images

লাইফস্টাইল

প্রস্রাবের ৬ উপসর্গ দেখা দিলে হতে পারে ক্যানসার

শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬ , ০৯:০৫ পিএম

সাধারণত মূত্রথলির ক্যানসারের কোনো লক্ষণ আগে থেকে চেনা যায় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই রোগ একদম শেষ পর্যায়ে গিয়ে ধরা পড়ে। তবে প্রস্রাবের কিছু লক্ষণ দেখলে সচেতন হওয়ার পরামর্শ চিকিৎসকদের।

মূত্রনালির বিভিন্ন ক্যানসার যেমন- ব্লাডার, কিডনি, প্রোস্টেট বা ইউরেটার ক্যানসার প্রাথমিক পর্যায়ে নীরবে শুরু হতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উপসর্গগুলো প্রথমে খুবই সূক্ষ্ম থাকে। মাসের পর মাস এসব লক্ষণ উপেক্ষা করলে রোগ শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়তে পারে, ফলে চিকিৎসা হয়ে ওঠে আরও জটিল, ব্যয়বহুল এবং মানসিকভাবে কষ্টকর।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ক্যানসার ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ব্লাডার বা মূত্রাশয় ও কিডনি ক্যানসার প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে শরীরে ছড়িয়ে পড়ার আগেই চিকিৎসায় সাফল্যের সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে।

যেসব উপসর্গ অবহেলা করা উচিত নয়
চিকিৎসকদের মতে, সবচেয়ে উদ্বেগজনক লক্ষণগুলোর একটি হলো প্রস্রাবে রক্ত যাওয়া। এমনকি যদি তা একবারের জন্যও হয় এবং ব্যথাহীন হয় তারপরেও এ ধরনের উপসর্গ হালকাভাবে নেয়া উচিত নয়। এছাড়া আরও কিছু উপসর্গ রয়েছে যেগুলো দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া জরুরি হতে পারে। যেমন-

-ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া
-প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া
-প্রস্রাব নিয়ন্ত্রণে সমস্যা
-প্রস্রাবের প্রবাহ দুর্বল হয়ে যাওয়া
-বিশেষ করে রাতে বারবার প্রস্রাবের চাপ অনুভব করা
-তলপেট বা পিঠে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা

ভারতের শারদাকেয়ার-হেলথসিটির রেডিয়েশন অনকোলজি বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ও বিভাগীয় প্রধান ডা. অনিল থাকওয়ানি বলেন, অনেকেই মনে করেন প্রস্রাবজনিত সমস্যা বয়স, সংক্রমণ বা সাময়িক কোনো কারণে হচ্ছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে থাকা এসব উপসর্গ কখনও কখনও ব্লাডার, কিডনি, প্রোস্টেট বা ইউরেটার ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে। রোগ নির্ণয়ে দেরি হলে চিকিৎসা আরও কঠিন হয়ে যায় এবং সুস্থতার সম্ভাবনাও কমে যেতে পারে।

তিনি জানান, সমস্যাগুলো জটিল হয়ে উঠতে পারে কারণ এসব উপসর্গ অনেক সময় সাধারণ ইউরিন ইনফেকশন বা প্রোস্টেট বড় হয়ে যাওয়ার লক্ষণের মতোই মনে হয়। এ কারণেই সময়মতো পরীক্ষা করানো জরুরি। প্রস্রাব পরীক্ষা, ইমেজিং স্ক্যান বা সিস্টোস্কোপির মাধ্যমে রোগের প্রকৃত কারণ নির্ণয় করা সম্ভব।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) ক্যানসার স্ক্রিনিং নির্দেশিকাতেও শরীরের অস্বাভাবিক পরিবর্তন গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া এবং দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

দেরিতে রোগ শনাক্ত হলে কেন ঝুঁকি বাড়ে
বর্তমানে ক্যানসার চিকিৎসা আগের তুলনায় অনেক উন্নত হলেও চিকিৎসকরা বলছেন, রোগ শনাক্তের সময় এখনও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে মূত্রনালির ক্যানসার অস্ত্রোপচার, লক্ষ্যভিত্তিক রেডিয়েশন থেরাপি বা আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে তুলনামূলক সহজে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কিন্তু ক্যানসার আশপাশের টিস্যু, লিম্ফ নোড বা শরীরের দূরবর্তী অঙ্গে ছড়িয়ে পড়লে চিকিৎসা আরও দীর্ঘ ও আক্রমণাত্মক হয়ে যায়।

ডা. থাকওয়ানি বলেন, ‘ক্যানসার চিকিৎসায় সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণকেই ধরা হয়। দ্রুত শনাক্ত করা গেলে অস্ত্রোপচার, রেডিয়েশন থেরাপি বা অন্যান্য উন্নত চিকিৎসার মাধ্যমে রোগ নিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।’ তিনি আরও জানান, আধুনিক রেডিয়েশন প্রযুক্তির মাধ্যমে এখন টিউমারকে আরও নির্ভুলভাবে লক্ষ্য করা সম্ভব হচ্ছে, ফলে আশপাশের সুস্থ টিস্যুর ক্ষতিও কম হয়। তবে ক্যানসার যত আগে ধরা পড়ে, চিকিৎসার কার্যকারিতাও তত বেশি হয়।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথের (এনআইএইচ) একটি পর্যালোচনাতেও বলা হয়েছে, ক্যানসার শনাক্তে বিলম্ব হলে চিকিৎসার ফল খারাপ হওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।

কারা বেশি ঝুঁকিতে
সব প্রস্রাবজনিত সমস্যাই যে ক্যানসারের লক্ষণ, তা নয়। তবে কিছু মানুষ তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। ৫০ বছরের বেশি বয়সী ব্যক্তি, ধূমপায়ী, শিল্পকারখানার রাসায়নিকের সংস্পর্শে কাজ করা মানুষ এবং পরিবারে মূত্রনালির ক্যানসারের ইতিহাস রয়েছে এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি। দীর্ঘদিন তামাক ব্যবহার ব্লাডার বা মূত্রাশয়ের ক্যানসারের অন্যতম প্রধান ঝুঁকির কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

চিকিৎসকদের মতে, প্রস্রাবজনিত সমস্যা নিয়ে কথা বলতে অনেকেই অস্বস্তি বোধ করেন। লজ্জা বা সংকোচের কারণে অনেক মানুষ মাসের পর মাস উপসর্গ সহ্য করেন এবং আশা করেন সমস্যা নিজে থেকেই সেরে যাবে। কিন্তু এই নীরবতাই বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এখনও খুব বেশি প্রচলিত নয়। ফলে অনেকেই তখনই চিকিৎসকের কাছে যান, যখন উপসর্গ দৈনন্দিন জীবনে গুরুতর প্রভাব ফেলতে শুরু করে। ততক্ষণে রোগ নির্ণয়ে অনেক দেরি হয়ে যেতে পারে।

শরীরের সংকেত অবহেলা নয়
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শরীর অকারণে কোনো পরিবর্তন ঘটায় না। কোনো উপসর্গ বারবার ফিরে আসা মানেই সেটি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। চিকিৎসকদের পরামর্শ, প্রস্রাবজনিত অস্বাভাবিক উপসর্গ কয়েকদিনের বেশি স্থায়ী হলে বা বারবার ফিরে এলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত। এছাড়া ৪০ বা ৫০ বছরের পর নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা গোপন রোগ আগেভাগে শনাক্ত করতে সাহায্য করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, লজ্জা বা সংকোচ কখনোই রোগ নির্ণয়ের পথে বাধা হওয়া উচিত নয়। আজকের ছোট একটি চিকিৎসা পরামর্শ ভবিষ্যতের বড় ও কঠিন লড়াই থেকে রক্ষা করতে পারে।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া

আরটিভি/টিআর