images

যুক্তরাষ্ট্র

ইরান নয়, ট্রাম্পই বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিপদ!

শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬ , ০৮:২৪ পিএম

বন্ধ হয়ে গেছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার শান্তি আলোচনার পথ। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে শুরু হয়েছে উত্তেজনা। এক সপ্তাহ ধরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য চলছে ভয়াবহ হামলা-পাল্টা হামলা। আর ইরানে নতুন করে হামলা শুরুর জন্য দেশটিকে বারবার বিশ্বশান্তির জন্য হুমকি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। 

তবে, ইরান নয়; ট্রাম্পকেই বিশ্বের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ হিসেবে উল্লেখ করেন ব্রিটিশ প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের কলামিস্ট সিমন টিসডল। তার মতে, ট্রাম্প একাই এক বিধ্বংসী অস্ত্র।      

শনিবার (১৮ জুলাই) দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত কলামে সিমন টিসডল লিখেন, নিজের শুরু করা বিপর্যয়কর যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার কোনো পথই খুঁজে পাচ্ছেন না ট্রাম্প। আবারও ইরান এবং এর বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর প্রচণ্ড আঘাত হানছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। আগের মতোই, এই বেআইনি প্রহার একটি কট্টরপন্থী শাসনের প্রতিরোধকে আরও শক্তিশালী করছে। ট্রাম্প এই সপ্তাহে দাবি করেছেন যে তিনি ‘বড় জয়’ পাচ্ছেন। কেউই তাকে বিশ্বাস করে না। তার এই নির্বুদ্ধিতা ও অক্ষমতাকে উপহাস করছে বিশ্ব।

ট্রাম্পের যুদ্ধংদেহী মনোভাবের কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ এখন হোয়াইট হাউসের সীমিত ও অধরা লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। ট্রাম্পের কাপুরুষোচিত নেতৃত্বই মার্কিন বাহিনীকে অকার্যকর করে তুলেছে, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর নয়। ইরান যদি সত্যিই তার দাবিকৃত অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে থাকে, তবে এর যৌক্তিক পথ হবে সর্বাত্মক বিজয়। জর্জ ডব্লিউ বুশ যখন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে ইরাক অগ্রহণযোগ্য বিপদ ডেকে আনছে, তখন তিনি ১ লক্ষ ৭০ হাজার স্থলসেনা নিয়ে আক্রমণ করেছিলেন। সেটি ছিল এক মহাবিপর্যয়। কিন্তু, অন্তত বুশের সাহস ছিল।

আরও পড়ুন
trump

ট্রাম্পের মাথার জন্য ১২৩ কোটি টাকা পুরস্কার ঘোষণা

সিমন টিসডল লিখেন, হাঁটুর ব্যথায় কাতর ট্রাম্প ইরানে সেরকম কিছু করার সাহস দেখান না, যার জন্য নিঃসন্দেহে বিশ্বের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। কিন্তু তিনি এমন একটি লড়াই বেপরোয়াভাবে শুরু করার ভুলও স্বীকার করবেন না, যা তিনি শেষ করতে পারবেন না। তিনি তার ভুল স্বীকার করে স্থগিত থাকা শান্তি আলোচনার মাধ্যমে কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা করার পরিবর্তে বেসামরিক নাগরিক ও মার্কিন সেনাদের একটি অজেয় ও চিরস্থায়ী ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধের মুখে ঠেলে দিতে, উপসাগরীয় আরব মিত্রদের বিপন্ন করতে, বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষতি করতে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি নিতে, মস্কো থেকে বেইজিং পর্যন্ত স্বৈরশাসকদের মন জয় করতে, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করতে এবং তার রিপাবলিকান দলের নির্বাচনী সম্ভাবনা নষ্ট করতে পছন্দ করেন।

ইরান নয়, ট্রাম্পের আত্মপ্রেমই বিশ্বের এক নম্বর শত্রু। এই যুদ্ধ যে আবার অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে চলেছে, তার প্রধান কারণ তিনিই। তিনি একাই এক গণবিধ্বংসী অস্ত্র।

এখানে একটি পরিচিত ধারা লক্ষ্য করা যায়। ট্রাম্প কংগ্রেস, মার্কিন মিত্র বা আমেরিকান জনগণের সঙ্গে পরামর্শ না করেই যুদ্ধে গিয়েছিলেন। তার কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা বা দীর্ঘমেয়াদী কৌশল ছিল না। ইসরায়েলের সন্দেহজনক প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে দ্রুত বিজয়ের সন্দেহজনক আশ্বাস গিলে ফেলেছিলেন তিনি। সামরিক ও আঞ্চলিক ঝুঁকি সম্পর্কে তার গভীর অজ্ঞতা বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন উপেক্ষা করার পরেও অক্ষুণ্ণ ছিল। আশ্চর্যজনকভাবে, ট্রাম্প আশা করছিলেন যে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার আগেই ইরান আত্মসমর্পণ করবে। কিন্তু, উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলা হতবাক করে দিয়েছে তাকে। এখন তিনি দিশেহারা।

এই একই ঔদ্ধত্য এবং দায়িত্বজ্ঞানহীনতা গত বছরের ২০-দফা গাজা শান্তি পরিকল্পনাতেও দেখা গিয়েছিল। পুনর্গঠন, একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী, নিরস্ত্রীকরণ—এর কোনো মূল উপাদানই এগোয়নি এবং ট্রাম্পও মূলত আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। হামাস অস্ত্র ফেলেনি, ইসরায়েলি বাহিনী ওই অঞ্চল থেকে সরে যেতে অস্বীকার করছে, মানবিক সহায়তা এখনও ব্যাহত হচ্ছে এবং অক্টোবরের ‘যুদ্ধবিরতি’র পর থেকে ১ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। কোনো রাজনৈতিক সমাধান দৃষ্টিগোচর না হওয়ায় শান্তিহীন-যুদ্ধহীন এক অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে গাজা।

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে ট্রাম্পের অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমালোচনা প্রযোজ্য। তিনি কখনোই মূল কারণ বা ভ্লাদিমির পুতিনের অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে মাথা ঘামাননি। তিনি যাকে শক্তিশালী পক্ষ বলে মনে করতেন, তার পক্ষ নিয়েছিলেন এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে ভয় দেখিয়ে প্রায়-আত্মসমর্পণে বাধ্য করার চেষ্টা করেছিলেন। যখন তা ব্যর্থ হলো, তিনি খিটখিটে মেজাজে কিয়েভের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। তিনি এখনও অনমনীয় পুতিনকে তুষ্ট করার চেষ্টা করছেন। ট্রাম্পের নির্বুদ্ধিতা, অধৈর্য এবং দায়িত্বজ্ঞানহীনতার এই ধারা ইরানে আবারও পুনরাবৃত্তি হচ্ছে।

নিজেকে মুক্ত করতে না পেরে ট্রাম্প দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। এই সপ্তাহের উত্তেজনা বৃদ্ধির মূলে রয়েছে জুনের ‘সমঝোতা স্মারক’, যা সারগর্ভ আলোচনার অপেক্ষায় ৬০ দিনের জন্য সংঘাতকে স্থগিত রাখার কথা ছিল। ট্রাম্প এই সমঝোতা স্মারকটিকে ব্যক্তিগত বিজয় হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন, কিন্তু তার অন্যান্য অনেক চুক্তির মতোই এটিও মারাত্মকভাবে ত্রুটিপূর্ণ। এর পঞ্চম অনুচ্ছেদটি হরমুজ প্রণালীর ওপর কার্যত ইরানি নিয়ন্ত্রণকে বৈধতা দিয়েছিল বলে মনে হয়। একটি বিকল্প পথের জন্য মরিয়া হয়ে ট্রাম্প এতে রাজি হয়েছিলেন। এখন, এর পরিণতি যখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে, তিনি মুখ খুলছেন। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে তেহরান তাকে বিশ্বাস করে না। কে-ই বা করে?

ট্রাম্পের ইরান-বিষয়ক ব্যর্থতার কারণে সৃষ্ট ক্ষতি এই মুহূর্তে সীমাহীন বলে মনে হচ্ছে। এটি এমন এক ধরনের দৃশ্য, যা বিশ্ব খুব কমই দেখেছে। একজন মদ্যপের মতো, যে এই বিশ্বাসে আবার মদ পান করে যে এবার ফলাফল ভিন্ন হবে, ট্রাম্পও প্রতিদিন বোমা হামলা পুনরায় শুরু করেছেন, যদিও তার আগের সমস্ত আক্রমণ কাঙ্ক্ষিত ফল আনতে ব্যর্থ হয়েছিল। তিনি যত বেশি বোমা ফেলেন, শাসনব্যবস্থা তত বেশি অনড় হয়ে ওঠে, সংঘাত তত বেশি তীব্র ও বিস্তৃত হয় এবং পারমাণবিক সমস্যার সমাধানের সম্ভাবনাও তত বেশি ক্ষীণ হয়ে আসে, যেটিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই বিষয়ের মূল কেন্দ্রবিন্দু বলে দাবি করে।

এটা স্পষ্ট যে, হরমুজ প্রণালীতে শুল্ক আরোপের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই নিজের অবস্থান থেকে সরে আসা, যুদ্ধাপরাধের শামিল হতে পারে এমন বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলা তদারকি করা এবং ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথিদের দ্বারা লোহিত সাগরে অর্থনৈতিকভাবে ভয়াবহ অবরোধের সম্মুখীন হওয়া— ট্রাম্পের এই গভীর সংকট থেকে বেরিয়ে আসার কোনো ধারণাই নেই। ইউরোপীয় মিত্ররা তাকে সন্দেহের চোখে দেখছে, ওয়াশিংটনের শত্রুরা উল্লাসে হাসছে, বিশ্ববাজার আতঙ্কিত এবং তেলের দাম আবার বাড়ছে। প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের সুনাম ও প্রভাব হ্রাস পাচ্ছে। যখন কেউ আপনাকে সম্মান করে না, তখন পরাশক্তি হওয়াটা কঠিন।

ট্রাম্পকে কে থামাবে? কংগ্রেস তাকে যুদ্ধ বন্ধ করতে অথবা আনুষ্ঠানিক অনুমোদন চাইতে বলেছে। তিনি তা উপেক্ষা করছেন। জনমত জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ আমেরিকান এই ১০০ বিলিয়ন ডলারের মুদ্রাস্ফীতি-সৃষ্টিকারী জগাখিচুড়ির বিরুদ্ধে, তবুও ট্রাম্প শুনতে নারাজ। ন্যাটোর আঙ্কারা শীর্ষ সম্মেলনে আরও একবার তীব্র তিরস্কারের পর আতঙ্কিত মিত্ররা স্থায়ী বিচ্ছেদের ভয়ে তাকে বাধা দেওয়ার সাহস করে না। পোপ লিও তার সাধ্যমতো চেষ্টা করেন। প্রার্থনাই হয়তো একমাত্র উপায়।

নিজের সামরিক বিভ্রমের ধ্বংসস্তূপের মাঝে ক্রেমলিনে বসে পুতিন খুব আনন্দের সাথেই দেখছেন যে, আমেরিকানরা ইউক্রেন থেকে বহু দূরে মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি চিরস্থায়ী যুদ্ধে তাদের দুষ্প্রাপ্য ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধক, সম্পদ এবং শক্তি ঢেলে দিচ্ছে। পশ্চিমা জোটের মধ্যে উত্তেজনা যত বাড়বে, পুতিন ততই খুশি হবেন। আর চীনের মনোভাব নিয়ে যদি কারও সন্দেহ থাকে, তবে গত সপ্তাহে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপিত দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার দিকেই তাকান। উদ্বিগ্ন জাপান ও তাইওয়ানের মতো প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংও ট্রাম্পের এই বিশৃঙ্খলা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। চীন ইতোমধ্যেই অর্থনৈতিকভাবে এবং সফট পাওয়ারের সুবিধা আদায়ের ক্ষেত্রে এক বিরাট সুবিধাভোগী। আজ হোক বা কাল, শিও সামরিকভাবে এর ফায়দা লুটবেন।

সিমন টিসডলের মতে, ট্রাম্পের এই জটিল সমস্যার সমাধান শেষ পর্যন্ত আমেরিকান জনগণকেই করতে হবে। তারাই তাকে নির্বাচিত করেছে। তারাই এই বিপজ্জনক দানবের বোঝা বিশ্বের উপর চাপিয়ে দিয়েছে। তার এই ধ্বংসযজ্ঞের জন্য শেষ পর্যন্ত হয়তো তাদেরকেই সর্বোচ্চ মূল্য দিতে হবে। ১৭৭৬ সালের টমাস জেফারসন এবং প্রতিষ্ঠাতাদের মতোই আমরা, বিশ্বের মানুষ, এই সত্যগুলোকে স্বতঃসিদ্ধ বলে মনে করি: আমেরিকাকে পুনরায় মহান করে তোলা তো দূরের কথা, ট্রাম্প একে আরও ছোট, হীন, অসুখী, বিভক্ত, বিচ্ছিন্ন এবং ভালোবাসাহীন করে তুলছেন। এখন জরুরিভাবে প্রয়োজন— ২০২৬ সালে ট্রাম্পের কাছ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা।

আরটিভি/এসএইচএম