বুধবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ , ১২:৫৭ পিএম
জিডিপি এবং ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টস স্ট্যাটিস্টিক্সের গুণমানে উন্নতির পরও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে ‘সি গ্রেড’ পেয়েছে ভারত।
চলতি অর্থ বছরে অর্থাৎ, ২০২৫-২৬-এর দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে দেশটির প্রকৃত জিডিপি ৮.২ শতাংশ বেড়েছে বলে সম্প্রতি দাবি করেছিল দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার। অঙ্কটা গত বছরের তুলনায় বেশি। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে ভারতের প্রকৃত জিডিপি ছিল ৫.৬ শতাংশ।
এরকম উন্নতির দেখানোর পরও আইএমএফের কাছ থেকে ‘সি গ্রেড’ পাওয়া নিয়ে তুমুল বিতর্কের মুখে পড়েছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। খবর বিবিসি বাংলার।
আইএমএফের প্রকাশিত ‘ইন্ডিয়া : ২০২৫ আর্টিকেল ফোর কন্সালটেশন’ শীর্ষক সাম্প্রতিক প্রতিবেদন প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, সরকারি তথ্য অনুযায়ী ভারতের জিডিপির পরিসংখ্যান যখন প্রবৃদ্ধির দিকে ইঙ্গিত করছে, তখন আইএমএফ কেন ‘সি’ গ্রেড দিয়েছে? গত ২৬ নভেম্বর প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে আইএমএফ বলেছে, পর্যবেক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত তথ্য না মেলার কারণে ভারতকে সি গ্রেড দেওয়া হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে বেশ সরব হয়ে উঠেছে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। বিশেষ করে, কংগ্রেস আইএমএফের রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে বিজেপিকে কোণঠাসা করতে ছাড়েনি। গত কয়েকদিন ধরেই বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।
এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পরিসংখ্যানে কোনো গলদ নেই। দ্রুত এগিয়ে যাওয়া প্রধান অর্থনীতি হিসেবে ভারত তার নিজের অবস্থানকে বেশ মজবুত করে তুলেছে। ভারতের জিডিপি আনুমানিক ৭.৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার (সাত লাখ ৩০ হাজার কোটি ডলার) বলেও জানান হয়েছে বিবৃতিতে।
ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টস স্ট্যাটিস্টিক্স (এনএসএ) জাতীয় অর্থনৈতিক হিসাব ব্যবস্থার অন্তর্গত এমন এক ব্যবস্থা যা একটি দেশের অর্থনীতি বর্ণনা করার জন্য বিশদ এবং সমন্বিত কাঠামো প্রদান করে।
জাতিসংঘের ‘সিস্টেম অব ন্যশনাল অ্যাকাউন্টস’ এর নীতির ওপর ভিত্তি করে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি), জাতীয় আয়, খরচ, সঞ্চয় এবং মূলধন গঠনের মতো সামগ্রিক অর্থনৈতিক সমষ্টির পরিমাপ ও বিশ্লেষণ করতে ব্যবহার করা হয় এনএসএ। এর জন্য বিভিন্ন উৎস থেকে সংকলন করা তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এটা কোনও দেশের অর্থনৈতিক কর্মক্ষমতা এবং কাঠামো মূল্যায়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়।
আইএমএফ তাদের কাছে পেশ করা তথ্যকে চার বিভাগে বা গ্রেডে ভাগ করে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পক্ষ থেকে ভারতের ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টস স্ট্যাটিসটিক্সকে সি গ্রেড দেওয়া হয়েছে; যা চারটি গ্রেডের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন।
এই চার গ্রেডের মধ্যে প্রথম হলো, গ্রেড এ। অর্থাৎ পর্যবেক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত ডেটা রয়েছে। এরপর গ্রেড বি; যার অর্থ ডেটাতে কিছু ত্রুটি রয়েছে; তবে, সামগ্রিকভাবে সেগুলো পর্যবেক্ষণের জন্য যথেষ্ট।
এরপর তৃতীয় হলো গ্রেড সি, যার দ্বারা বোঝানো হয় যে ডেটাতে কিছু ঘাটতি রয়েছে, যা পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়াকে কিছুটা প্রভাবিত করে।
সবশেষ চতুর্থ হলো গ্রেড ডি। এর অর্থ ডেটাতে গুরুতর ফাঁক রয়েছে; যা পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বাধার সৃষ্টি করে। আইএমএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের ব্যবহৃত জাতীয় অ্যাকাউন্টস স্ট্যাটিসটিক্সের ক্ষেত্রে ফ্রিকোয়েন্সি সঠিক এবং সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্যও পাওয়া গেছে। তবে, এর কিছু পদ্ধতিগত ত্রুটি রয়েছে যে বিষয়ে আইএমএফ উল্লেখ করেছে।
আইএমএফ বলেছে, ভারত সরকার যে তথ্য ব্যবহার করেছে তা ২০১১-২০১২ সালের এবং সেই ভিত্তিবর্ষ এখন আর প্রাসঙ্গিক নয়। এছাড়া, ভারত প্রোডিউসড প্রাইস ইনডেক্স বা উৎপাদক মূল্য সূচক ব্যবহার করে না। তার পরিবর্তে হোলসেল প্রাইস ইনডেক্স বা পাইকারি মূল্য সূচক ব্যবহার করে যে কারণে তথ্যে পার্থক্য দেখা যেতে পারে।
উৎপাদক মূল্য সূচক হলো এমন এক অর্থনৈতিক সূচক যা দেশীয় উৎপাদকদের তাদের উৎপাদনের জন্য প্রাপ্ত বিক্রয়মূল্যের গড় পরিবর্তনকে পরিমাপ করে। এটা উৎপাদকের দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্য পরিবর্তনের বিষয়টাকে প্রতিফলিত করে এবং ভোক্তাদের কাছে পৌঁছানোর আগে মুদ্রাস্ফীতির ফলে তৈরি চাপের প্রাথমিক সূচক হিসেবেও কাজ করে।
অন্যদিকে, পাইকারি মূল্য সূচক পাইকারি পর্যায়ে পণ্যের দামের গড় পরিবর্তনের উপর নজর রাখে। এটা মুদ্রাস্ফীতি পরিমাপ করতে, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) মতো পরিবর্তনশীল বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে ডিফ্লেক্টর বা বিচ্যুতি বোঝানোর কাজ করে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বলেছে, নন-ব্যাংকিং ফিন্যান্সিয়াল কোম্পানি (এনবিএফসি), খানা বা পরিবার এবং পুরো সিস্টেমের মধ্যে যে আর্থিক আন্তঃসংযোগ রয়েছে সে বিষয়ে উপলব্ধ তথ্যও ভারতের ক্ষেত্রে সীমিত।
এনবিএফসি বলে এমন সংস্থাকে বোঝায় যা ঋণ, বিনিয়োগ ইত্যাদির মতো আর্থিক পরিষেবা দেয় বটে, কিন্তু তাদের ব্যাংকিং লাইসেন্স নেই।
আইএমএফের প্রতিবেদন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করেছেন কংগ্রেস নেতা পি চিদাম্বরম। এক্সে করা সেই পোস্টে বিজেপি সরকারের কাছে তিনি জানতে চেয়েছেন, আইএমএফ কেন ভারতের ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টস স্ট্যাটিস্টিকসকে সি গ্রেডে রেখেছে।
প্রতিক্রিয়া স্বরূপ বিজেপির আইটি সেলের প্রধান অমিত মালব্য পাল্টা বলেছেন, এই বিষয়টি উদ্বেগজনক যে সাবেক অর্থমন্ত্রী আতঙ্ক ছড়াচ্ছেন। কারণ, তার দল হজম করতে পারছে না যে অবস্থায় তারা (ভারতীয় অর্থনীতিকে) রেখে গিয়েছিলেন; সেই ফ্র্যাজাইল ফাইভ (পাঁচটা নাজুক অর্থনীতির দেশ) অর্থনীতির মধ্যে এখন আর ভারত নেই।
দেশ অনেকটাই এগিয়েছে দাবি করে বিজেপি জানিয়েছে, বহু বছর ধরেই ভারতকে সি গ্রেড দেওয়া হয়েছে। ২০১১-২০১২ অর্থবছরকে ভিত্তিবর্ষ হিসেবে ধরার কারণে কৌশলগত সমস্যার ফলেই বহু বছর ধরে ভারতের ক্ষেত্রে এই গ্রেডের কোনো পরিবর্তন হয়নি।
এ ব্যাপারে দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক অরুণ কুমার বলেছেন, বছরের পর বছর ধরে জিডিপির পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিক করণ থাপারের সঙ্গে আলোচনার সময় তিনি বলেছিলেন, জিডিপির জন্য ২০১১-২০১২ সিরিজের পরিসংখ্যান সরকার নিজেই একসময় গ্রহণ করেনি। নোট বাতিলের সময় প্রায় তিন লাখ সংস্থাকে শেল কোম্পানি বলে বন্ধ করে দেওয়া হয়, কিন্তু পরিসংখ্যানে তার কোনো প্রভাব দেখা যায়নি। সার্ভে অফ সার্ভিস সেক্টরের (পরিষেবা খাতের) জরিপের সময় দেখা গেছে, তালিকাভুক্ত সংস্থাগুলোর প্রায় ৩৫ শতাংশ কোম্পানি যেখানে লিস্টেড ছিল, সেখানে আর নেই। তাহলে কীভাবে এই তথ্য সঠিক হতে পারে? এই সমস্ত তথ্যের প্রতিফলন হওয়া উচিত।
এ অর্থনীতি বিশ্লেষকের ভাষ্যমতে, ২০১৯ সালে একটা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল বেকারত্বের হার গত ৪৫ বছরের সর্বোচ্চ স্তরে। তারপর আদমশুমারিও হয়নি। তাই এই সব তথ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠতে বাধ্য।
অরুণ কুমার বলেছেন, বিগত কয়েক বছরে অসংগঠিত ক্ষেত্র একের পর এক ধাক্কার সম্মুখীন হয়েছে। তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, প্রথমে নোট বাতিল করা, তারপর জিএসটি চালু করা হয় যে কারণে অনেক সমস্যা তৈরি হয়। এরপর নন-ফিন্যান্সিয়াল ব্যাংকিং সেক্টর সমস্যায় পড়ে এবং তারপর কোভিড মহামারীর কারণে অসংগঠিত ক্ষেত্র আবার আঘাত পায়। এই পরিস্থিতিতে জিডিপি গণনা করার পদ্ধতি চারবার বদলানো উচিত ছিল, কিন্তু বাস্তবে তা একবারও পরিবর্তন করা হয়নি। আমি মনে করি আইএমএফ যা করেছে তা কয়েকটা বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করে।
বিষয়টাকে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছেন এ অর্থনীতি বিশ্লেষক। তিনি বলেন, একদিকে সরকার অসংগঠিত খাত নিয়ে নিরপেক্ষ মূল্যায়ন করছে না। কিন্তু এটা মেনে নিচ্ছে যে সেটা সংগঠিত ক্ষেত্রের মতো বাড়ছে। অথচ অসংগঠিত ক্ষেত্রকে এই ধাক্কাগুলো কিন্তু বেশি প্রভাবিত করেছে। যদিও (সরকারি তথ্যের দিকে ইঙ্গিত করে) পতনশীল খাতের পরিসংখ্যানকে বৃদ্ধি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অর্থনীতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও দ্য ওয়্যারের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এমকে বেণু মনে করেন আইএমএফের প্রতিবেদনে এই ইঙ্গিত স্পষ্ট দেশের জিডিপি গণনা করার পদ্ধতিতে অনেক ত্রুটি রয়েছে। তিনি বলেন, ভারত নিজেকে একটা বৃহত্তর অর্থনীতি এবং দ্রুত অগ্রগামী অর্থনীতি হিসেবে তুলে ধরে। কিন্তু, এই রিপোর্ট (আইএমএফ) আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে।
বেণু আইএমএফের প্রতিবেদনে তথ্যের ফাঁককে ব্যাখ্যা করতে সাইজেবল ডিস্ক্রিপেনিস (খুব বড় আকারের ত্রুটি) শব্দটা ব্যবহার করেছেন। তিনি জানিয়েছেন ভারত এর আগে বি গ্রেড পেয়েছে। বর্তমানের সি গ্রেড কিন্তু কোনোদিক থেকেই ইতিবাচক লক্ষণ নয়। গত পাঁচ-ছয় বছর ধরে আমি দেখছি সরকার তথ্য হেরফের করছে। সরকার তথ্যকে হেরফের করে পেশ করছে। কোভিড মহামারির পর অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মধ্যে অনেকের দাবি, সরকার প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান ঠিকমতো দেখাচ্ছে না।
আরটিভি/এসএইচএম