সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬ , ০৯:২৭ পিএম
ইসরায়েলের সঙ্গে গোপন আঁতাতের প্রমাণ মিলেছে ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমেদিনেজাদের বিরুদ্ধে। এর জেরে এখন তাকে গৃহবন্দি করে রেখেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)।
এরই মধ্যে ইরানের ইসলামী শাসনব্যবস্থার পতনের জন্য মাহমুদ আহমেদিনেজাদকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের ভয়ংকর পরিকল্পনার বিস্তারিত প্রকাশ্যে এনেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস।
সোমবার (১৩ জুলাই) প্রকাশিত ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, বছরের পর বছর ধরে আহমেদিনেজাদকে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার চেষ্টা চালিয়েছে ইসরায়েল। এমনকি তার শাসনামলের পর তাকে ইরানপন্থি নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনাও করেছে।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ২০২৪ সালের শুরুর দিকে একটি অস্বাভাবিক ঘটনা নজরে আসে। হাঙ্গেরীর রাজধানী বুদাপেস্টের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর অধ্যাপক গেরগেলি ডেলি হাঙ্গেরি সরকারের এক শীর্ষ কর্মকর্তার কাছ থেকে অদ্ভুত অনুরোধ পান। ওই কর্মকর্তা লুদোভিকা ইউনিভার্সিটি অব পাবলিক সার্ভিসের রেক্টর অধ্যাপক ডেলিকে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক একটি সম্মেলন আয়োজন এবং সেখানে একজন অপ্রত্যাশিত অতিথিকে আমন্ত্রণ জানানোর আহ্বান জানান। সেই অতিথি আর কেউ নন; তিনি হলেন ইরানের বহুল বিতর্কিত ও নিন্দিত সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমেদিনেজাদ।
তবে এর পেছনের কারণ ছিল আরও চমকপ্রদ। ওই কর্মকর্তা ডেলিকে বলেন, এই সম্মেলন আসলে একটি ছদ্মবেশ বা ‘ফ্রন্ট’ মাত্র। এর মূল উদ্দেশ্য, হাঙ্গেরির রাজধানীতে আহমেদিনেজাদের সঙ্গে তার কট্টর শত্রু ইসরায়েলের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের গোপন বৈঠকের ব্যবস্থা করা।
অধ্যাপক ডেলি জানতেন এই আমন্ত্রণ তার নিজের এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষুণ্ন করতে পারে। কিন্তু এক সাক্ষাৎকারে ডেলি বলেছেন, তিনি বিশ্বাস করেছিলেন, এর মাধ্যমে হয়তো তিনি মানুষের জীবন বাঁচানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছেন।
ডেলি বলেন, যখন দুটি শত্রু পক্ষ নিজেদের মধ্যে কথা বলতে চায়, তখন তাদের সেই সুযোগ করে দেওয়ার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করাই শ্রেয়। এই অভিযানের সংবেদনশীল তথ্যের বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে মার্কিন এবং ইরানি কর্মকর্তারা বলেছেন, ২০২৪ সালে আহমেদিনেজাদের ওই বিশ্ববিদ্যালয় সফর এবং এর পরের বছর দ্বিতীয় দফা সফরে যাওয়াটা ছিল ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ।
ইসরায়েল মূলত আহমেদিনেজাদকে গোয়েন্দা সম্পদ বা ‘এজেন্ট’ হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিল; যাতে সময় সুযোগ বুঝে তাকে ইরানের নতুন নেতা হিসেবে ক্ষমতায় বসানো যায়।
আহমেদিনেজাদকে ঘিরে ইসরায়েলের এই শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের পরিকল্পনা সত্যিই এক অবিশ্বাস্য ঘটনা। কারণ, এই আহমেদিনেজাদই তার শাসনামলে ইরানের পরমাণু কর্মসূচির গতি ত্বরান্বিত, নিয়মিত ইসরায়েলকে ধ্বংস করার হুমকি এবং ইহুদি নিধনযজ্ঞ বা ‘হলোকোস্ট’ অস্বীকার করেছিলেন।
মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গোপনে আহমেদিনেজাদের আবাসন ও ভ্রমণ খরচের জন্য অর্থ প্রদান করেছিল ইসরায়েল। এমনকি বুদাপেস্ট সফরসহ কয়েকবার বিদেশে ইসরায়েলি এজেন্টরা তার সঙ্গে বৈঠকও করেছিলেন।
এই গোপন প্রচেষ্টা চূড়ান্ত রূপ নেয় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে, যখন ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। তেহরানে কঠোর নজরদারিতে থাকা এই সাবেক নেতাকে সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য এক দুঃসাহসিক অভিযান পরিচালিত হয়। বর্তমান সরকারকে উৎখাত করে আহমেদিনেজাদকে ক্ষমতায় বসানোর পরিকল্পনা কার্যকর করাই ছিল ওই অভিযানের মূল লক্ষ্য। কিন্তু সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।
২৮ ফেব্রুয়ারি আহমাদিনেজাদের বাসভবনে আঘাত হানে ইসরায়েলি বিমান। এই হামলার নিশানায় ছিল তার দেহরক্ষীদের ভবন এবং সাঁজোয়া গাড়ি। ইরানের চারজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেছেন, হামলার পরপরই একটি কালো পিউজো গাড়ি এসে সেই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্য থেকে আহমেদিনেজাদকে দ্রুত উদ্ধার করে নিয়ে যায়।
অভিযানের বিষয়ে অবগত মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তারা বলেছেন, গাড়িটি চালাচ্ছিলেন মোসাদের এজেন্টরা; যারা আহমেদিনেজাদকে ইরানের ভেতরেই একটি সেফ হাউসে নিয়ে যান।
তবে এই ঘটনার বিষয়ে অবগত ব্যক্তিরা বলেছেন, আকস্মিক ও হুলস্থুল উদ্ধার অভিযান নিয়ে আহমেদিনেজাদ বেশ বিরক্ত হয়েছিলেন এবং ইসরায়েলের সহায়তায় পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার পরিকল্পনা নিয়ে তার মোহভঙ্গ ঘটে।
পরবর্তীতে এক রহস্যময় পরিস্থিতিতে সেই সেফ হাউস ত্যাগ করেন তিনি। এরপর থেকে গত সোমবারের আগ পর্যন্ত তাকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি। সোমবার ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজায় সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য দেখা যায় আহমেদিনেজাদকে।
অবশ্য, তেহরানের সরকারকে উৎখাত করার এই পরিকল্পনা নিয়ে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে কোনও মন্তব্য করেননি। এই পরিকল্পনার আরেকটি অংশ ছিল উত্তর ইরাকে অবস্থানরত ইরানি কুর্দি-বিরোধী বাহিনীকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দেওয়া; যাতে তারা পশ্চিম ইরানে প্রবেশ করে এলাকা দখল এবং একপর্যায়ে রাজধানী তেহরানের দিকে অগ্রসর হতে পারে। তবে, সেই প্রচেষ্টা কখনোই বাস্তবায়িত হয়নি।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসে আহমেদিনেজাদের এই ভূমিকার কথা প্রথম ফাঁসের পর গত মে মাসে পিবিএসে টক শো ‘ফায়ারিং লাইনে’ ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাবেক গোয়েন্দা প্রধান তামির হ্যায়ম্যান বলেছিলেন, এই সরকার পরিবর্তনের পরিকল্পনায় বেশ কিছু অনন্য বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয় এবং আহমেদিনেজাদ সেই প্রক্রিয়ারই অংশ ছিলেন।
যেভাবে বদলে গেলেন আহমেদিনেজাদ
২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে আহমেদিনেজাদ ছিলেন দেশটির সবচেয়ে কট্টরপন্থী রাজনীতিবিদ। ইসরায়েলকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার কথা বলতেন তিনি এবং তার শাসনামলে ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি পুনরায় শুরু করে; যা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সন্দেহ বাড়িয়ে দিয়েছিল। ২০০৯ সালে ইরানের নির্বাচনে তার পুনরায় অংশগ্রহণের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী গড়ে ওঠা আন্দোলন কঠোর হস্তে দমন করেছিলেন আহমেদিনেজাদ। এছাড়া, তার শাসনামলে ভিন্নমতাবলম্বী ও বিরোধীদের গণফাঁসি ও বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়ার পর পরবর্তী বছরগুলোতে আহমেদিনেজাদ তার কট্টর দৃষ্টিভঙ্গি বদলে ফেলেন এবং ইসরায়েল-বিরোধী বক্তব্য দেওয়াও বন্ধ করে দেন। নিজেকে একজন উদারপন্থী হিসেবে প্রমাণ করতে মরিয়া হয়ে ওঠেন তিনি। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে ইরানের পপ মিউজিক সংস্কৃতির প্রশংসা, বিক্ষোভকারীদের ওপর নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমনের সমালোচনা এবং শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন এ নেতা।
শুধু তাই নয়, আহমেদিনেজাদ এক পর্যায়ে নিজের চিরচেনা ঢিলেঢালা খাকি উইন্ডব্রেকার পোশাক ছেড়ে দর্জির কাছে বানানো আধুনিক স্যুট পরা শুরু করেন। অগোছালো দাড়ি ছেঁটে পরিপাটি হয়ে যান, বোটক্স চিকিৎসা নেন এবং ইংরেজি শিখতে শুরু করেন।
তেহরানে নিজের কার্যালয়ে প্রতিদিন সকালে সাধারণ মানুষের অভিযোগ শোনার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা বৈঠক, সরকারি ঋণের জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে সুপারিশপত্র লেখেন তিনি। নিয়মিত দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গিয়ে শহরের ও গ্রামীণ অঞ্চলের সমর্থকদের সঙ্গে দেখাও করেন।
ইরান সরকারের সঙ্গে আহমেদিনেজাদের সম্পর্ক ছিল বেশ জটিল। শীর্ষ নেতারা তার ওপর নানা বিধিনিষেধ আরোপ করলেও সর্বোচ্চ নেতাকে পরামর্শ দেওয়া উচ্চপর্যায়ের কাউন্সিলে তাকে একটি আসন দেওয়া হয়েছিল। যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিন আগে, ফেব্রুয়ারিতেও তিনি কাউন্সিলের বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন।
ইরানের অনেকেই আহমেদিনেজাদের এই পরিবর্তনকে রাজনৈতিক চাতুর্য হিসেবে দেখেছিলেন; যাতে তিনি নিজের জনপ্রিয় ভাবমূর্তি ধরে রাখতে পারেন। তবে শ্রমজীবী ইরানিদের মাঝে তার বড় একটি সমর্থক গোষ্ঠী ছিল এবং তার উপদেষ্টারা নিশ্চিত ছিলেন, সাবেক এই প্রেসিডেন্টের লক্ষ্য আবারও ক্ষমতায় ফেরা।
আহমেদিনেজাদের সাবেক ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা আবদুররেজা দাভারি টেলিফোনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, আহমেদিনেজাদ অর্থের জন্য এমন কাজ করবেন না। তার অর্থ ও বড় অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক আছে। তিনি এটি ক্ষমতার জন্য করবেন। তিনি ক্ষমতার শীর্ষে বসতে চান।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইরানের সাবেক এই প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠ সার্কেলের একজন সহযোগী বলেন, আহমেদিনেজাদ বিদেশি শক্তির সহায়তায় ইরানের ভবিষ্যৎ নেতা হওয়ার আকাঙ্ক্ষার কথা তার কয়েকজন অত্যন্ত বিশ্বস্ত সহযোগীকে জানিয়েছিলেন। মূলত, তিনবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অযোগ্য ঘোষিত হওয়ার পর আহমেদিনেজাদ ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেন এবং বুঝতে পারেন যে বর্তমান ব্যবস্থা বহাল থাকলে তিনি আর ক্ষমতায় আসতে পারবেন না।
তিনি বলেন, আহমেদিনেজাদ উদ্বিগ্ন ছিলেন, যুদ্ধ কিংবা সরকার পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আমেরিকান ও ইসরায়েলিরা হয়তো ইরানের বাইরের কোনও বিরোধী নেতাকে বেছে নেবেন; যিনি দেশ সম্পর্কে কিছুই জানেন না এবং এর ফলে ইরান অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে। তিনি নিজেকে রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিনের মতো একজন সংস্কারক হিসেবে দেখতেন এবং বলতেন, তিনি ক্ষমতায় এলে ইরান ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেবে এবং ট্রাম্পের ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের’ অংশ হিসেবে সম্পর্ক স্বাভাবিক করবে।
ইসরায়েলের দুজন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা বলেছেন, ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আহমেদিনেজাদের সঙ্গে ইরানি শাসকগোষ্ঠীর এই দূরত্বের বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল। বিশেষ করে আয়াতুল্লাহ খামেনির প্রতি আহমেদিনেজাদের ক্রমবর্ধমান ক্ষোভের বিষয়টি ইসরায়েলের নজর কেড়েছিল।
ইরানের রেভোলিউশনারি গার্ডসের (আইআরজিসি) গোয়েন্দা শাখা আল কুদস ফোর্স মূলত বিদেশি হস্তক্ষেপ থেকে দেশকে রক্ষা করে। এই সংস্থাটি ২০১৭ সাল থেকেই আহমেদিনেজাদের কর্মকাণ্ডের ওপর সন্দেহ করতে শুরু করে।
আইআরজিসির দুই সদস্য এবং একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেছেন, ২০১৭ সালে আহমাদিনেজাদ যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং পরে সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানকে প্রকাশ্যে চিঠি পাঠাতে শুরু করেন, তখন সেই সন্দেহ আরও বাড়ে।
চলতি বছর ইসরায়েলি হামলার পর আইআরজিসির নজরদারি থেকে প্রথম মুক্ত হন আহমেদিনেজাদ। সেই সময় ইরানের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তদন্ত শুরু করে এবং ইসরায়েলের সঙ্গে তার যোগাযোগের সূত্র উদঘাটন করে।
আইআরজিসির চোখ একাধিকবার ফাঁকি দিয়েছেন আহমেদিনেজাদ
ইসরায়েলি এজেন্টরা ঠিক কবে প্রথম আহমেদিনেজাদকে দলে টানার চেষ্টা করেছিল, তা স্পষ্ট নয়। তবে, ইরানি কর্মকর্তারা বলেছেন, ২০২৩ সালে পরিবেশ বিষয়ক একটি সম্মেলনে যোগ দিতে গুয়াতেমালা সফরে যান আহমেদিনেজাদ। সেবারই ইসরায়েলি এজেন্টদের সঙ্গে তার প্রথম যোগাযোগ হয়। গুয়াতেমালা সরকারের পক্ষ থেকে এই আমন্ত্রণ এসেছিল; যাদের সঙ্গে ইসরায়েলের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে।
তেহরান বিমানবন্দরে নিরাপত্তা বাহিনী তাকে বোর্ডিং পাস দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় সফরটি প্রায় বাতিল হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। এর প্রতিবাদে বিমানবন্দরেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অবস্থান ধর্মঘট শুরু করেন আহমেদিনেজাদ। যা সাধারণ যাত্রী ও বিমানবন্দর কর্মীদের সঙ্গে ছবি তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করার মাধ্যমে জনগণ সংশ্লিষ্ট নাটকে রূপ নেয়। শেষ পর্যন্ত ইরানি কর্তৃপক্ষ তাকে যাওয়ার অনুমতি দেয়।
এর পরের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে প্রথম হাঙ্গেরি সফর করেন তিনি এবং লুদোভিকা ইউনিভার্সিটির সম্মেলনে যোগ দিয়ে মোসাদ প্রধান ডেভিড বার্নিয়ার সঙ্গে বুদাপেস্টে দেখা করেন। ভিক্টর আরবানের নেতৃত্বাধীন হাঙ্গেরির সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক ইউরোপের যেকোনও দেশের চেয়ে ঘনিষ্ঠ ছিল। এমনকি ২০২৫ সালের এপ্রিলে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও এই লুদোভিকা ইউনিভার্সিটিতে ভাষণ দিয়েছিলেন এবং সম্মাননা গ্রহণ করেছিলেন।
সফরের একটি ভিডিওতে আহমেদিনেজাদ বলেছিলেন, ‘কিছু মানুষ আমাকে গুয়াতেমালায় ভ্রমণ করতে নিষেধ করেছিলেন; আমি তাদের বলেছিলাম যে আমার ভাই, যিনি পরিবেশ মন্ত্রী, তিনি আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। এটি লাতিন আমেরিকার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দেশ।’
এর দুই মাস পর, অর্থাৎ ২০২৫ সালের জুনে ইরানে ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু করার ঠিক কয়েক দিন আগে আহমাদিনেজাদ আবারও বুদাপেস্টে যান; যা ছিল ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের সঙ্গে তার গোপন বৈঠকের একটি ছদ্মবরণ।
বিদেশ সফরে তার সঙ্গে থাকা আইআরজিসির আনসার ইউনিটের দেহরক্ষীরা বলেন, সফরকালে অন্তত দুইবার তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে দীর্ঘ সময়ের জন্য নিখোঁজ ছিলেন আহমেদিনেজাদ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে আহমেদিনেজাদ দাবি করেন, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের সঙ্গে বৈঠক করছিলেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মেলনে সাবেক এই ইরানি প্রেসিডেন্ট ইংরেজিতে বক্তৃতা দেন এবং তার চিরাচরিত ভাষণের শুরুতে কুরআনের আয়াত পাঠ করার নিয়ম বর্জন করে উপস্থিত সবাইকে অবাক করে দেন।
নীল রঙের স্যুট পরা আহমেদিনেজাদ সেদিন ‘মানবিকতা’ এবং ‘পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থা’ নিয়ে কথা বলেন এবং কীভাবে একটি নতুন বিশ্ব গড়ে উঠতে পারে তা নিয়ে নিজের মতামত ব্যক্ত করেন। তিনি এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর অধ্যাপক ডেলির হাতে ইরানের প্রাচীন কবি ফেরদৌসীর বিখ্যাত ‘শাহনামা’ গ্রন্থটি তুলে দেন এবং ডেলি তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রতীক উপহার দেন।
গত মাসে এক সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক ডেলি বলেন, আহমেদিনেজাদকে আমন্ত্রণ জানানোর ক্ষেত্রে তিনি মূলত একজন ‘পুতুল’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিলেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে তেহরানের বাড়ি থেকে কালো পিউজো গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে গত সপ্তাহ পর্যন্ত আহমেদিনেজাদকে আর জনসম্মুখে দেখা যায়নি।
সোমবার আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজায় তার আকস্মিক উপস্থিতি সবাইকে অবাক করে দেয়। ৯০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের তীব্র গরমের মধ্যেও তিনি ভারী জ্যাকেট এবং সার্জিক্যাল মাস্ক পরে জানাজায় অংশ নেন। আহমাদিনেজাদ সেখানে মাথা নিচু করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন। আর তার চারপাশ ঘিরে ছিল কঠোর নিরাপত্তা বলয়।
আরটিভি/এসএইচএম