images

যুক্তরাষ্ট্র

মার্কিন গোয়েন্দাদের পাত্তা দেননি ট্রাম্প, ইসরায়েলের কথাতেই ইরানে হামলা! 

শনিবার, ০৯ মে ২০২৬ , ০৭:২৯ পিএম

ইরানের বিরুদ্ধে টানা ৪০ দিনের যুদ্ধ শুরুর আগে দেশটির পরমাণু ইস্যুতে মার্কিন সব গোয়েন্দা সংস্থারই মূল্যায়ন অভিন্ন ছিল। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, কোনও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছিল না তেহরান। এমনকি ইরানে হামলা চালানো হলে বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি হতে পারে বলেও সতর্ক করেছিলেন তারা। তবে, মার্কিন গোয়েন্দাদের পাত্তা না দিয়ে ইসরায়েল ও তাদের লবিস্টদের কথায় ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।    

এমনটাই দাবি করছেন সাবেক মার্কিন ন্যাশনাল কাউন্টারটেরোরিজম সেন্টারের পরিচালক জো কেন্ট।

বৃহস্পতিবার (৭ মে) এক্স-এ দেওয়া পোস্টে তিনি বলেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে না এই তথ্যে একমত ছিল মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো, যার মধ্যে সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সিও (সিআইএ) রয়েছে।

তিনি অভিযোগ করেন, ইসরায়েল নামের একটি বিদেশি সরকারের প্রচারিত বয়ান ও রাজনৈতিক এজেন্ডাই শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকে এই যুদ্ধে ঠেলে দেয়।

কেন্ট বলেন, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আগেই সতর্ক করেছিল যে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্যবস্তু করবে এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে।

তার মতে, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব লক্ষ্য করে হামলা চালালে উল্টো দেশটির কট্টরপন্থিদের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে-এমন মূল্যায়নও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো করেছিল।

আরও পড়ুন
5

রাশিয়া-ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিলেন ট্রাম্প 

কেন্ট গত মার্চ মাসে নিজের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। পদত্যাগপত্রে তিনি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানবিরোধী যুদ্ধের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন এবং বলেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তাৎক্ষণিক কোনো হুমকি ছিল না।

প্রসঙ্গত, ইরানের পরমাণু প্রকল্প এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে গত ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২১ দিন ধরে সংলাপ চলে তেহরান এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে। ২৭ ফেব্রুয়ারি কোনো প্রকার সমঝোতা চুক্তি ছাড়াই শেষ হয় সেই সংলাপ।

পরের দিন ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একই সময়ে ইরানে সামরিক অভিযান ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’ শুরু করে ইসরায়েলও।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এ যৌথ হামলার প্রথম ধাক্কাতেই প্রাণ হারান ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তার পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লাগাতার হামলায় প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলী লারিজানি, সামরিক বাহিনীর অভিজাত শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর শীর্ষ কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপৌরসহ বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে হারায় ইরান। ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ ও ধ্বংস হয় দেশটির বিভিন্ন সামরিক-বেসামরিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। সেইসঙ্গে প্রাণ হারায় ইরানের ২ হাজারের বেশি মানুষ।

যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে শক্ত জবাব দেয় ইরানও। যুদ্ধের শুরু থেকেই ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলের ৬ দেশ সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্তর আরব আমিরাত, ওমানে অবস্থিত মার্কিন সেনাঘাঁটি ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে দফায় দফায় ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় দেশটি। ইরানের লাগাতার হামলার মুখে করুণভাবে ভেঙে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও। এ অবস্থায় আবার ইরানের পক্ষে যোগ দেয় লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হুতি বাহিনী; যা ইরানের শক্তি অনেকটাই বাড়িয়ে দেয় যুদ্ধে। 

এছাড়া, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় ইরানের হামলায় ভয়ংকর বিপদের মুখে পড়ে যায় ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন মিত্ররা। একইসঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় ধস নামে মার্কিন তেল বাণিজ্যেও।

এ অবস্থায় ইরানকে যুদ্ধবিরতিতে রাজি করানোর জন্য শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের দ্বারস্ত হয় যুক্তরাষ্ট্র। টানা ৩৮ দিন হামলা-পাল্টা হামলার পর গত ৭ এপ্রিল ১৫ দিনের অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় দুইপক্ষ। গত ২৩ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হলেও এখন পর্যন্ত কোনও পক্ষই অন্য পক্ষের ওপর হামলা চালায়নি। তবে, কোনও ধরনের সমঝোতায়ও পৌঁছাতে পারেনি তারা।  

ফলে, একে অপরকে চাপে রাখতে হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ জারি করে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। এতে গুরুত্বপূর্ণ এ বাণিজ্যপথে জাহাজ চলাচল সম্ভব না হওয়ায় অস্থির হয়ে উঠেছে তেলের আন্তর্জাতিক বাজার, যার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব পড়ছে অর্থনীতির অন্যান্য খাতেও; ব্যারেল প্রতি প্রায় ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে অপরিশোধিত তেলের দাম। সেইসঙ্গে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে জেট ফুয়েলের দামও। পাশাপাশি বেড়ে যাচ্ছে অন্যান্য জ্বালানির দামও।  

তাছাড়া, পরমাণু কর্মসূচি ও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন ইস্যুতে ইরানের অনড় অবস্থান এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর উসকানিমূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে আবারও জেগে উঠেছে যুদ্ধের শঙ্কা।    

আরটিভি/এসএইচএম