বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬ , ০২:৪৬ পিএম
ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে ফিলিস্তিনের গাজা। কাগজে-কলমে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকা সত্ত্বেও থামেনি ফিলিস্তিনি নিধন। চলমান এই গণহাত্যায় এখন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে শিশুদের টার্গেট করছে ইসরায়েলি বাহিনী।
সম্প্রতি জাতিসংঘের একটি স্বাধীন অনুসন্ধান কমিশনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ভয়াবহ এই তথ্য।
গত মঙ্গলবার (২৩ জুন) প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের কারণে নজিরবিহীন মৃত্যু, আঘাত ও মানসিক ট্রমার মুখোমুখি হচ্ছে ফিলিস্তিনি শিশুরা।
কমিশনের মতে, ফিলিস্তিনিদের জাতিগতভাবে নিশ্চিহ্ন করার জন্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এখন শিশুদের নিশানায় পরিণত করেছে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ। এমনকি গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও এই ধারা অব্যাহত রয়েছে।
অনুসন্ধান কমিশনের চেয়ারম্যান শ্রীনিবাসন মুরলিধর বলেন, ২০২৫ সালের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পরেও গাজায় শিশুরা নিহত ও গুরুতর আহত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ফিলিস্তিনি শিশুদের সুরক্ষার বাধ্যবাধকতা এবং যুদ্ধবিরতিকে ক্রমাগত উপেক্ষা করছে ইসরায়েল।
প্রতিবেদনে যুদ্ধবিরতির পর গাজায় ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া পরিস্থিতির বিশদ বিবরণ দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ব্যাপক হামলা এবং মানবিক ও চিকিৎসা সহায়তা আটকে দেওয়ার ফলে ফিলিস্তিনি শিশুদের জীবন, স্বাস্থ্য ও বিকাশ; সর্বোপরি অস্তিত্ব ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে।
হাসপাতাল, স্বাস্থ্য ক্লিনিক ও প্রজনন কেন্দ্রগুলোতে ইসরায়েলি হামলার একটি নিয়মতান্ত্রিক চিত্র নথিবদ্ধ করেছে জাতিসংঘের কমিশন।
যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে গত অক্টোবরের যুদ্ধবিরতি দুই বছরের যুদ্ধের অবসান ঘটিয়েছিল গাজায়। তবে, প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শত্রুতা পুরোপুরি শেষ হয়নি, কেবল কিছুটা কমেছে।
যুদ্ধবিরতির আট মাস পরেও প্রায় প্রতিদিনই গাজায় বিমান হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, সবশেষ এই ৮ মাস ২৫০ জনেরও বেশি শিশুসহ এক হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায়।
শুধু গাজাই নয়; অধিকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমেও ফিলিস্তিনিদের ওপর বর্বরতা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ। পশ্চিম তীরে শিশুদের নিয়ন্ত্রণ, প্রতিরোধ এবং সম্মিলিতভাবে ভয় দেখানোর হাতিয়ার হিসেবে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে।
ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা বি’তসেলেম-এর তথ্য অনুসারে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে পশ্চিম তীরে ২৩৬ জন ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে। গাজা ও পশ্চিম তীর উভয় অঞ্চলেই শিশুদের ব্যাপকভাবে নির্বিচারে গ্রেপ্তার ও আটক করার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া, গাজার অনেক শিশুর খোঁজ এখনও মেলেনি।
উল্লেখ্য, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনার অধীনে গাজায় একটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করার কথা ছিল। সেখান থেকে ধীরে ধীরে সেনা প্রত্যাহারের কথা ছিল ইসরায়েলের। কিন্তু, ইসরায়েল উল্টো তাদের আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে গাজার ৭০ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে ইসরায়েলি বাহিনী।
যুদ্ধবিরতির পর প্রথমে মানচিত্রে একটি সাময়িক ‘হলুদ রেখা’ দিয়ে দখলে থাকা এলাকা চিহ্নিত করেছিল ইসরায়েল। কিন্তু সেই রেখা ধীরে ধীরে পশ্চিম দিকে সরে গেছে। এর ফলে, গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অবস্থান আরও বিস্তৃত হয়েছে এবং ফিলিস্তিনিরা আরও ছোট জায়গায় সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের মতে, এই রেখা অতিক্রম করা বাসিন্দাদের জন্য নিষিদ্ধ। রেখার কাছাকাছি আসার কারণে শত শত মানুষকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এখন আগের হলুদ রেখা ছাড়িয়ে নতুন জমি দখলের জন্য একটি ‘কমলা রেখা’ চিহ্নিত করা হয়েছে। এই রেখা ক্রমাগত পরিবর্তনের কারণে ফিলিস্তিনিদের জন্য, বিশেষ করে শিশুদের পক্ষে বোঝা কঠিন হয়ে পড়েছে যে এটি কোথায় শুরু আর কোথায় শেষ।
আরটিভি/এসএইচএম