images

মধ্যপ্রাচ্য

ইরানে শিগগিরই ভয়ংকর ২০ যুদ্ধবিমান পাঠাতে যাচ্ছে রাশিয়া

রোববার, ০৫ জুলাই ২০২৬ , ০৯:১১ পিএম

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই ইরানের জন্য ২০টি অত্যাধুনিক সু-৩৫ (সুখোই-৩৫) যুদ্ধবিমান পাঠাতে যাচ্ছে রাশিয়া। এই ২০ যুদ্ধবিমানের প্রথম ব্যাচের উৎপাদন শেষও হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। চলতি বছরেই বাকি বিমানগুলো তৈরির কাজও সম্পন্ন করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তেহরানের বিমানবাহিনীকে আধুনিকায়নের দীর্ঘ প্রচেষ্টায় একটি বড় ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে এটিকে।

প্রতিরক্ষা বিষয়ক আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘মিলিটারনি ওয়াচ ম্যাগাজিন’-এর তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিমানগুলো রাশিয়ার কোমসোমলস্ক-অন-আমুর অ্যাভিয়েশন প্ল্যান্টে তৈরি করা হয়েছে। ইরানের কাছে চূড়ান্তভাবে হস্তান্তরের আগে বিমানগুলো বর্তমানে রাশিয়ায় অবস্থান করছে এবং এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করছে ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।

প্রায় ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার (১,০০০ মাইল) কমব্যাট রেডিয়াসের (যুদ্ধসীমা) সুখোই-৩৫ যুদ্ধবিমানের ন্যাটো প্রদত্ত সাংকেতিক নাম– ফ্ল্যাঙ্কার-এম বা ‘সুপার ফ্ল্যাঙ্কার’। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে শত্রু ভূখণ্ডের অনেক গভীরে ঢুকে নিখুঁত আঘাত হানতে সক্ষম এই ফাইটার জেট। এছাড়া সংক্ষিপ্ত বা অস্থায়ী রানওয়ে থেকে উড্ডয়ন ও অবতরণের বিশেষ ক্ষমতার কারণে এটি বড় কোনো বিমানঘাঁটি থেকে পরিচালনার ওপর পুরোপুরি নির্ভর করে না, যা যুদ্ধের ময়দানে শত্রুর পক্ষে এটিকে নিষ্ক্রিয় করা অত্যন্ত কঠিন করে তোলে।

যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান ও সমরাস্ত্র উৎপাদক লকহিড মার্টিনের তৈরি পঞ্চম প্রজন্মের এফ-৩৫ কিংবা চীনের তৈরি শেনিয়াং জে-১৬-এর মতো আধুনিক যুদ্ধবিমানের চেয়ে কিছুটা কম অত্যাধুনিক হলেও, যুদ্ধক্ষেত্রে সুখোই-৩৫ এখনও বিশ্বের অন্যতম সফল ও পরীক্ষিত (ব্যাটল-টেস্টেড) ফাইটার জেট। 

‘মিলিটারনি ওয়াচ ম্যাগাজিন’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন প্রযুক্তির আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা সংযোজনের মাধ্যমে এই বিমানটিকে এখন আরও উন্নত করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন
border

বাংলাদেশের সীমান্ত ঘেঁষে ৬ থানা ও আউটপোস্ট চায় ভারতের পুলিশ

ঐতিহাসিকভাবে রাশিয়া প্রতি বছর গড়ে মাত্র ১৪টির মতো সু-৩৫ যুদ্ধবিমান তৈরি করে থাকে, যা তাদের চাহিদার তুলনায় বেশ ধীরগতির। তবে, রুশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে এই উৎপাদন সক্ষমতা আরও বাড়ানো হচ্ছে।

২০২৫ সালের মে মাসে রাশিয়ার ইউনাইটেড এয়ারক্রাফট কর্পোরেশনের (ইউএসি) মহাপরিচালক ভাদিম বাদেখা নিশ্চিত করেছিলেন যে, বিমানের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য সব ধরনের প্রচেষ্টা চলছে। তবে ইরানের ক্রয়াদেশকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কারণে, এই উৎপাদন বৃদ্ধির ফলেও আগামী দুই থেকে তিন বছর রাশিয়ার নিজস্ব বিমানবাহিনীর জন্য নতুন সুখোই-৩৫ সরবরাহের পরিমাণ কিছুটা কমে যেতে পারে বলে সামরিক বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন।

২০২৫ সালের শেষদিকে ফাঁস হওয়া রাশিয়ার সরকারি নথিপত্র থেকে ইঙ্গিত মেলে, ইরান রাশিয়ার কাছে মোট ৪৮টি সুখোই-৩৫ যুদ্ধবিমানের অর্ডার দিয়েছে। এর মাধ্যমে ইরানি কর্মকর্তাদের আগের একটি অস্পষ্ট বিবৃতির সত্যতা নিশ্চিত হয়, যেখানে তারা সুনির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ না করে রাশিয়া থেকে বড় ধরনের যুদ্ধবিমান কেনার চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন।

মূলত, ২০২৩ সালে রাশিয়ার সাথে একটি বড় ধরনের প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে ইরান। ১৯৯০-এর দশকের পর এটিই ছিল ইরানের প্রথম আধুনিক ফাইটার জেট কেনা সংক্রান্ত চুক্তি, যার মধ্যে সুখোই-৩৫ ফাইটার ছাড়াও মিল মি-২৮ অ্যাটাক হেলিকপ্টার এবং ইয়াকোভলেভ ইয়াক-১৩০ জেট ট্রেইনার অন্তর্ভুক্ত ছিল।

তবে, আন্তর্জাতিক বাজারে সুখোই-৩৫ নিয়ে অন্যান্য দেশের আগ্রহ বেশ সীমিত। এর প্রধান কারণ হলো বিমানটির কিছুটা সেকেলে বা প্রাচীন অ্যাভিওনিক্স ব্যবস্থা, এবং এটি কিনলে মার্কিন বা পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ার আশঙ্কায় অনেক সম্ভাব্য ক্রেতাই এটি কিনতে আগ্রহ দেখায়নি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান ইতোমধ্যে তাদের বিমানবাহিনীতে যুক্ত হতে যাওয়া এই নতুন যুদ্ধবিমান বহরের জন্য পাইলটদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করেছে। এর আগে, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ইরানের কাছে রাশিয়ার তৈরি ইয়াকোভলেভ ইয়াক-১৩০ ট্রেইনার বিমান সরবরাহ শুরু হয়, যা মূলত ভবিষ্যতে সুখোই-৩৫ পরিচালনার জন্য পাইলটদের একটি ব্যাপক ও উন্নত প্রশিক্ষণ কর্মসূচির অংশ হিসেবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানে সুখোই-৩৫ সরবরাহ চলতি ২০২৬ সালেই শুরু হতে পারে। তবে, কিছু আন্তর্জাতিক সূত্রের দাবি, ইরানের হামাদান বিমানঘাঁটির সাম্প্রতিক অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির কারণে, এই যুদ্ধবিমান মোতায়েন প্রক্রিয়া কিছুটা বিলম্বিত হচ্ছে। খবর পাওয়া গেছে যে, রুশ ও ইরানি ইঞ্জিনিয়ারিং দলগুলো বর্তমানে ঘাঁটিটি দ্রুত সংস্কারের জন্য কাজ করছে এবং মূল যুদ্ধবিমানগুলো পৌঁছানোর আগেই উন্নতমানের ফ্লাইট সিম্যুলেটর সেখানে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

রাশিয়ার কাছ থেকে ইরানের সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ের এই প্রক্রিয়া কেবল সুখোই-৩৫ কর্মসূচির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। রুশ সামরিক সূত্রগুলো গত জুন মাসে জানিয়েছে, তেহরান রাশিয়ার কাছে আরও ১২টি সুখোই-৩০এসএম২ ফাইটারের অর্ডার দিয়েছে। রুশ বিমানবাহিনীর সক্রিয় সামরিক ইউনিটগুলো থেকে বিমান স্থানান্তরের মাধ্যমে ২০২৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে এই সরবরাহ শুরু হতে পারে।

সুখোই সু-৩০এসএম২ মূলত সুখোই সুখোই-৩৫-এর চেয়ে কিছুটা কম জটিল একটি সংস্করণ। এটি তুলনামূলক সস্তা এবং রক্ষণাবেক্ষণ করা সহজ হলেও—আক্রমণাত্মক মিশন এবং নতুন পাইলটদের অ্যাডভান্সড প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর বলে বিবেচিত হয়।

এছাড়া, ইরান রাশিয়ার পঞ্চম প্রজন্মের অত্যাধুনিক স্টিলথ ফাইটার সুখোই সু-৫৭ ক্রয়ের চেষ্টাও করতে পারে বলেও গুঞ্জন রয়েছে। তবে, রাশিয়ার নিজস্ব উৎপাদন জটের কারণে এই সুপার-স্টিলথ বিমানের সরবরাহ ২০৩০ সালের আগে ইরানের হাতে পৌঁছানো সম্ভব নাও হতে পারে।

স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ইরানের প্রথম কোনো অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান অর্জন করার এই বিষয়টি মধ্যপ্রাচ্যের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, ইরানকে এখনও স্নায়ুযুদ্ধ আমলের পুরোনো মার্কিন ও পশ্চিমা বিমানবহরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যার মধ্যে গ্রুম্যান এফ-১৪এ টমক্যাট, ম্যাকডোনেল ডগলাস এফ-৪ডি/ই ফ্যান্টম ২ এবং নর্থরপ এফ-৫ই/এফ টাইগার ২-এর মতো বিমান রয়েছে।

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের আগে কেনা পশ্চিমা প্রযুক্তির এই জরাজীর্ণ বিমানের ওপরই ইরানের বিমানবাহিনী দীর্ঘকাল ধরে নির্ভর করে আসছে, যার অনেকগুলো আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে রক্ষণাবেক্ষণ করা এখন দিন দিন অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এর আগে, সর্বশেষ ১৯৯০-এর দশকে রাশিয়ার কাছ থেকে মিকোয়ান মিগ-২৯ বিমান কেনার পর বড় কোনো ফাইটার বহর যুক্ত করতে পারেনি তেহরান।

যদিও ইরান গত কয়েক দশকে নিজস্ব প্রযুক্তিতে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের অন্যতম শক্তিশালী ও বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনের ভাণ্ডার গড়ে তুলেছে, তবে দেশীয় বিমান বা এভিয়েশন সক্ষমতার দিক থেকে তারা প্রতিবেশীদের তুলনায় এখনও অনেক পিছিয়ে রয়েছে।

প্রযুক্তির দিক থেকে পুরোনো হওয়া সত্ত্বেও, যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের সাথে সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় ইরানি বিমানগুলো সফলভাবে বেশ কিছু আকাশ প্রতিরক্ষা ও আক্রমণাত্মক মিশন পরিচালনা করতে সক্ষম হয়। এমনকি ইসরায়েলি বা মার্কিন হামলা থেকে নিজেদের অনেকাংশেই রক্ষা করতে পেরেছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার এই সুখোই সু-৩৫ যুদ্ধবিমানের চূড়ান্ত অন্তর্ভুক্তি ইরানের বিমানবাহিনীকে রাতারাতি উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী করবে এবং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে দূরপাল্লার আকাশ অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে তেহরানের কৌশলগত সক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

আরটিভি/এসএইচএম