’ করার চেষ্টা করছে। কিন্তু, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কঠোর।

ইরানের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুমকির দিকে ইঙ্গিত করে এরপর ট্রাম্প বলেন, ‘তারা আবারও প্রণালিটি বন্ধ করে দিতে চেয়েছিল, যা তারা বছরের পর বছর ধরে করে আসছে। কিন্তু আমাদের ব্ল্যাকমেইল করা যাবে না।’ 

সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচোনায় আগামী ৫ দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শান্তি আলোচোনায় বসার সম্ভাবনা অনেকটাই ক্ষীণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইরানি অধ্যাপক মোস্তফা খোশচেশম বলেন, ইরান কোনো ধরনের চুক্তির জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ‘নির্ভরযোগ্য অংশীদার’ হিসেবে বিবেচনা করতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্র যতদিন তার বিশ্বাসঘাতকতামূলক আচরণ বজায় রাখবে, ইরান ততদিন ‘যুদ্ধ চালিয়ে যাবে’।

তেহরানের বর্তমান পরিস্থিতি ও জনমানস সম্পর্কে খোশচেশম বলেন, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী এখন ‘পুরোপুরি প্রস্তুত’। একইসঙ্গে সাধারণ মানুষও প্রতিরোধের পক্ষে। লাখ লাখ মানুষ প্রতি রাতে রাজপথে নেমে এসে এই ‘প্রতিরোধ’ জারি রাখার দাবি জানাচ্ছে।

আল–জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই অধ্যাপক আরও বলেন, ‘ইরান বিশ্বাস করে যে তারা বর্তমানে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের মুখোমুখি লড়াইয়ের ক্ষেত্রে তারা এই শ্রেষ্ঠত্ব বা আধিপত্য প্রমাণ করতে চায়।’

অবশ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি চুক্তির জন্য খুব জোরালোভাবে কাজ করছে মিসর ও পাকিস্তান। মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তি করার জন্য মিসর ও পাকিস্তান ‘খুব জোরালোভাবে’ কাজ করছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করি, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই এটি করতে পারব। শুধু আমাদের অঞ্চলেই নয় বরং পুরো বিশ্বই এই যুদ্ধের কারণে ভুগছে।’

এছাড়া, পাকিস্তান সরকারের কয়েকটি সূত্রের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদল সম্ভবত আগামী সোমবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে দ্বিতীয় দফার কারিগরি পর্যায়ের আলোচনায় বসতে যাচ্ছে। তাদের লক্ষ্য হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সপ্তাহব্যাপী চলা সংঘাতের একটি স্থায়ী সমাধান চূড়ান্ত করা, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও মধ্যপ্রাচ্যের জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।

সূত্রগুলো আরও জানায়, ১১–১২ এপ্রিল ইসলামাবাদে প্রথম দফার বৈঠকের পর থেকেই বিবদমান দুই পক্ষ ইসলামাবাদের মাধ্যমে একে অপরের কাছে বার্তা পাঠাচ্ছে। বহুল প্রতীক্ষিত এই আলোচনার পরবর্তী ধাপ শুরু হওয়ার আগেই তারা একটি ‘সর্বোচ্চ বোঝাপড়ায়’ পৌঁছাতে চাইছে।

তবে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিতীয় দফা আলোচনার বিষয়ে ইরান এখনো রাজি হয়নি বলে জানিয়েছে দেশটির আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম।

তাসনিমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান মনে করে, মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদানের সময় যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত দাবি উত্থাপন করেছে। ইরান সেই দাবিগুলো বাদ দেওয়াকে আলোচনার শর্তগুলির একটি হিসেবে উল্লেখ করেছে।

সেইসঙ্গে তেহরান এটাও স্পষ্ট করেছে যে তারা দীর্ঘ এবং ফলহীন আলোচনা করে সময় নষ্ট করতে চায় না।

আরটিভি/এসএইচএম