রোববার, ০৭ জুন ২০২৬ , ০১:৫১ পিএম
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার মামলায় প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
রোববার (৭ জুন) ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন।
রায়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি প্রধান আসামি সোহেলকে ৫ লাখ টাকা এবং তার স্ত্রী স্বপ্নাকে ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। এই অর্থদণ্ডের টাকা ভুক্তভোগী শিশু রামিসার আইনগত উত্তরাধিকারীরা পাবেন। আসামিরা এই ক্ষতিপূরণ দিতে ব্যর্থ হলে তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে তা ভুক্তভোগীর পরিবারকে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মাত্র ১৯ দিনে এই বিচারপ্রক্রিয়া শেষ হলো। রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের এই মামলাটি কেবল একটি ফৌজদারি বিচারিক কার্যক্রম নয়; এটি আমাদের সমাজের বিবেক, মানবতা, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং আইনের শাসনের প্রতি এক গভীর ও কঠিন পরীক্ষা। শিশুদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা একটি সভ্য ও মানবিক রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। যখন কোনো শিশু এমন জঘন্য অপরাধের শিকার হয়, তখন তা শুধু একটি পরিবারকে নয়, সমগ্র সমাজকে গভীরভাবে আহত করে।
আদালত তার পর্যবেক্ষণে আরও বলে, বর্তমানে এই ট্রাইব্যুনালে ১ হাজার ৮০০-র বেশি বিচারাধীন মামলা রয়েছে, যার প্রতিটিই শিশুদের প্রতি সংঘটিত কোনো না কোনো গুরুতর অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সেই প্রেক্ষাপটে শিশু রামিসার মামলাটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে, কারণ অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে এর তদন্ত, বিচারিক কার্যক্রম ও সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। ঘটনার মাত্র ৪ দিনের মাথায় গত ২৪ মে তদন্তকারী কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) অহিদুজ্জামান ১৮ জনকে সাক্ষী করে আদালতে চার্জশিট জমা দেন। আদালত এই দ্রুত ও মানসম্মত তদন্তের জন্য তদন্তকারী সংস্থা এবং অল্প সময়ে সাক্ষীদের আদালতে উপস্থাপন করার জন্য প্রসিকিউশনের আন্তরিকতা ও পেশাদারিত্বের উচ্চ প্রশংসা করেন। বিচারক আশা প্রকাশ করেন, এই মামলার দ্রুত ও সফল বিচারিক প্রক্রিয়া ভবিষ্যতে শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত অন্যান্য মামলার ক্ষেত্রে একটি অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
এর আগে গত ১ জুন আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করার পর ২ জুন মাত্র এক দিনেই ১৮ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ করেন আদালত। ৩ জুন আত্মপক্ষ সমর্থনে আসামিরা নিজেদের নির্দোষ দাবি করলেও ৪ জুন উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে রায়ের জন্য আজকের দিন ধার্য করা হয়েছিল।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে পল্লবীর বাসা থেকে বের হয় পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসা। প্রতিবেশী স্বপ্না খাতুন তাকে কৌশলে নিজেদের বাসায় ডেকে নেন। পরে রামিসাকে খুঁজে না পেয়ে খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে সোহেলের দরজার সামনে মেয়ের জুতা দেখতে পান তার মা। কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে প্রতিবেশীদের সহায়তায় দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে শয়নকক্ষের মেঝেতে রামিসার মস্তকবিহীন মরদেহ এবং একটি বালতির ভেতর তার কাটা মাথা দেখতে পান বাবা-মা। পরে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে খবর পেয়ে পুলিশ স্বপ্নাকে আটক করে এবং তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে মূল ঘাতক সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করে। এই ঘটনায় ২০ মে পল্লবী থানায় মামলা করেছিলেন রামিসার বাবা।
আরটিভি/এআর