শনিবার, ২০ জুন ২০২৬ , ০১:৩৩ পিএম
বিশ্বের অন্যতম রহস্যময় অপরাধ কাহিনির নাম লর্ড লুকান মামলা। এক অভিজাত পরিবারের সদস্য, একটি ভয়াবহ হত্যা, তারপর হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়া—সব মিলিয়ে আজও এই ঘটনা ব্রিটেনের সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত রহস্যগুলোর একটি হয়ে আছে।
১৯৭৪ সালের ৭ নভেম্বর রাতে লন্ডনের বেলগ্রাভিয়ার একটি বাড়িতে ঘটে ভয়াবহ ঘটনা। অভিযোগ ওঠে, ব্রিটিশ অভিজাত রিচার্ড জন বিংহাম, যিনি সপ্তম আর্ল অব লুকান নামে পরিচিত ছিলেন, নিজের স্ত্রীকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু ভুল করে তাদের সন্তানদের পরিচারিকা (আয়া) ২৯ বছর বয়সী স্যান্ড্রা রিভেটকে আক্রমণ করেন। পরে তার স্ত্রী লেডি লুকানের ওপরও হামলা চালানো হয়।
লেডি লুকান কোনোমতে পালিয়ে সাহায্য চান। কিন্তু এর আগেই লর্ড লুকান বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যান। এরপর থেকে তাকে আর কখনো নিশ্চিতভাবে দেখা যায়নি।
৩১ মিনিটেই হত্যার রায়
১৯৭৫ সালের ১৯ জুন স্যান্ড্রা রিভেটের মৃত্যুর তদন্তে আদালত মাত্র ৩১ মিনিটের মধ্যে লর্ড লুকানকে হত্যার জন্য দায়ী ঘোষণা করে। তবে এত বছর পরও অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি।
যদি তিনি সত্যিই হত্যাকারী হন, তাহলে এত ভয়ংকর পদ্ধতি কেন বেছে নিয়েছিলেন? কেন তিনি নিজের স্ত্রী ও পরিচারিকার মধ্যে ভুল করলেন? আর পালিয়ে যাওয়ার পরই বা কোথায় গেলেন—এসব প্রশ্ন এখনো রহস্য হয়ে আছে।
বিবাহিত জীবনের তিক্ততা থেকেই কি হত্যার কারণ?
লর্ড লুকান ও লেডি লুকানের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই খারাপ ছিল। ১৯৭৩ সালে তারা আলাদা হয়ে যান। তাদের তিন সন্তানকে নিয়ে শুরু হয় তীব্র বিরোধ। একই সময়ে লর্ড লুকান ঋণে ডুবে যাচ্ছিলেন এবং আর্থিক সমস্যায় পড়েছিলেন।
তদন্তকারীদের ধারণা ছিল, দাম্পত্য কলহ, সন্তানদের নিয়ে বিরোধ ও আর্থিক সংকট—সব মিলিয়েই হত্যার পেছনে কারণ থাকতে পারে।
তবে লেডি লুকানের বক্তব্য নিয়েও পরে নানা প্রশ্ন উঠেছে। ১৯৮০ সালে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, তিনি বিশ্বাস করেন তার স্বামী এখনও বেঁচে আছেন, কারণ তার মরদেহ কখনো পাওয়া যায়নি।
কোথায় গেলেন লর্ড লুকান?
লর্ড লুকান নিখোঁজ হওয়ার পর তার গাড়ি তিন দিন পরে নিউহ্যাভেনে পাওয়া যায়। গাড়ির ভেতরে স্যান্ড্রা রিভেট ও লেডি লুকানের রক্তের চিহ্ন পাওয়া যায়। পাশাপাশি হত্যার অস্ত্রের মতো একটি পাইপও উদ্ধার হয়।
এরপর শুরু হয় নানা জল্পনা। কেউ বলেন, তিনি সমুদ্রের পানিতে ঝাঁপ দিয়ে মারা গেছেন। আবার কেউ দাবি করেন, ধনী বন্ধুদের সাহায্যে তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান।
একটি অদ্ভুত তত্ত্বে বলা হয়, তিনি আত্মহত্যা করে নিজের মরদেহ বন্ধুর ব্যক্তিগত চিড়িয়াখানায় সিংহের খাবার হিসেবে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। যদিও এসব দাবির কোনো নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ধনী বন্ধুদের সাহায্যে পালানোর তত্ত্ব
লর্ড লুকানের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের একটি অভিজাত গোষ্ঠী ছিল, যাদের নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। ধারণা করা হয়, তারা হয়তো তাকে পালাতে সাহায্য করেছিলেন।
কেউ কেউ দাবি করেন, তিনি বিদেশে চলে গিয়েছিলেন এবং গোপনে জীবন কাটিয়েছেন। আবার বিভিন্ন সময় বিশ্বের নানা জায়গায় তাকে দেখার দাবি উঠেছে। তবে কোনো দাবিই নিশ্চিত হয়নি।
রহস্যের আড়ালে হারিয়ে যাওয়া স্যান্ড্রা রিভেট
লর্ড লুকান রহস্যের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে তার নিখোঁজ হওয়া ও অভিজাত পরিচয়। কিন্তু এই ঘটনার মূল শিকার স্যান্ড্রা রিভেট অনেক সময় আলোচনার বাইরে থেকে গেছেন।
ইতিহাসবিদদের মতে, এই মামলায় স্যান্ড্রার নিজের বক্তব্য আর কখনো জানা সম্ভব নয়। তিনি ছিলেন একজন সাধারণ নারী, যিনি এক ভয়াবহ ঘটনার শিকার হয়েছিলেন।
আজও লর্ড লুকান কোথায় আছেন, তিনি সত্যিই মারা গেছেন নাকি কোথাও নতুন পরিচয়ে বেঁচে আছেন—তার উত্তর অজানা। আর সেই কারণেই এই মামলা ব্রিটেনের সবচেয়ে আলোচিত ও রহস্যময় অপরাধ কাহিনির তালিকায় রয়ে গেছে।
সূত্র: বিবিসি
আরটিভি/জেএমএ