images

লাইফস্টাইল / ফিচার / পরামর্শ

সময় কেন কখনো দ্রুত, কখনো ধীরে চলে বলে আমাদের মনে হয়?

সোমবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০২৫ , ০৪:০৪ পিএম

সময় একটি ধ্রুবক, একটি স্থির প্রবাহ। পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রানুসারে প্রতি সেকেন্ড, মিনিট বা ঘণ্টা সবসময় সমান। তবুও, আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতায় এই সময়ের প্রবাহ এক রহস্যময় চঞ্চলতা দেখায়। কখনো একটি দিন যেন মুহূর্তেই ফুরিয়ে যায়, আবার কখনো একটি ঘণ্টা যেন অনন্তকাল ধরে চলছে। কেন ঘটে এমন? উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের মনস্তত্ত্ব এবং মস্তিষ্কের সময় প্রক্রিয়াকরণ পদ্ধতির মধ্যে।

​১. নতুন অভিজ্ঞতা বনাম পরিচিত রুটিন: ‘হলিডে প্যারাডক্স’ সময়ের গতি অনুভবের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হলো স্মৃতি এবং তথ্যের পরিমাণ।

নতুন অভিজ্ঞতায় ধীরে চলা: যখন আমরা ছুটিতে যাই বা নতুন কোনো অভিজ্ঞতা লাভ করি (যেমন নতুন জায়গায় ভ্রমণ, নতুন দক্ষতা শেখা), আমাদের মস্তিষ্ক প্রচুর পরিমাণে নতুন তথ্য এবং স্মৃতি তৈরি করে। এই সময় মস্তিষ্ককে প্রতিটি মুহূর্তকে মনোযোগ দিয়ে প্রক্রিয়া করতে হয়। ফলস্বরূপ, যখন আমরা সেই দিনের দিকে ফিরে তাকাই, মনে হয় যেন অনেক কিছু ঘটেছে এবং সময়টি ধীরে কেটেছে। এটিকে মনস্তত্ত্বে ‘হলিডে প্যারাডক্স’ বলা হয়।

রুটিনে দ্রুত দৌড়ানো: অন্যদিকে, যখন আমরা একই রুটিন মেনে চলি একই কাজ, একই পরিবেশ মস্তিষ্ক সেই তথ্যগুলোকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রক্রিয়াকরণ করে ফেলে। খুব কম নতুন স্মৃতি তৈরি হয়। ফলে, যখন আপনি সপ্তাহের দিকে ফিরে তাকান, তখন মনে হয় কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাই ঘটেনি, যেন সময়টি চোখের পলকে দ্রুত পার হয়ে গেছে।

২. আবেগের তীব্রতা: ‘আনন্দের মুহূর্ত উড়ে যায়, দুঃখের সময় থমকে দাঁড়ায়’ আমাদের আবেগগত অবস্থা সময়ের অনুভূতিকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করে।

আনন্দে সময় দ্রুত: যখন আমরা কোনো কিছু উপভোগ করি, মজা করি বা ভালোবাসার মানুষের সাথে সময় কাটাই, তখন আমরা সময়ের দিকে মনোযোগ দিই না। আমাদের মনোযোগ থাকে মুহূর্তটির উপভোগের ওপর। ফলে, যখন আমরা ঘড়ির দিকে তাকাই, তখন বিস্মিত হই যে এত দ্রুত সময় কেটে গেল!

দুঃখ ও উদ্বেগে সময় ধীরে: যখন আমরা কোনো অপেক্ষায় থাকি, দুঃখে থাকি, বা শারীরিক যন্ত্রণায় ভুগি, তখন আমাদের মনোযোগ থাকে ঘড়ির কাঁটার দিকে বা পরিস্থিতির ওপর। মস্তিষ্ক বিপদ বা সমস্যা মোকাবিলায় হাইপার-অ্যালার্ট অবস্থায় থাকে এবং প্রতিটি সেকেন্ডকে আলাদাভাবে পর্যবেক্ষণ করে। এই কারণেই, অপেক্ষা বা দুশ্চিন্তার মুহূর্তগুলো যেন কিছুতেই কাটতে চায় না।

৩. বয়স ও সময় জ্ঞান:
​বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের কাছে সময় আরও দ্রুত অনুভূত হয়, একে বলা হয় টেম্পোরাল ডিজঅর্ডার।

শৈশবের দীর্ঘ সময়: একটি ১০ বছর বয়সী শিশুর জন্য এক বছর তার জীবনের মোট সময়ের দশ ভাগের এক ভাগ। ফলে বছরটি অনেক লম্বা মনে হয়।

​বার্ধক্যের দ্রুততা: একজন ৫০ বছর বয়সী মানুষের জন্য এক বছর তার জীবনের পঞ্চাশ ভাগের এক ভাগ মাত্র। জীবনের মোট সময়ের তুলনায় এটি একটি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ, তাই বছরগুলো দ্রুত চলে যায় বলে মনে হয়। একই সাথে, বয়স্কদের জীবনে নতুন অভিজ্ঞতার সংখ্যাও সাধারণত কমে আসে, যা সময়ের দ্রুততাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

৪. মনোযোগের ভূমিকা: আমরা কোনো কাজে কতটা মনোযোগ দিচ্ছি, তার ওপরও নির্ভর করে সময় কীভাবে কাটবে।

ফোকাসড কাজে দ্রুত সময়: যখন আমরা গভীর মনোযোগ দিয়ে কোনো আকর্ষণীয় কাজ করি (যেমন বই পড়া, ভিডিও গেম খেলা), তখন আমাদের মন সময়ের প্রবাহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

​মনোযোগহীনতায় ধীরে সময়: যখন আমরা কোনো বিরক্তিকর বা মনোযোগহীন কাজ করি, তখন আমাদের মস্তিষ্ক অন্য কাজে ব্যস্ত থাকার জন্য অনুসন্ধান করতে থাকে। ফলে আমরা বারবার ঘড়ির দিকে তাকাই এবং সময় যেন স্থির হয়ে যায়।

আরও পড়ুন
FURFURI-TREE

'ফুরফুরি গাছ' প্রকৃতির এক অলৌকিক ভেষজ সম্পদ

উল্লেখ্য,  সময় নিজে স্থির থাকলেও, আমাদের মস্তিষ্ক এটিকে একটি স্থির ক্যালেন্ডার হিসেবে দেখে না। বরং এটি আমাদের স্মৃতি, আবেগ, মনোযোগ এবং বয়সের আলোকে প্রতি মুহূর্তে সময়কে পুনরায় ব্যাখ্যা করে। তাই, সময় দ্রুত বা ধীরে চলে না এই অনুভূতিটি সম্পূর্ণভাবে আমাদের মন ও চেতনার তৈরি। জীবনকে দীর্ঘ মনে করার সহজ উপায় হলো প্রতিদিন নতুন কিছু শেখা, নতুন কিছু অভিজ্ঞতা অর্জন করা এবং প্রতিটি মুহূর্তকে মনোযোগ দিয়ে উপভোগ করা।

আরটিভি/এসকে