রোববার, ০৫ এপ্রিল ২০২৬ , ০২:০৯ পিএম
২০২৬ সালেও বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। আইন, সচেতনতা ও বিভিন্ন উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও দেশের অনেক এলাকায় এখনও ১৮ বছরের আগেই কিশোরী মেয়েদের বিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আর বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই তাদের মা হওয়ার বাস্তবতায় পড়তে হচ্ছে।
পরিবারের সিদ্ধান্ত, সামাজিক চাপ বা অর্থনৈতিক কারণে এই পথ বেছে নেওয়া হলেও এর পেছনে লুকিয়ে থাকে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি। অনেক সময় এসব ঝুঁকি চোখে পড়ে না, যতক্ষণ না মা ও শিশুর জন্য গুরুতর জটিলতা তৈরি হয়।
চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, কিশোরী বয়সে মেয়েদের শরীর তখনও পূর্ণাঙ্গভাবে গড়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় থাকে। এই সময় গর্ভধারণ করলে শরীরকে একসঙ্গে নিজের বৃদ্ধি ও ভ্রূণের প্রয়োজন মেটাতে হয়। ফলে শরীরে বাড়তি চাপ তৈরি হয়। যা মা ও শিশু উভয়ের জন্যই নানা সমস্যার কারণ হতে পারে।
অপুষ্টি বাড়ায় ঝুঁকি
কিশোরী মায়েদের ক্ষেত্রে অপুষ্টি অন্যতম বড় সমস্যা। অনেক কিশোরীই আগে থেকেই পর্যাপ্ত পুষ্টি পায় না। তার ওপর গর্ভধারণ হলে শরীরে পুষ্টির চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। ফলে অনেক সময় গর্ভের শিশুর প্রয়োজনীয় পুষ্টি ঠিকমতো পাওয়া যায় না। এর ফলে শিশুর কম ওজন নিয়ে জন্মানো, দুর্বল শরীর বা বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
রক্তস্বল্পতা হতে পারে বড় বিপদ
কিশোরী মায়েদের মধ্যে রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়া বেশ সাধারণ একটি সমস্যা। শরীরে পর্যাপ্ত রক্ত না থাকলে গর্ভাবস্থায় দুর্বলতা, মাথা ঘোরা ও অতিরিক্ত ক্লান্তি দেখা দিতে পারে। প্রস্রাবের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এটি মা ও শিশুর জন্য জীবনহানির ঝুঁকিও তৈরি করে।
প্রস্রাবের সময় জটিলতা
কিশোরী বয়সে শরীর পুরোপুরি প্রস্তুত না থাকায় প্রস্রাবের সময় জটিলতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক প্রস্রাব কঠিন হয়ে পড়ে এবং অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়। এছাড়া উচ্চ রক্তচাপ, খিঁচুনির মতো জটিল সমস্যাও দেখা দিতে পারে। যা মা ও গর্ভের শিশুর জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।
মানসিক চাপও কম নয়
শুধু শারীরিক সমস্যা নয়, মানসিক দিক থেকেও কিশোরী বয়সে মা হওয়া অনেক বড় চাপ তৈরি করে। হঠাৎ করে সংসার ও সন্তানের দায়িত্ব নিতে হয়। যার জন্য অনেকেই প্রস্তুত থাকে না। এ সময় অনেক কিশোরীর শিক্ষা বন্ধ হয়ে যায়, স্বপ্ন ও পরিকল্পনা থেমে যায়। এর ফলে উদ্বেগ, হতাশা বা বিষণ্ণতার মতো মানসিক সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
শিশুর জন্যও ঝুঁকি
কিশোরী মায়ের গর্ভে জন্ম নেওয়া শিশুর ক্ষেত্রেও নানা ঝুঁকি থাকে। অনেক সময় শিশুর অকাল জন্ম হয় বা কম ওজন নিয়ে জন্মায়। এছাড়া শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যাও দেখা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এসব শিশুর জন্মের পর বিশেষ চিকিৎসা ও বাড়তি যত্নের প্রয়োজন হয়।
সচেতনতা জরুরি
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে উপযুক্ত বয়সে বিয়ে ও সন্তান নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি কিশোরীদের পুষ্টি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার দিকে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাল্যবিবাহ শুধু একটি সামাজিক সমস্যা নয়। এটি একটি বড় স্বাস্থ্যঝুঁকিও। তাই পরিবার ও সমাজকে আরও সচেতন হতে হবে। একটি মেয়ের সুস্থ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হলে প্রয়োজন সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসচেতনতা। তবেই কিশোরী বয়সে মাতৃত্বের ঝুঁকি থেকে অনেক জীবনকে রক্ষা করা সম্ভব।
আরটিভি/জেএমএ