মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬ , ১১:৪৯ এএম
কম পানির মাছকে হঠাৎ বেশি পানিতে ছেড়ে দিলে অনেক সময় দেখা যায়, মাছগুলো অস্থিরভাবে সাঁতার কাটতে থাকে, বারবার দিক পরিবর্তন করে কিংবা লাফিয়ে ওঠে। সাধারণভাবে এটি মাছের স্বাভাবিক চঞ্চলতা মনে হলেও, এর পেছনে রয়েছে বেশ কিছু জৈবিক ও ভৌত কারণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাছের জীবন সম্পূর্ণভাবে পানির পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল। পানির গভীরতা, অক্সিজেনের মাত্রা, খনিজ লবণের ঘনত্ব, তাপমাত্রা ও প্রবাহের ধরন সবকিছু মিলিয়ে মাছের জন্য একটি স্বাভাবিক পরিবেশ তৈরি হয়। ছোট ডোবা বা অগভীর জলাশয়ের মাছকে হঠাৎ গভীর বা বড় জলাশয়ে ছেড়ে দিলে এই পরিবেশগত বৈশিষ্ট্যগুলো একসঙ্গে পরিবর্তিত হয়, যার ফলে মাছের শরীরে বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
গভীর পানিতে পানির চাপ তুলনামূলক বেশি থাকে। এই বাড়তি চাপের সঙ্গে অভ্যস্ত না হওয়ায় মাছের শরীরের সংবেদনশীল ব্যবস্থা, বিশেষ করে ‘ল্যাটারাল লাইন সিস্টেম’, নতুন পরিবেশকে অস্বাভাবিক হিসেবে শনাক্ত করে। এর ফলে মাছ দ্রুত নড়াচড়া শুরু করে এবং অনেক ক্ষেত্রে লাফানোর আচরণও দেখা যায়।
এছাড়া পানির বিভিন্ন স্তরে অক্সিজেনের বণ্টন একরকম থাকে না। নতুন পরিবেশে মাছের ফুলকাকে অক্সিজেন গ্রহণের নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সময় লাগে। এ সময় মাছের শ্বাসপ্রশ্বাসের হার বেড়ে যায়, যা তাদের অস্থির আচরণের অন্যতম কারণ।
বিশেষজ্ঞরা জানান, মাছের শরীর সবসময় পানি ও খনিজ লবণের মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখে, যাকে ‘অসমোরেগুলেশন’ বলা হয়। নতুন জলাশয়ে খনিজ লবণের ঘনত্ব ভিন্ন হলে মাছের শরীর দ্রুত সেই ভারসাম্য পুনঃস্থাপনের চেষ্টা করে। এই অভিযোজন প্রক্রিয়ার চাপও মাছের আচরণে প্রভাব ফেলে।

মাছ পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা পায় ল্যাটারাল লাইন সিস্টেমের মাধ্যমে, যা পানির কম্পন ও প্রবাহ শনাক্ত করে। ছোট জলাশয় থেকে বড় জলাশয়ে গেলে পানির প্রবাহ ও সংকেতের জটিলতা বেড়ে যায়। ফলে মাছ নতুন পরিবেশ বোঝার জন্য বারবার দিক পরিবর্তন করে এবং দ্রুত সাঁতার কাটে।
পরিবেশের আকস্মিক পরিবর্তনে মাছের শরীরে ‘কর্টিসল’ নামের স্ট্রেস হরমোনের মাত্রাও বৃদ্ধি পায়। এতে হৃদস্পন্দন ও শ্বাসপ্রশ্বাসের হার বেড়ে যায় এবং পেশিগুলো বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। এর ফল হিসেবে মাছের মধ্যে অস্থিরতা ও লাফানোর প্রবণতা দেখা দেয়।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সব ক্ষেত্রে লাফানো বা দ্রুত সাঁতার কাটা স্ট্রেসের লক্ষণ নয়। অনেক সময় মাছ নতুন পরিবেশে বেশি জায়গা পেয়ে সেটি অন্বেষণ করার জন্যও সক্রিয় আচরণ করে।
প্রজাতিভেদেও এই প্রতিক্রিয়ার তারতম্য দেখা যায়। কই, শিং ও মাগুরের মতো মাছ পরিবেশ পরিবর্তনে তুলনামূলকভাবে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখায়। অন্যদিকে কার্পজাতীয় অনেক মাছ তুলনামূলক কম লাফালেও নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে বেশি সময় নেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কম পানির মাছ বেশি পানিতে গেলে যে লাফানো বা অস্থির আচরণ দেখা যায়, তা মূলত পানির চাপ, অক্সিজেনের বণ্টন, খনিজ লবণের ভারসাম্য, সংবেদনশীল স্নায়ুতন্ত্র এবং স্ট্রেস হরমোনের সম্মিলিত প্রভাবে ঘটে। এটি মাছের নতুন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রাথমিক ধাপেরই একটি অংশ।
আরটিভি/এসকে