শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ , ১০:১৩ এএম
রমজান মুসলমানদের জন্য আত্মশুদ্ধি, সংযম ও ইবাদতের মাস। তবে এই মাসে দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার ফলে শরীরের শক্তি, পানিশূন্যতা, রক্তে শর্করার ওঠানামা, গ্যাস্ট্রিক বা দুর্বলতার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে— বিশেষ করে যদি ইফতার, সেহরি ও রাতের খাবারে সঠিক পরিকল্পনা না থাকে। বাংলাদেশের আবহাওয়া, খাদ্যসংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার ধরন বিবেচনায় রেখে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুললে রোজা রাখা যেমন সহজ হয়, তেমনি শরীরও থাকে সুস্থ ও কর্মক্ষম।
রমজানে ইফতার, সেহরি ও রাতের খাবার— এই তিন ধাপে কীভাবে ভারসাম্যপূর্ণ, পুষ্টিকর ও দেশীয় উপকরণভিত্তিক খাবার নির্বাচন করা যায়, সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
ইফতার
দীর্ঘ সময় উপবাস থাকার পর ইফতারই শরীরকে আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনে। তবে তাড়াহুড়ো করে ভারী খাবার খেলে উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হয়।
ইফতার শুরু হওয়া উচিত হালকা ও সহজপাচ্য খাবার দিয়ে। পানি দিয়ে শুরু করলে শরীরের পানিশূন্যতা কিছুটা কাটে। সঙ্গে খেজুর বা মৌসুমি ফল রক্তে শর্করার ঘাটতি দ্রুত পূরণ করে। বাংলাদেশের বাজারে সহজে পাওয়া যায় এমন তরমুজ, পেঁপে, কলা বা কমলা ইফতারের জন্য ভালো নির্বাচন।
অনেকেই ইফতারে একসঙ্গে নানা পদ খেয়ে ফেলেন। এতে হজমে সমস্যা হয়। তাই ইফতারকে দুই ভাগে ভাগ করাই স্বাস্থ্যসম্মত। প্রথম ভাগে পানি, ফল বা হালকা স্যুপ। নামাজ ও কিছু সময় বিরতির পর দ্বিতীয় ভাগে অন্য খাবার।
সবজি বা ডাল দিয়ে তৈরি স্যুপ ইফতারের জন্য বেশ উপযোগী। এতে শরীর তরল ও পুষ্টি দুটোই পায়। লাউ, কুমড়া, গাজর, মুগডাল বা মসুরডাল দিয়ে তৈরি হালকা স্যুপ পাকস্থলীর ওপর চাপ ফেলে না।
বাংলাদেশি ইফতারের বড় অংশ জুড়ে থাকে ভাজাপোড়া। পেঁয়াজু, বেগুনি, আলুর চপ, সমুচা— এই খাবারগুলো সংস্কৃতির অংশ হলেও প্রতিদিন বেশি পরিমাণে খেলে সমস্যা তৈরি হয়। অতিরিক্ত তেল গ্যাস্ট্রিক ও ওজন বৃদ্ধির কারণ হতে পারে। তাই ইফতারে ভাজাপোড়া থাকলেও তা সীমিত রাখা উচিত এবং সঙ্গে অবশ্যই ফল বা সবজি রাখা দরকার।
ইফতারে প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার থাকলে শরীর দীর্ঘ সময় শক্তি ধরে রাখতে পারে। সেদ্ধ ডিম, ছোলা, চানা বা অল্প পরিমাণ গ্রিলড মাছ ও মুরগি ইফতারের খাবারকে স্বাস্থ্যসম্মত করে তোলে।
রাতের খাবার
ইফতারের পর অনেকেই আবার ভারী খাবার খেয়ে ফেলেন, আবার কেউ কেউ ইফতারেই রাতের খাবার সেরে নেন। দুটো অভ্যাসই সমস্যার কারণ হতে পারে।
ইফতারের অন্তত দেড় থেকে দুই ঘণ্টা পর রাতের খাবার খাওয়া সবচেয়ে ভালো। এতে ইফতারের খাবার হজম হওয়ার সুযোগ পায়। রাতের খাবার হওয়া উচিত মধ্যম পরিমাণের এবং পুষ্টিগুণে ভরপুর।
ভাত বা রুটি রাতের খাবারে রাখা যেতে পারে, তবে পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ জরুরি। লাল চালের ভাত বা আটার রুটি হজমের জন্য তুলনামূলক ভালো। সঙ্গে থাকতে পারে ডাল, মাছ বা মুরগির মাংস। মাছ বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে সহজলভ্য ও উপকারী প্রোটিনের উৎস। রুই, কাতলা, তেলাপিয়া বা ছোট মাছ অল্প তেলে রান্না করলে তা স্বাস্থ্যকর হয়।
রাতের খাবারে সবজি রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। লাউ, ঝিঙে, পটোল, শিম, পেঁপে বা কুমড়া হজমে সহায়ক এবং শরীরকে হালকা রাখে। ভাজির বদলে সেদ্ধ বা অল্প তেলে রান্না করা সবজি রাতের জন্য ভালো।
অতিরিক্ত ঝাল, তেল ও লবণ রাতের খাবারে এড়িয়ে চলা উচিত। এতে ঘুমের সমস্যা, গ্যাস্ট্রিক ও পরদিন রোজায় অস্বস্তি তৈরি হয়। কোমল পানীয় বা অতিরিক্ত মিষ্টি জাতীয় খাবারও রাতের খাবারের পর না খাওয়াই ভালো।
ইফতার থেকে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত ধীরে ধীরে পর্যাপ্ত পানি পান করা দরকার। একসঙ্গে অনেক পানি না খেয়ে অল্প অল্প করে পান করলে শরীর ভালোভাবে পানি শোষণ করতে পারে।
সেহরি
সেহরি রোজার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাবার। সেহরি বাদ দিলে শরীর দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে এবং পানিশূন্যতার ঝুঁকি বেড়ে যায়। অথচ অনেকেই ঘুমের কারণে বা অনীহায় সেহরি ঠিকমতো খান না।
আদর্শ সেহরির মূল বৈশিষ্ট্য হলো এমন খাবার নির্বাচন করা, যা ধীরে হজম হয় এবং দীর্ঘ সময় শক্তি জোগায়। এতে অবশ্যই কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন ও ফাইবারের সমন্বয় থাকতে হবে।
সেহরিতে লাল চালের ভাত বা আটার রুটি ভালো বিকল্প। অল্প পরিমাণ ভাতের সঙ্গে ডাল ও সবজি থাকলে তা সারাদিন শক্তি ধরে রাখতে সাহায্য করে। ডিম সেদ্ধ বা হালকা ভাজা সেহরির জন্য সহজ ও পুষ্টিকর খাবার।
দুধ ও দই সেহরিতে রাখলে শরীর ক্যালসিয়াম ও প্রোটিন পায়। ওটস বা চিড়া দুধ বা দইয়ের সঙ্গে খেলে তা দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখে। শসা, টমেটো, গাজর মতো কাঁচা সবজি পানির চাহিদা কিছুটা পূরণ করে।
সেহরিতে বেশি লবণ ও ঝাল খাবার খাওয়া উচিত নয়। এতে দিনের বেলায় তৃষ্ণা বাড়ে। চা বা কফি কম খাওয়াই ভালো, কারণ এগুলো শরীর থেকে পানি বের করে দেয়।
সেহরির সময় পর্যাপ্ত পানি পান করা অত্যন্ত জরুরি। একসঙ্গে অনেক পানি না খেয়ে ধীরে ধীরে পান করলে তা বেশি কার্যকর হয়।
গরম আবহাওয়ায় বাড়তি সতর্কতা
বাংলাদেশে রমজান প্রায়ই গরমের মধ্যে পড়ে। ফলে ঘাম বেশি হয় এবং শরীর দ্রুত পানি হারায়। বাইরে কাজ করা মানুষদের জন্য এটি বাড়তি চ্যালেঞ্জ।
ইফতার ও সেহরিতে পানিশূন্যতা রোধে লেবু-পানি, ডাবের পানি বা ঘরে তৈরি হালকা শরবত উপকারী। বাইরে বের হলে ছাতা বা টুপি ব্যবহার করলে শরীরের ওপর তাপের চাপ কমে।
বিশেষ ক্ষেত্রে খাদ্যাভ্যাস
ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদ্রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য রোজার খাদ্যাভ্যাস আরও সচেতনভাবে ঠিক করা দরকার। ইফতার ও সেহরিতে কার্বোহাইড্রেট ও চিনি নিয়ন্ত্রণে রাখা, ভাজাপোড়া কমানো এবং নিয়মিত খাবারের সময় মেনে চলা জরুরি।
শিশু ও বয়স্কদের জন্য খুব ভারী খাবার না দিয়ে সহজপাচ্য খাবার দেওয়া ভালো। তাদের ক্ষেত্রে পানি পানের বিষয়েও বিশেষ নজর দেওয়া দরকার।
>>> রমজান মাস আত্মসংযমের শিক্ষা দেয়। এই সংযম যদি খাবারের ক্ষেত্রেও বজায় থাকে, তবে রোজা হবে স্বস্তিদায়ক ও স্বাস্থ্যকর। বাংলাদেশের খাদ্যসংস্কৃতিতে এমন অনেক খাবার আছে, যা সঠিকভাবে বেছে নিলে রমজানে শরীর সুস্থ রাখা কঠিন নয়।
পরিমিত ইফতার, ভারসাম্যপূর্ণ রাতের খাবার এবং পরিকল্পিত সেহরি— এই তিনটি অভ্যাসই পারে রোজার পুরো মাসকে কর্মক্ষমতা ও সুস্থতার সঙ্গে পার করে দিতে। খাদ্যাভ্যাসে সচেতনতা থাকলে রমজান হয়ে উঠতে পারে শুধু ইবাদতের নয়, সুস্থ জীবনেরও এক অনুশীলন।
আরটিভি/এমএইচজে